এক সহকর্মীর কাছে থেকে দুটি বই উপহার পেয়েছি। একটি তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের কবি। হীরকজয়ন্তী সংস্করণ হিসেবে ভীষ্মদেব চৌধুরীর ভূমিকা, সংকলন ও সম্পাদনায় অবসর প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে এটি। আরেকটি নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী ঔপন্যাসিক উইলিয়ম গোল্ডিং-এর লর্ড অব দ্য ফাইজ। শফি আহমেদের ভূমিকা ও সম্পাদনা এবং শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়ার রূপান্তরে এই বইটিও প্রকাশিত হয়েছে অবসর থেকে।
বই দুটি পড়ে কেমন লেগেছে সে ধরনের কোনো আলোচনা করছি না। আলোচনা অন্য বিষয়ে। কবি বইতে মোট অংশ রয়েছে তিনটি। প্রথমটি ভূমিকা, তারপর মূল উপন্যাস এবং শেষে পরিশিষ্ট। পরিশিষ্টে আবার বাংলা কথাসাহিত্য-সমালোচনা : প্রসঙ্গ কবি, জীবনপঞ্জি এবং উপন্যাসপঞ্জি নামে তিনটি অংশ রয়েছে। প্রতিটি অংশকে এক একটি ইউনিট ধরলে মোট ইউনিট দাড়ায় পাঁচটি।
কবি বইটি এর আগে একবার পড়া ছিলো। ফলে বইটি পড়তে বসেছিলাম এক ধরনের পূর্ব-ধারণা (pre-conception) নিয়ে। পাঁচ-সাত বছর আগে পড়ার সময় যেরকম মনে হয়েছিলো, তার কতোটা পরিবর্তন হয়েছে সেটা জানা যেমন একটি উদ্দেশ্য ছিলো; তেমনি দ্বিতীয়বার পড়ায় বইটি থেকে নতুন কী পাচ্ছি, সে বিষয়েও আগ্রহ ছিলো অদম্য। তাই ভূমিকা ও পরিশিষ্টের আলোচনা বাদ দিয়ে মূল উপন্যাসটি পড়েছি প্রথমে। তারপর বাকি অংশগুলো পড়েছি আগ্রহ নিয়ে। বিশেষ করে ভীষ্মদেব চৌধুরীর অনুধাবন এবং বিশ্লেষণটি বোঝার চেষ্টা করেছি। অন্যদিকে লর্ড অব দ্য ফ্লাইজ পড়ছি প্রথমবারের মতো। সেখানেও মূল উপন্যাসের বাইরে সম্পাদক ও অনুবাদকের কিছু কথা আছে।
দুটো বইয়ের ভূমিকা, আলোচনা ইত্যাদি পড়ার পর প্রশ্ন জাগছে, মূল বইয়ের সঙ্গে এ ধরনের আলোচনা জুড়ে দেওয়া কতোখানি প্রাসঙ্গিক? তাও প্রথমদিকে? কোন পাঠক মূল উপন্যাস না পড়ে প্রথমে আলোচনা বা ভূমিকা পড়লে তাঁর মধ্যে কি একটি আরোপিত পূর্ব-ধারণা চলে আসবে না? কেউ হয়তো বলতে পারেন, সেটা পাঠকের ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা মূল উপন্যাস পড়ার আগে আলোচনা না পড়লেই হয়। কিন্তু বইয়ের শুরুতে আলোচনা থাকলে সেটি উপেক্ষা করে উপন্যাসে যাওয়ার লোভ সামলানো কঠিন। আবার অনেক সময় এটাও মনে হয়, যেহেতু ভূমিকা হিসেবে আলোচনাটি বইয়ের প্রথমেই রয়েছে, তাই উপন্যাসটি পড়ার আগে হয়তো এটি পড়ে নেয়া উচিত। কিন্তু এতে যে লেখক অগোচরে পাঠকের মনে তার নিজ ধারণা ঢুকিয়ে দিচ্ছেন, সেটি কি পাঠকের জন্য মঙ্গলজনক হচ্ছে? পাঠকের কাছে একেকটি বইয়ের বিশ্লেষণ হতে পারে একেক রকম। কিন্তু ভূমিকা কিংবা আলোচনা পড়ে পাঠক যদি পূর্বোক্ত পাঠকের (যিনি এখানে ভূমিকা লেখক) চেয়ে ভিন্ন কিছু ভাবতে না পারেন, তাহলে সেটার দায়ভার অনেকটা আলোচক বা সম্পাদকের ঘাড়ে বর্তায়। এবং আমার মতে, এতে সাহিত্য অঙ্গনও বোধহয় কিছুটা ক্ষতির মুখোমুখি হয়।
আরেকটি কারণেও মনে হচ্ছে, মূল উপন্যাসের সঙ্গে এ ধরনের আলোচনা দেয়াটা সমীচীন নয়। আমাদের দেশে বইয়ের দাম এমনিতেই বেশি। তার ওপর এ ধরনের বড়সড় আলোচনা বইয়ের কলেবরই বাড়ায় না শুধু, তুলনায় দামও বাড়ায়। কবি বইয়ের মোট পৃষ্ঠা ২১০। মুল উপন্যাসটি ১৪৩ পৃষ্ঠার। দাম লেখা আছে ১০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি পৃষ্ঠার দাম পড়ছে প্রায় ৪৮ পয়সা। শুধু যদি মূল উপন্যাসটি দেয়া হতো, তাহলে ৪৮ পয়সার হিসেবে বইটির দাম দাড়াতো ৬৮ টাকা। অর্থাৎ ৩২ টাকা দেয়া হচ্ছে একজন আলোচকের বিশ্লেষণ পড়ার জন্য।
একটু ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে লর্ড অব দ্য ফ্লাইজ বইটিতেও। ২১২ পৃষ্ঠার বইটিতে মুল উপন্যাস ১৯১ পৃষ্ঠার। দাম ১৫০ টাকা। প্রতি পৃষ্ঠায় দাম পড়েছে প্রায় ৭১ পয়সা করে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে দুটি বইয়ের কাগজের মান, বাঁধাই ইত্যাদি একই মনে হলেও পৃষ্ঠা প্রতি দামের এই বিশাল পার্থক্য কেনো তা বোঝা যাচ্ছে না। আমি জানি না, বইটি প্রকাশের আগে স্বত্বাধিকারীর অনুমতি নিয়ে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়েছিলো কি-না। যদি হয়, তাহলে হয়তো দাম ঠিক আছে। কিন্তু সে বিষয়ে কিছু লেখা নেই। যদি আলোচনা বাদ দিয়ে শুধু উপন্যাসটি প্রকাশ করা হতো, তাহলে ৭১ ও ৪৮ পয়সা হারে বইটির দাম হতো যথাক্রমে ১৩৬ ও ৯২ টাকা। অনেকে হয়তো লেখকের জীবনী পড়তে আগ্রহী হবেন। সেক্ষেত্র দাম ১৩৬/৯২ টাকার চেয়ে আরেকটু বাড়তো।
আমাদের এমনিতেই বই কিনে পড়ার অভ্যাস কম। তারওপর বইয়ের দামও তুলনামুলকভাবে বেশি। এই আলোচনার বহর বাদ দিলে বইয়ের দাম কমে আসে অনেকখানি। আর আলোচনা পড়ার জন্য দৈনিক পত্রিকাগুলোর শুক্রবারের সাহিত্য সাময়িকী, সাহিত্য ম্যাগাজিন পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিনগুলো তো আছেই। সেখানে যে আলোচনা পাওয়া যায়, তা বোধহয় সপ্তাহের খোরাক জোগায়। বইয়ে আলোচনা দিয়ে দাম বাড়ানোর দরকার নেই।
আরেকটি বিষয়ও বলা দরকার। অনেক বইয়ে ফন্ট সাইজও অনেক বড় থাকে। এমনকি বইয়ের চারদিকে যেভাবে মার্জিন দিয়ে টেক্সট এরিয়া যেভাবে সংকুচিত করে ফেলা হয়, তাতে বইয়ের কলেবর বেড়ে যায় অনেক। হুমায়ূন আহমেদের সাম্প্রতিক কোনো বই হাতে নিলেই এর সত্যতা পাওয়া যাবে। এসব বইয়ে ১২/১৩ ফন্ট সাইজ দেওয়ার সত্যিই কি কোনো দরকার আছে? হয়তো এতে দু’একজনের সুবিধা হয়, কিন্তু ফন্ট সাইজ ১০ রেখে (সংবাদপত্রের মতো) বই প্রকাশ করলে এবং বইয়ের চারদিকে মার্জিন কমিয়ে ছাপালে বইয়ের কলেবর অনেকটাই কমে এবং দামও কমতে বাধ্য।
বই কিনে কেউ কোনোদিন দেউলিয়া হয় নাÑ আপ্তবাক্যটি তাই এ সময়ের জন্য প্রযোজ্য নয়। ব্যক্তিগতভাবে আমার অভিমত হলোÑ এ সময়ে বই কিনে মধ্যবিত্তশ্রেণীর আর্থিকভাবে দেউলিয়া হতে মাত্র কয়েকটি ঘণ্টাই যথেষ্ট।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



