গত 3 ও 4 ফেব্রুয়ারি পালিত হল শতবর্ষের উদযাপন অনুষ্ঠান। জাঁকজকমকপূর্ণ এ উৎসবকে কেন্দ্র করে রঙ বেরঙের আলোক সজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছিল উপজেলায় সদরের চারপাশের সড়ক ও উপসড়কগুলোকে। দেশ-বিদেশের বরেণ্য সাংস্কৃতিক, রাজনীতিবীদ ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব , বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষাথর্ীবৃন্দ এবং স্থানীয় এলাকাবসীর অংশগ্রহনে সেদিন অভূতপূর্ণ মিলন মেলায় পরিণত হয়েছিল।
1905 সালের 15 ফেব্রুয়ারি তৎকালীন হিন্দু সমপ্রদায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব যোগেন্দ্র নারায়ণ রায়, রাস বিহারী সেন ও মুসলমান পরিবারের প্রথিতযশা আব্দুল হক খানের উদ্যোগে নবাবগঞ্জ সদরের একটি টিনসেড ঘরের এই প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরুকরে। তৎকালীন জমিদার পরিবার আজিজপুর মিয়া বাড়ির সম্পত্তিতে 66 শতাংশ জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত স্কুলটির সূচনা ঘটে। তথ্য, উপাত্তে আরো জানা গেছে, তৎকালীন প্রভাবশালী হিন্দু পরিবারের তিন ক্ষণজন্মা মহান পুরুষ এটিকে প্রতিষ্ঠা কারেছিলেন এন্ট্রানস স্কুল হিসেবে।
যোগেন্দ্র নারায়ণ রায়ের পিতা তৎকালীন সময়ে তাদেরই বাড়িতে একটি পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ সময়ে আর্থিক সংকটের কারণে হিন্দু জমিদাররা আজিজপুর মিয়া বাড়ির আব্দুল হক খানের সঙ্গে পরামর্শ করে 1905 সালের 15 ফেব্রুয়ারি নবাবগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় নামে শতবর্ষের প্রবীণ এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে চিন্তাহরণ কুশারী 95 জন ছাত্রছাত্রী ও 11 জন শিক্ষক নিয়ে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাজীবন শুরু করেন। 1909 সালের 18 আগস্ট কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিক স্বীকৃতি লাভ করে।
1910 সালে প্রথম বোর্ড পরীক্ষায় 3 জন ছাত্র অংশগ্রহণ করে। পরীক্ষাথর্ীদের সবাই ছিল হিন্দু পরিবারের। এদের মধ্যে সীতানাথ সরকার ও মনি মোহন দে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হলেও মাখন লাল চক্রবতর্ী অকৃতকার্য হয়। এরপর চলতে থাকে স্কুলটির শিক্ষাজীবন। দীর্ঘ 20 বছর পর 1929 সালে তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মনিমোহন চক্রবতর্ীর প্রচেষ্টায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি স্বীকৃতি লাভ করে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এই বিদ্যালয়ে থেকে অধ্যয়ন শেষে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী কৃতিত্বের অবদান রেখে অনেকেই আজ দেশ-বিদেশে সুনাম ও সুখ্যাতির সঙ্গে কর্মজীবন চালিয়ে যাচ্ছেন। উল্লেখযোগ্য যেসব কৃতী ছাত্র একাধিক বিষয়ে পিএইচডি শেষে কর্মজীবন শুরু করেন তাদের মধ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ড. প্রফুল চন্দ্র ঘোষ, আমেরিকার নাসামান মন্দিরের বিজ্ঞানী ডা. রাধারমণ কর্মকার, বর্তমানে আফ্রিকান সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ড. নিহার চন্দ্র বিশ্বাস, আইএসওএর পরিচালক রফিকউদ্দিন আহম্মেদ, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জালালউদ্দিন আহম্মেদ, ড. ইন্দ্র মোহন চক্রবতর্ী, ড. আফতাব উদ্দিন হোসেন চৌধুরী, ড. মোঃ আলাউদ্দিন, ড. অমল চন্দ্র সাহা, ড. ছন্দ শ্রী পাল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ডা. আতিয়ার রহমান। এছাড়া তৎকালীন অবিভক্ত ভারতবর্ষের ছাত্র আন্দোলনের জন ক হিসেবে পরিচিত আব্দুর ওয়াছেক নবাবগঞ্জ উপজেলা মুসলিম পরিবারের মধ্যে সর্বপ্রথম স্নাতক সম্মানে ডিগ্রি লাভ করেন।
1995 সালে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটির বর্তমানে 927 শতাংশ জায়গাবিশিষ্ট 7টি ভবনসহ প্রতিষ্ঠানটির একটি ছাত্রাবাস, একটি শিক্ষকদের আবাসিক ভবন, তিনটি পুকুর, একটি মার্কেট ও একটি বিশাল খেলার মাঠ রয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের বেতন ছাড়াও মার্কেট এবং পুকুর থেকে প্রতি মাসে প্রায় লক্ষাধিক টাকা প্রতিষ্ঠনটি আয় করছে বলে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এই প্রতিষ্ঠানের সাবেক ছাত্র এ কে এম ইব্রাহিম খান জানান।
বর্তমানে 1 হাজার 500 জন ছাত্র, 37 জন শিক্ষক-শিক্ষিকা, 11 জন অফিস সহকারী ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়ে স্বনামধন্য বিদ্যালয়টি আজ শতবর্ষ পেরিয়ে দ্বিতীয় শতকে পর্দাপন করেছে।
শতবর্ষ উদযাপনের 2দিনব্যাপী উৎসবকে সফল ও সার্থক করে তুলতে গত এক বছর ধরে বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক খন্দকার আবু আশফাকের নেতৃত্বে একদল প্রবীণ ও নবীন তাদের নিরলস প্রচেষ্টা, মেধা ও শ্রম দিয়ে নবাবগঞ্জবাসীকে আনন্দ উল্লাসে ভরপুর করে রেখেছিলেন। সেই আনন্দকে অক্ষুন্ন রাখার প্রত্যাশা নিয়ে দ্্বিতীয় বর্ষেপথ চলছে নবাবগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়।
[পুনশ্চঃ নবাবগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের আমি একজন গর্বিত প্রাক্তন ছাত্র]
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




