somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পৃথিবীর দেনা-পাওনার হিসেব পৃথিবীতেই চুকে যাওয়া ভালো

২১ শে নভেম্বর, ২০১৭ রাত ৯:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

লোকটিকে ফোন দিচ্ছিলাম বার বার। পাওনাদারের ফোন দেনা-দাররা ধরবে না এটাই স্বাভাবিক।

টানা দুই দিন ফোন দেবার পর মাঝখানে একদিন বিরতি দিলাম। পরের দিন আবার ফোন দিতে শুরু করলাম।

দুপুর বেলা ফোন ধরে বললেন, "ভাই, বেড়াইতে গেছিলাম ভুলে মোবাইল রাইখা গেছি তাই দেখবার পারি নাই।"

আমি শান্ত গলায় বললাম, "কেন মিথ্যা বলে আমলনামা ভারী করছেন ভাই। আজকাল নিজের কিডনি খুলে রেখে বেড়াতে যেতে পারে মানুষ কিন্তু মোবাইল রেখে না।"

তিনি টেনে টেনে বললেন, "বিশ্বাস না করলে আর কি করবো বলেন...।"

"টাকাটা খুব দরকার ভাই। আজ এক বছর হয়ে গেল আপনার সাথে ব্যবসা নাই আমার। খামাখা কেন টাকাটা আটকে রাখছেন।"

"দেখি, দিমু নি..।" বলে ফোন কেটে দিলেন।

আমি আবার ফোন করলাম তাকে। তিনি রিসিভ করে বললেন, "নেটওয়ার্ক প্রবলেম।"

আমি বললাম, "আবার মিথ্যা বলছেন, আপনি ইচ্ছা করে কেটে দিয়েছেন। ভাই আপনার তো কোন অভাব নেই, কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি আছে। আজ মইরা গেলে কাল দুই দিন। কে খাইবো এই সম্পত্তি আপনার। কার জন্য রেখে যাবেন বলেন?"

তিনি ধমকের শুরু বললেন, "ভাই, এমন করতাছেন মনে হয় কাইল ই দেশ ছাইড়া যাইতাছি গা।"

"আপনার লাল পাসপোর্ট আছে যাইতেও তো পারেন, তবে যেনে রাখেন কেয়ামতের আগ অবধি আমি আমার কষ্টে উপার্জিত হালাল টাকার দাবি ছাড়বো না।"

তিনি দাম্ভিকতার সাথে বললেন, "যখন এই কথা বলছেন, তখন পারলে নিয়েন দেহি আপনের টাকা।"

আমার চোখ দুটো জ্বালা করে উঠলো। কিছু সময় ঝিম মেরে বসে রইলাম।

পরের দিন ভোরবেলা আমার মার্কেটিং কর্মকর্তার ফোন পেয়ে ঘুম ভাঙলো আমার। তিনি কাঁপা গলায় উপরের লোকটির নাম বলে বললেন, "স্যার গতকাল নরসিংদী রোডে এক্সিডেন্ট করে তিনি মারা গেছেন। এই মাত্র খবর পেলাম। ট্রাকে একবারে পিসে দিছে।"

"পিসে দিছে" শব্দটি তে তিনি একটু বেশি জোর দিয়ে তার চাপা ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, সেটা বুঝতে বাকি রইলো না আমার।

আমি অবাক গলায় বললাম, "কি বলছেন এই সব, মাত্র গতকালই তো কথা হলো আমার সাথে। আপনি ভুল শুনছেন বোধ হয়।"

আমি ভুলে গেছি, গতকাল মানে অনেক লম্বা সময়। অনেকগুলো ঘণ্টা মিনিট সেকেন্ড পার হয়ে গেছে...। গতকাল মানে সত্যিই অনে...ক লম্বা সময়!
তারপর একজনকে ফোন দিলাম। সে খিলখিল করে হেসে উঠলো। কারো মৃত্যু সংবাদ দিতেও যে মানুষ এভাবে হাসতে পারে আমার জানা ছিল না। তাকে ধমক দিয়ে বললাম, "একটা লোক মারা গেছে তার খবর দিতে গিয়ে আপনি খিল খিল করে হাসছেন!"

তিনি উত্তর দিলেন, "আপনে জানেন না সে কেমন লোক ছিল! ও তো আপনার টাকাও মাইরা খাইছে। তয় হাসি তো একটু আইবোই।"

তার এই উত্তর আমার জীবনের জন্য অনেক বড় এক শিক্ষা। অনেক বড় ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কোন কোন মানুষের মৃত্যু সংবাদ দিতে লোক বেশ আনন্দ উপভোগ করে। খিল খিল করে হাসতে পারে! বিষয়টি সত্যিই বড় নির্মম। বড় নিষ্ঠুর।

একটা প্রবাদ বাক্য আমার মনে পড়ে গেল "এমন জীবন করিও গঠন, মরিলে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন!" এ বাক্যটির পুরো বাস্তবতা দেখতে পেলাম চোখের সামনে।

লোকটির জন্য আমার খারাপ লাগতে লাগলো। ভীষণ খারাপ। কিসের উপর ভর করে পৃথিবীতে চলছি আমরা! মাত্র কয়েক ঘণ্টা মিনিট সেকেন্ডের ব্যবধানে সব শেষ!

দু'দিন পর মরহুমের শ্বশুর আমার নাম্বার খুঁজে আমাকে ফোন দিলেন। তার ধারণা তার জামাই আমার কাছে টাকা পাবে হয়তো। কিন্তু যখন জানতে পারলেন আমি উল্টো তার কাছে টাকা পাবো। তখন তিনি আমতা আমতা করতে লাগলেন। বললেন, "বুঝই তো ওর ওয়ারিশ যারা আছে তারা কোথা থেইকা দিবো টাকা। বাচ্চারা ছোট ছোট।

ঘটনা বুঝতে পেরে আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, "আমার কোন দাবী নেই। মহান আল্লাহ পাক তাকে জান্নাতবাসী করুক এই দোয়াই করি....।
শ্বশুর সাহেব খুশি হয়ে গেলেন।

মরহুমরে জন্য আমার খুব করুণা হতে লাগলো যে, এত সম্পদ অর্থ তিনি যাদের জন্য রেখে গেছেন, আজ তার সেই ওয়ারিশান গন তার দেনা মেটাতে রাজি নন কেউ।

বরাবরই প্রতিদিন সকালে অফিসে এসে প্রথমে চেক করি আমার কোন পাওনাদার আছে কিনা। তারপর সোজা নির্দেশ, পাওনাদারের পাওনা আগে মিটাও। আমি বেঁচে থাকতে থাকতে মিটাও...।

পৃথিবীর দেনা-পাওনার হিসেব পৃথিবীতেই চুকে যাওয়া ভালো।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে নভেম্বর, ২০১৭ রাত ৯:৪৫
৭টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার ‘অন্তরবাসিনী’ উপন্যাসের নায়িকাকে নিয়ে আরেকটি গল্প

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ১১ ই জুলাই, ২০২০ রাত ৯:৪২

যে মেয়েকে নিয়ে ‘অন্তরবাসিনী’ উপন্যাসটি লিখেছিলাম, তার নাম ভুলে গেছি। এ গল্প শেষ করার আগে তার নাম মনে পড়বে কিনা জানি না। গল্পের খাতিরে ওর নাম ‘অ’ ধরে নিচ্ছি।
বইটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্লীজ বিরক্ত করবেন না

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই জুলাই, ২০২০ রাত ১১:৪৬



দেখুন- আমি এখন একটি কবিতা লিখবো
প্লীজ, আমাকে বিরক্ত করবেন না
একটা কবিতা লেখা চারটেখানি কথা নয়
সামুর জনপ্রিয় ব্লগার চাঁদগাজী
আজ পর্যন্ত একটি কবিতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কাঁচপোকা লাল টিপ অথবা ইচ্ছেপদ্ম...

লিখেছেন নান্দনিক নন্দিনী, ১২ ই জুলাই, ২০২০ রাত ১২:২৯



‘হৃদয়ে ক্ষত- তা তোমার কারণেই
তাই, তুমিই সেলাই করে দেবে-
বিনা মজুরিতে।
কিছু নেই এমন যা দিতে পারি তোমাকে;
ঠান্ডা মাথায় দেখেছি অনেক ভেবে!
যদি নাও দাও তবে থাকুক এ ক্ষত
এ ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

বন্ধু, কি খবর বল...

লিখেছেন পদ্ম পুকুর, ১২ ই জুলাই, ২০২০ সকাল ১১:০১


সময়ের হাওয়া গায়ে মেখে ভাসতে ভাসতে যখন এই অব্দি এসে পড়েছি, তখন কখনও কখনও পেছনে ফিরতে ইচ্ছে হয় বৈকি। কদাচিৎ ফিরে তাকালে স্মৃতির পাতাগুলো বেশ উঞ্চ এক ওম ছড়িয়ে দেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ যা পারেনি নেপাল তা করিয়ে দেখালো!

লিখেছেন দেশ প্রেমিক বাঙালী, ১২ ই জুলাই, ২০২০ দুপুর ১২:২৭



ভারতীয় যত টিভি চ্যানেল আছে তা প্রায় সবগুলোই বাধাহীন ভাবে বাংলাদেশে সম্প্রাচারিত হচ্ছে কিন্তু বাংলাদেশে একটি টিভি চ্যানেলও ভারতে সম্প্রচার করতে দেওয়া হয়না। ভারতের কিছু কিছু চ্যানেলের মান অত্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×