somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দেবী!

১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



১)
দেবী খুবই বুদ্ধিমতী এবং সুন্দরী। এক উচ্চাভিলাষী পরিবারে দেবীর জন্ম, এমনই উচ্চাভিলাষী যে তাদের একমাত্র ভাবনা কীভাবে সবাইকে ছাড়িয়ে উপরে ওঠা যায়! দেবীর যখন জন্ম হলো তখন তার ভাইয়ের বয়স ১৪ বছর, মেধাবী ভাইটি ক্লাসের সবাইকে টপকিয়ে সবসময় প্রথম স্থান অধিকার করে। ছোটবেলা থেকেই দেবীর মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, ভাইয়ের মত তাকেও সবার উপরে উঠতে হবে। দেবী বরাবরই প্রাণপণ চেষ্টা করে গেছে, কিন্তু ভাইয়ের মত ভাল রেজাল্ট করতে পারেনি। দেখা গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ভাই যেমন প্রথম কয়েকজনের মধ্যে স্থান পেয়েছিল দেবী তা পায়নি, বরং তার স্থান হয়েছে একেবারে শেষের দিকে। ফলে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাই সবচাইতে চাহিদাসম্পন্ন বিষয়ে পড়তে পারলেও, দেবীকে ভর্তি হতে বাধ্য হয়েছে সবচাইতে কম চাহিদার বিষয়ে পড়তে! দেবী খুব কাঁদলো। বড় ভাই বলল, "কান্দিস না! আমি তোকে গাইড করব, যাতে তুই সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে পারিস।"

ততদিনে অবশ্য বড় ভাই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষ করে আমেরিকাবাসী হয়ে গেছে। কিন্তু আমেরিকার ব্যস্ত জীবনের মধ্যেও বড় ভাই দেবীর খেয়াল রাখতে লাগলো, তাকে গাইড করতে লাগল যাতে সে তার ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করতে পারে। ভাই দেবীকে বুঝিয়ে দিল, কীভাবে উপযুক্ত মানুষ বেছে নিয়ে তার সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে যাতে পরবর্তীতে তাঁরা তাকে তার লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। শুধু শিখিয়ে দিয়েই ভাই থেমে থাকল না, দেবী তার লক্ষ্য অর্জনের পথে ঠিকমতো যাচ্ছে কিনা তার তদারকি করার জন্য দেবীর সমস্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতে লাগলো। দেবীর বন্ধুরাও একসময় বুঝে গেল যে, তাদের গ্রুপ চ্যাটে মাঝে মাঝেই দেবীর বদলে দেবীর ভাই তাদের সাথে কথা বলে!

বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকগুলো ভালো ছেলের সাথে দেবীর বন্ধুত্ব হলো। দেবীর সুন্দর চেহারা, অমায়িক আচরণ দেখে তার বন্ধুরা মুগ্ধ হয়ে যেত, তাই নানাভাবে তারা দেবীকে লেখাপড়ায় সাহায্য করতে লাগলো। এদের মধ্যে যাকে ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মনে হয়েছে তার সাথেই দেবীর সবচাইতে বেশি বন্ধুত্ব হলো। পরবর্তী আট বছর ধরে এই সম্পর্ক অটুট রইল, কিন্তু দেবী এঁকে বিয়ে করল না। সম্পর্কের প্রাথমিক সময়েই, গভীর ভালোবাসার দোহাই দিয়ে দেবী ছেলেটিকে বাধ্য করল ক্লাসের সমস্ত মেয়ে, এমনকি তাঁর মেয়ে কাজিনদের সঙ্গে পর্যন্ত সমস্ত রকম সম্পর্ক ছিন্ন করতে... বাস্তব জীবনের এবং সামাজিক মাধ্যমের সব সম্পর্ক। এরপর দেবী ছেলেটিকে বাধ্য করলো এমন সব বন্ধু এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক চুকাতে, যারা তাকে উঁচুতে উঠতে সাহায্য করতে পারবে না!

এই ছেলেটিকে দিয়ে দেবী তার সমস্ত অ্যাসাইনমেন্ট করিয়ে নিতো। একবার এরকম একটা অ্যাসাইনমেন্ট করে দেবার পর ছেলেটি জানতে পারে যে, অ্যাসাইনমেন্টটি দেবী নিজের জন্য করায় নি, বরং হাতে রাখা আরেকজন ছেলে বন্ধুর জন্য করিয়ে নিয়েছে।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে দেবী আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি করতে গেল, তার বয়ফ্রেন্ড ছেলেটিও আমেরিকার অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে গেল। ইন্টারনেটের এই যুগে লং ডিসটেন্স কোন সমস্যা না, তাই দেবী আরো বেশি চাপ দিয়ে তার সমস্ত অ্যাসাইনমেন্ট এবং রিসার্চের জন্য প্রয়োজনীয় কোডিং এই ছেলেটিকে দিয়ে করাতে লাগলো। কখনো কখনো দিনে ছয়/ আট ঘন্টা করে ছেলেটি দেবীর কাজ করে দিতে লাগলো, ফলে তার নিজের রিসার্চে পিছিয়ে যেতে লাগলো। যখনই ছেলেটি দেবীকে তার অসুবিধার কথা বলতো তখনই দেবী প্রচুর কান্নাকাটি করতো, নিজের অসহায় অবস্থার কথা বলে অনুরোধ করত তাকে সাহায্য করতে। কয়েকবার ছেলেটি এই সম্পর্ক থেকে বের হয়ে যেতে চেয়েছে, কিন্তু দেবী আত্মহত্যা করবে বলায় সে আবারো সম্পর্ক ঠিক রাখে। ইতিমধ্যে দেবী বিশ্ববিদ্যালয় বদলে আরো ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছে। দেবী হয়তো বুঝতে পেরেছিল এই ছেলেটিকে আর বেশি দিন আটকে রাখতে পারবে না, তাই সে নতুন শিকার খুঁজতে লাগলো যার মাধ্যমে তার ক্যারিয়ার এগিয়ে যেতে পারে। এমন একটা ছেলেকে দেবী পেয়েও গেল। এই ছেলেটি এমন একজন যাকে দীর্ঘদিন ধরে দেবী খুঁজছিল। ছেলেটির নাম জ্ঞান, দেশে এবং বিদেশে তার একাডেমিক ফলাফল এবং রিসার্চ খুব উচ্চ মানের। জ্ঞানের আমেরিকান পাসপোর্ট আছে, কারণ তার জন্ম আমেরিকায় তার বাবা যখন পিএইচডি করছিলেন সেই সময়। জ্ঞানের পরিবার উচ্চ শিক্ষিত এবং সামাজিকভাবে মর্যাদা সম্পন্ন। জ্ঞানের বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, তার দাদাও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ছিলেন। তিনি এমন বিষয়ে পিএইচডি করেছিলেন যেটাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তিনিই ছিলেন প্রথম। জ্ঞান নম্র- ভদ্র, ছয় ফিটের বেশি লম্বা সুদর্শন, সহজ সরল এক তরুণ যাকে সহজেই ম্যানিপুলেট করা সম্ভব। এই সবকিছু বিবেচনা করে দেবী জ্ঞানের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলল, যদিও একই সাথে আরো কয়েকজনের সাথেও তার সম্পর্ক থাকলো। এবারে দেবীর সাথে আট বছরের সম্পর্কে থাকা ছেলেটি দেবীকে ছাড়তে পেরে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো!

দেবী কোডিং একেবারেই পারতো না, আবার জ্ঞান ছিল কোডিংয়ের পন্ডিত। অতএব জ্ঞান খুশি মনে দেবীর রিসার্চের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত কোডিং করে দিতে লাগলো, নিজের রিসার্চ এর সাথে সাথে দেবীর রিসার্চেও কাজ করতে লাগলো।‌ এইবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন জ্ঞানকে দেবীর সম্পর্কে জানালো যে সে কিভাবে বিভিন্ন জনের সাথে সম্পর্ক করে নিজের সুবিধা আদায় করে নেয়। জ্ঞান তাদের কথা বিশ্বাস করলো না বরং দেবীর পরামর্শে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলো। অবশ্য তখনও জ্ঞানের বিবেচনা বোধ কিছুটা হয়তো অবশিষ্ট ছিল, যার জন্য সে দেবীর প্রচন্ড কর্তৃত্বপরায়নতা বুঝতে পেরে এই সম্পর্ক থেকে বের হতে চেয়েছিল, কিন্তু দেবী আগের মতই আত্মহত্যা করবে বলে নাটক করায় জ্ঞান বাধ্য হল সম্পর্ক বজায় রাখতে। দেবী ধারণা করলো, হয়তো জ্ঞান এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যেতে চাইবে। তাই ভাইয়ের পরামর্শে দেবী জ্ঞানকে বিয়ের প্রস্তাব দিল। দেশে নয়, দেবীর ইচ্ছায় বিয়ে হলো আমেরিকায়। জ্ঞানের মা বাবা আমেরিকায় গিয়ে ছেলের বিয়ে দিলেন। দু'বছর পর দেবী- জ্ঞান দেশে আসার পর জ্ঞানের মা-বাবা জাঁকজমকপূর্ণ এক রিসেপশন অনুষ্ঠান করলেন।‌ পুত্রবধূ দেবীর জন্য তাদের ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না।

এই অনুষ্ঠান শেষে আমেরিকায় ফিরে গিয়েই দেবী রূপ পাল্টে ফেলল, সে জ্ঞানকে বাধ্য করল পরিবার এবং বন্ধু-বান্ধবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে। জ্ঞানের সামাজিক মাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ, ফোনের দখল নিয়ে নিল (জ্ঞানের ফোনের সাথে দেবীর ফোন লিংক করে, যে কারণে জ্ঞান নিজের ফোন দিয়ে দেবীর অনুমতি ছাড়া কারো সাথে কথা বলতে পারতো না) এবং জ্ঞানের পাসপোর্ট লুকিয়ে ফেলল। শুধু মানসিক নির্যাতন নয়, জ্ঞানকে সে শারীরিকভাবেও নির্যাতন করতো। একবার রেগে গিয়ে জ্ঞানের হাতে কাঁটা চামচ বিঁধে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়ায় যখন জ্ঞান বলেছিল সে ৯১১ এ জানাবে, সঙ্গে সঙ্গে দেবী ছুরি হাতে নিয়ে বলে জ্ঞান ফোন করলেই সে নিজের হাত নিজে কেটে পুলিশকে বলবে জ্ঞান তার হাত কেটে দিয়েছে, যাতে পুলিশ জ্ঞানকে স্ত্রী নির্যাতনের দায়ে জেলে ঢোকায়! মাঝে মাঝেই রেগে গিয়ে দেবী জ্ঞানকে ল্যাপটপ দিয়ে মাথায় বাড়ি মেরে বলতো, কথা না শুনলে জ্ঞানের পরিবারকে তার পরিবার শেষ করে দিবে!

এই ঘটনাগুলো জ্ঞান শেয়ার করেছে তার দীর্ঘদিনের কয়েকজন পুরনো বন্ধুর সাথে। জ্ঞান সবার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করলেও তার বন্ধুরা এটা সহজে মেনে নিতে পারেনি, তাঁরা বিভিন্নভাবে জ্ঞানের অফিসের সময় যোগাযোগ করে কথা বলার চেষ্টা করতো, কখনো কথা বলতে পারতো অল্প কিছু সময়ের জন্য, সেই সময় জ্ঞান তাদের এসব বলেছিল।

কিন্তু জ্ঞানের মা- বাবা, আত্মীয়-স্বজন এভাবে লুকিয়ে কথা বলতেন না, তারা বুঝেছিলেন যে দেবী জানতে পারলে জ্ঞানের উপর আরো অত্যাচার করবে। তবু, থাকতে না পেরে, ছেলের কন্ঠস্বর শোনার জন্য জ্ঞানের মা একদিন জ্ঞান কে ফোন করেছিলেন, কারণ জ্ঞান বিয়ের আগে প্রতিদিন মায়ের সাথে একবার করে কথা বলতো। মায়ের ফোন রিসিভ করে দেবী। জ্ঞানের মাকে তুই তুকারি করে গালাগালি করে বলে, বাড়াবাড়ি করলে সে তাদের চরম শাস্তি দেবে। তারপর আর জ্ঞানের মা কখনো ফোন করেননি, ছেলের কন্ঠস্বর আর জীবনেও শুনতে পাননি। ‌

জ্ঞানের বাবা একটা কনফারেন্সে আমেরিকায় যাবার পর ছেলের সাথে দেখা করতে ছেলের বাসায় যান। তখন দেবী দরজা খুলে একই ভাবে গালাগালি করে বাসা থেকে তাড়িয়ে দেয়। এতেই ক্ষ্যান্ত হয় না, সে কোর্টে গিয়ে জ্ঞানের বাবা মা বোনের উপর restraining order নেয়, যাতে এরা কেউ দেবীর বাড়িতে যেতে চাইলে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে।

এই সম্পর্ক থেকে জ্ঞান সহজেই বের হতে পারতো। কেন বের হলো না তার কারণ অজ্ঞাত। হতে পারে দেবী জ্ঞানের পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করবে বলে ভয় পেয়ে, অথবা জ্ঞান হয়তো স্টকহোম সিন্ড্রম ভুগছিল যেখানে নির্যাতনকারীর প্রতি আনুগত্য জন্মে যায়।

এই দম বন্ধ করা পরিস্থিতিতে জ্ঞানের জন্য খোলা জানালা ছিল কেবল কাজ করে যাওয়া। তার প্রচুর রিসার্চ পেপার হলো, আর বিখ্যাত টেক কোম্পানিতে খুব তাড়াতাড়ি দক্ষ কর্মী হিসেবে পরিচিতি পেল।

দেবী কিন্তু বুঝতে পারছিল, এত নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও জ্ঞান সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যেতে পারে, তাকে ডিভোর্স দিতে পারে। হিসাব নিকাশে অতি পারদর্শী দেবী দেখলো ডিভোর্স হলে জ্ঞানের সমস্ত সম্পদের অর্ধেক সে পাবে। ইতিমধ্যেই সে জ্ঞানকে বাধ্য করেছে পৈত্রিক সম্পত্তি থেকে পাওনা অংশ বাবার কাছ থেকে লিখিয়ে নিতে। এই সম্পত্তির অর্ধেক, টেক কোম্পানিতে জ্ঞানের যে শেয়ার আছে তার অর্ধেক এবং জ্ঞানের জমানো টাকার অর্ধেক দেবী পাবে ডিভোর্স হলে। এটুকুই। কিন্তু দেবী বা তার উচ্চাভিলাষী ভাইয়ের বিবেচনায় এটা নগন্য প্রাপ্তি। বিশাল প্রাপ্তি হয় যদি জ্ঞানের লাইফ ইন্সুরেন্স, কোম্পানির করা লাইফ ইন্সুরেন্স, পেনশন ফান্ডের টাকা, স্টক সব পাওয়া যায়। দেবী হিসাব করে দেখেছে এসব মিলে কয়েক মিলিয়ন ডলার হবে, এই টাকা অনেক স্বস্তি দেবে। তাছাড়া বিয়ের সুবাদে পাওয়া আমেরিকান পাসপোর্টও দেবীর জন্য বিশাল স্বস্তি বয়ে এনেছে।

২)
বাংলাদেশ সময় বিকাল বেলা জ্ঞানের মা- বাবা জানতে পারলেন, আগের দিন তাদের ছেলে জ্ঞানকে অচেতন অবস্থায় আমেরিকার এক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জ্ঞানের ঠিক কি হয়েছে, কোনো অসুখ বা এক্সিডেন্ট কিনা সেটা তারা জানতে পারলেন না। জ্ঞানের বাবা-মা সেদিন রাতেই ছেলেকে দেখতে আমেরিকা রওয়ানা হন। দীর্ঘ দু বছর পর তারা ছেলের মুখ দেখতে পারবেন, ছেলে সুস্থ হয়ে উঠলে কথা বলবেন, এই ছিল তাদের আশা। আমেরিকায় পৌঁছে জানতে পারেন, জ্ঞান আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল, ৯১১ এ ফোন করে জ্ঞানকে হাসপাতালে পাঠায় দেবী, সে আছে আইসিইউতে অচেতন অবস্থায়। হাসপাতালে দেবী জানিয়েছে যে, সে জ্ঞানকে রান্নাঘরে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে নামিয়ে নেয়, তারপর ৯১১ তে ফোন করে। হাসপাতালে পরীক্ষা করে দেখা যায় যে, যখন তাকে হাসপাতালে আনা হয়, তার আগে প্রায় এক ঘন্টা যাবত জ্ঞানের ব্রেনে অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ থাকায় জ্ঞান যখন হাসপাতালে পৌঁছেছে তখন তার ব্রেন ডেড ছিল। দেবীর কথা অনুযায়ী হাসপাতালের রেকর্ডে লেখা হয় যে আত্মহত্যা করতে গিয়ে জ্ঞানের এই অবস্থা হয়েছে। কিন্তু এই রেকর্ড বানিয়ে দিয়েই দেবী নিখোঁজ হয়ে যায় পুরোপুরি। পরে তার ভাই পরিচিতদের ফোন করে জানান যে, স্বামীর আত্মহত্যা- চেষ্টা দেখে দেবী বিপর্যস্ত হয়ে নিজেও সুইসাইডাল হয়ে গেছে, তাই তার ভাই তাকে মানসিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।

অথচ তিন দিন পরেই হাসপাতালে আসে দেবী, দেখা গেল তার মধ্যে অস্থিরতার চিহ্নমাত্র নেই! সে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী জ্ঞানের ব্যাপারে সমস্ত সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার একমাত্র তারই আছে, কারণ সে জ্ঞানের স্ত্রী। আই সি ইউ তে বসে থাকার অধিকার দেবীকে দেয়া হলো, স্ত্রীর অধিকার হিসেবে। মৃতপ্রায় স্বামীর পাশে আইসিইউতে বসেই দেবী একটা পেপার সাবমিট করে ফেললো!

নয় দিন পর যখন লাইফ সাপোর্ট খুলে নেয়া হলো, তখনও মরদেহ কোথায় রাখা হবে সে ব্যাপারে কেবলমাত্র দেবীর সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, জ্ঞানের আত্মীয়রা জানতেও পারলেন না যে দেবী কি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত দিয়েই উধাও হয়ে গেল দেবী। শোনা গেল সে অন্য স্টেটে তার ভাইয়ের বাসায় গিয়েছে। জ্ঞানের মা- বাবা, আত্মীয়-স্বজন অনেক চেষ্টা করেও দেবীর সাথে যোগাযোগ করতে পারলেন না, জানতে পারলেন না জ্ঞানের মরদেহ কোথায় রাখা হয়েছে। যদিও এই মৃত্যু নিয়ে সকলের মনে অনেক প্রশ্ন ছিল, কিন্তু জ্ঞানের শোকাহত, হতভাগ্য মা- বাবার একমাত্র চাওয়া ছিল দীর্ঘদিনের অদেখা মৃত সন্তানের মুখ একবার দেখা এবং সন্তানের মৃতদেহ দেশে নিয়ে কবর দেয়া। কিন্তু দেবী এর কোনটি হতে দিচ্ছিল না। অন্য স্টেটে, ভাইয়ের বাড়িতে বসে সে জ্ঞানের কবর দেবার ব্যবস্থা করল নিজেদের শহরে। বললো, জ্ঞানের ইচ্ছা ছিল, তারা যে শহরে বসবাস করছে সেই শহরেই যেন তাকে কবর দেয়া হয়, তাই সে জ্ঞানের শেষ ইচ্ছা পূরণ করছে। একজন ৩২ বছর বয়স্ক সুস্থ সবল মানুষ, যে তার জীবন মাত্র শুরু করেছে, সে কেন নিজের কবর কোথায় দিতে হবে একথা বলতে গেল, এই প্রশ্ন অনেকের মনে জাগলেও দেবীর কাছে প্রশ্ন করার কোন সুযোগ ছিল না।

জ্ঞানের মা- বাবা যখন আইনের সাহায্য চাইলেন, যাতে জানতে পারেন তাদের ছেলের সাথে আসলে কি ঘটেছিল, তখন দেখলেন পুলিশ দেবীর অনুমতি ছাড়া কোনো তদন্ত করবে না। কারণ মার্কিন আইনে কেবলমাত্র মৃতের স্ত্রীকে অধিকার দেয়া হয়েছে স্বামীর ময়না তদন্ত, দাফন, আর্থিক সম্পদের বিষয়ে। দেবী ময়নাতদন্ত করতে কিছুতেই রাজি হল না। করোনারের রিপোর্টকে ময়না তদন্তের রিপোর্ট বলে আখ্যা দিয়ে দেবী বলল যে ময়নাতদন্তে হয়ে গেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে জ্ঞান আত্মহত্যা করেছে। দেবী আরো জানালো যে সে জ্ঞানকে এতটাই ভালোবাসে যে ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে জ্ঞানের মরদেহের কাটা ছেঁড়া সে সহ্য করতে পারবে না...

এই সময় শুভবুদ্ধি সম্পন্ন অনেক মানুষ, এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে এগিয়ে এলেন। তাঁরা দাবি তুললেন, জ্ঞানের মৃত্যুর তদন্ত হোক, সত্য প্রকাশিত হোক। তাঁরা জানতে চাইলেন, জ্ঞান কি সত্যি আত্মহত্যা করেছিল? যদি করে থাকে, তাহলে কি এমন পরিস্থিতি হয়েছিল যে তাকে আত্মহত্যা করতে হলো এভাবে? কেন সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতলে না নিয়ে তাকে এক ঘণ্টা পরে হাসপাতালে নেয়া হলো? বাড়িতে একমাত্র দেবী ছিল, জ্ঞান যখন আত্মহত্যা করছিল সেই সময় দেবী কি করছিল?

প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া গেল না!

কয়েক মিলিয়ন ডলারের মালিক হওয়া থেকে দেবী মাত্র এক ধাপ দূরে আছে, কোনভাবে জ্ঞানের কবর তাদের শহরে দেয়া গেলেই আর কোন তদন্ত হবে না।

ছবি সূত্র: view this link
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩৪
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ১৯৬

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:১৪



আমাদের এলাকার এক কসাই একটা উট এনেছে।
উট নিয়ে তার লাফালাফির শেষ নেই। খলিল কসাইয়ের চেয়ে বেশি লাফালাফি করছে ইউটুবাররা। ইউটুবাররা নিজেদের সাংবাদিক ভাবতে শুরু করেছে। প্রচন্ড ছেচড়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে “উপজাতি” নাকি “আদিবাসী”? আন্তর্জাতিক আইন ও ইতিহাসের নির্ভেজাল সত্য!​

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৭


সূচনা ও প্রেক্ষাপট:
লেখক পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০০১ সালে তিনি যখন সেখানে দায়িত্ব পালন করেন, তখন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে 'উপজাতীয়' (Tribal) হিসেবে ডাকা হতো। কিন্তু ২০১৫-১৬ সালের দিকে সেখানে পুনরায় পোস্টিং পাওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

হঠাৎ কেন ঢাকায় র প্রধান?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:২২


দিল্লী দখল ঠেকাতে ঢাকায় চলে এলেন র প্রধান!

হ্যাঁ, ঠিকই শুনলেন। ক'দিন ঐ র‍্যাডিসন ব্লুতে বসে অনেকের হাতে-পায়ে ধরলেন; বললেন, "তোমরা প্লিজ দিল্লী আক্রমণ করো না। আমাদের মিসাইল, অস্ত্র সব... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবী!

লিখেছেন করুণাধারা, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩৩



১)
দেবী খুবই বুদ্ধিমতী এবং সুন্দরী। এক উচ্চাভিলাষী পরিবারে দেবীর জন্ম, এমনই উচ্চাভিলাষী যে তাদের একমাত্র ভাবনা কীভাবে সবাইকে ছাড়িয়ে উপরে ওঠা যায়! দেবীর যখন জন্ম হলো তখন তার ভাইয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

র-প্রধানের ঢাকা সফর: খবর শুনেই হাসপাতালে ভর্তি পাকিস্তানের হাইকমিশনার !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:১৭


রসিকতা বাদ দিয়ে বলি, দুটি ঘটনাই সত্যি। বাংলাদেশে RAW এর প্রধান পরাগ জৈন এসেছেন এবং পাকিস্তানের হাইকমিশনার এখন হাসপাতালে আছেন। দুটি ঘটনা আসলে পরস্পরবিচ্ছিন্ন, একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×