আমায় দুঃখ ছাড়া ছেড়ে গেছে সবাই। সবাই বলতে তেমন ছিলই বা কে? যা কিছু ছিল তা ঐ ধরুন পুকুরের পিচ্ছিল পাঁচ নম্বর সিঁড়িটা, স্কুলের বারান্দা, জৈষ্ঠের গনগনে দুপুর, স্কুল বা কলেজ ফিরতি একটা মেয়ের হাতে দশ টাকার ফ্রুটি, মামার বাড়ি, বকুল গাছটা, আর.... ! এই 'আর'টা বড়ো ভাবায়। আর কি সত্যিই কেউ ছিল? সেই ধবধবে সাদা চশমা পরা মেয়েটি কেমন আছে? কোথায় আছে? যে হাতে বেলী ফুলের মালা নিয়ে অপেক্ষা করতো বড়ো রাস্তার ধারে, যার অপেক্ষা আমি অবলীলায় পায়ে দলে গেছি! আচ্ছা, তারই দীর্ঘশ্বাসে এই অন্তহীন অপেক্ষা বুঝি!
আমি জানি আমার সাথে অনেকেরই আর কখনও দেখা হবে না, আমাদের অনেকের সাথে শেষ দেখা হয়ে গেছে। ঘরে ফেরা হয়নি বহুদিন, যে মেয়েটির দু'চোখে তাকালে নবমীর রাতের মতো শঙ্কায় বুকটা মুচড়ে ওঠে, সে ও ফিরে যাবে দশমীতে। ঠিক যেমন ভাবে নক্ষত্রের মৃত্যুতে অশৌচ পালন না করেই লোলুপ মন কেবল চেয়ে বসে!
হাইস্কুলে পড়ার সময় যাকে ভালোবাসি বলতাম, সে ধবধবে সুন্দরী। এই ধবধবে সুন্দরীর জন্য প্রতিদিন রাস্তার পাশে অপেক্ষা করতাম,চোখে চোখে রাখতাম। মাঝরাতে লুকিয়ে লুকিয়ে তার মায়ের ফোনে ফোন করতাম। ভয়ে ভয়ে দেখা করতে যেতাম। তার এলাকার দাদাদের সাথে অঞ্জন দত্তের মতো পাঙ্গাও নিতাম। সে যে কী থ্রিলিং ব্যাপার স্যাপার। তারপর অজস্র দিন পার হয়ে গেছে। দাড়ির হতাশা থেকে মুখ-ভর্তি বিভর্ষ দাড়ি ভরে গেছে।
তবে আমি মেনে নিয়েছি শহরতলীর সেই নির্দিষ্ট বাড়ির দরজাটি বন্ধ হয়ে গেছে চিরতরে। আজীবনের মতো ফুরিয়ে গেছে হাইস্কুল/কলেজের দুপুর গুলো। ফুরিয়ে গেছে যশোরের বাসা, নাড়ীর টান, ধোঁয়া ওঠা চা, বিস্বাদ মেসের খাবার, সিগারেটের গন্ধ। ফুরিয়ে এসেছে উৎসবে বাড়ি ফেরার তাগিদ।
জন্মদিনের শুভেচ্ছা বার্তার ভিড়ে আমি জানি আমার আপন মানুষ নেই! বাবার ডাক, মায়ের আঁচল, গরম ভাত, গ্রামের সংবাদ, নতুন জামা, শীতে রোদ, দাদুর শাল।
এখন পরীক্ষার আগের রাতের চিন্তাটা আর নেই। এখন রোজ নতুন নতুন পরীক্ষা। নতুন নতুন ব্যর্থতা। হাতে গোনা কয়েকটায় পাশ করি, বাকি জীবন জুড়ে শুধু...! প্রতিটা ব্যর্থতার বেশে, প্রতিটা বিচ্ছেদেব় বেশে মৃত্যু আসে সারাজীবন ধরে, সন্তর্পনে। আমরা কেবল মন্ত্রমুগ্ধ শিশুর মতো অপেক্ষা করি! এতো কিছুর পরেও এই যে বেঁচে থাকা, তা কি কেবল নিয়তি? না'কি যাবতীয় যন্ত্রণা আদতে গত জন্মের শোক? আমি জানি না! জানতেও চায় না! তবে আমরা বাঁচি কিসের জন্য?
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ১২:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


