somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কয়েকশো চকচকে নোট

২২ শে জুন, ২০১৭ সকাল ১১:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




লেদোয়ার চৌধুরী আমার বিশেষ বন্ধু মানুষ। বিশেষ বলছি এই জন্য যে, কোনকালে আমাদের বন্ধুত্বের সূচনা হয়েছিল বলতে পারি না। হতে পারে সেটা শৈশবের কোন রৌদ্রঝড়া দুপুরে ডাংগুলি খেলার মাঠে অথবা গোধূলীর শেষার্ধে গোল্লাছুটের হাত ধরে কিংবা ঝিমধরানো সন্ধ্যায় খড়ের গাদায় বসে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে। আমাদের বন্ধুত্ব সম্পর্কে বুঝতে হলে আরেকটু গভীরে যেতে হবে। কর্মের খাতিরে আমাকে কিছুকাল দেশের বাহিরে কাটাতে হয়েছিল তখনো সে নিয়ম করে চিঠি লিখতো আমাকে। আমি দেশে ফেরার পর আমাদের বন্ধুত্বটা এতটা গভীর হয়ে উঠলো যে, আমরা একে অপরের ছায়া সঙ্গী হয়ে উঠলাম। এই যে গভীরতা, দুয়ের মিলিত সঞ্চিবনী শক্তির লুটোপুটি, আত্মার বিমোহ শান্তি স্রোতধারার মত বহমান এগুলো সম্ভবপর হয়েছিল সম্ভবত আমরা দুজন বিপত্নীক বলেই। আরেকটি জায়গায় দুজনের সমানুপাতিক আগ্রহ ছিল যেখানটায় সেটা টাকা বৈ দ্বিতীয় কিছু নয়। তবে সেটা ছিল গোপনে, বিভক্ত। অর্থ্যাৎ এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও অর্থ সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয়াদি নিয়ে আমাদের মাঝে কোন আলাপই হতো না।

লেদোয়ার চৌধুরী হঠাৎ করে অগাধ ধনসম্পদের মালিক হলো কিভাবে এটা নিয়ে লোকজন যেমন চিন্তা করে তেমনি তার কি পরিমাণ অর্থকড়ি রয়েছে সেটা নিয়েও তাদের ভাবনার অন্ত নেই। লোকেদের এমনও বলতে শুনেছি যে, লেদেয়ারের যে পরিমাণ নগদ টাকা এক গাড়ি রাবার ব্যান্ড দিয়েও নাকি সেটা বাঁধা অসম্ভব। লোকেদের ধারণা যে নেহাত মন্দ নয় সেটার একটা আভাস পাওয়া গেল একদিন।

সেদিন সম্ভবত লালপানি পেটে একটু বেশিই পড়েছিল।
-বন্ধু! তুমি কি ধারণা করতে পারো আমার কত টাকা রয়েছে?
-এসব কথা থাক। অন্যকিছু বলো।
-থাকবে কেন? আমার একমাত্র প্রাণপ্রিয় বন্ধু হিসেবে এটা জানা তোমার একান্ত প্রয়োজন। তুমি কি জানো আমি আমার সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছি?
-সেকি! কেন?
-টাকা। বন্ধু টাকা। বুক ভরে টাকার গন্ধ নেওয়ার যে কি সুখ সে তুমি বুঝবে না।
-সত্যি বুঝতে পারছি না।
-চলো বন্ধুবর। তুমি যেখানে যাচ্ছো সেখানে আমি ব্যতিত অন্যকারো পায়ের ছাপ অব্দি পড়েনি এর আগে কোনদিন।

তালা খুলে আমরা যে ঘরটাতে স্থির হয়ে দাঁড়ালাম তার আদ্যোপান্ত চকচকে নতুন নোটে ভর্তি। ধাতস্থ হতে কয়েক মিনিট কেটে গেল আমার। ঘরটাকে একটি মাঝারি রকমের টাকশাল ব্যতীত অন্যকিছু ভাবাই যাচ্ছে না। থরে থরে নতুন টাকার বান্ডিল সাজানো। ঘর ভর্তি টাকার ট-ট গন্ধ। কিছু বলার আগেই সে এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোকপাত করলো যার সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ওয়াকিবহাল ছিলাম না আমি।
-কঠিন একটা অসুখে পড়েছি আমি। প্রতিদিন দশ বান্ডিল টাকা আমাকে খেতে হয় বন্ধু। তাই এই ব্যবস্থা। এভাবে কতদিন বাঁচতে পারবো বলে তোমার মনে হয়?
-কি বলছো এসব? তুমি কি পাগল হলে?
-হাঃ হাঃ। থাক এসব কথা। চলো বেরুনো যাক।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে সেদিনের মত প্রস্থান করলাম।

প্রায়শ তার টাকা সম্পর্কিত স্থুল রসিকতা আমার চরম বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ালো। অপরদিকে ঠিক একই সময়ে এক নারীর প্রেমে পড়লাম আমি। এই সামান্য বিরক্তি ও প্রেমই আমাকে তার বন্ধুত্ব থেকে ধীরে ধীরে দূরে ঠেলে দিল। তার বাসায় যাওয়া এক পর্যায়ে বন্ধই করে দিলাম।

একবছর ঘুরতে না ঘুরতেই দুঃসংবাদটি পেলাম আমি। ছুটে গেলাম বন্ধুর কাছে। তাকে দেখে সনাক্ত করাটাই আমার পক্ষে যুদ্ধসম মনে হলো। আয়তাকার লৌহ খাটিয়ায় সাদা কাপড়ে আচ্ছাদিত কঙ্কালসদৃশ শুয়ে থাকা মানুষটিই যে বন্ধুবর লেদোয়ার চৌধুরী, কেউ একজন না বললে আমি বুঝতেই পারতাম না।
-হায় বন্ধু আমার! তুমি এভাবে যেতে পারো না!
দুটো চোখ অাদ্র হয়ে উঠলো সহসাই। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকজন মিলে বন্ধুর লাশটা কাঁধে তুলে কবরের দিকে হেঁটে চললাম। বন্ধুর লাশটা শেষবারের মত ঠেলে দিতেই আমার হাত ছুয়ে দুমড়ানো মোচড়ানো কয়েকশো চকচকে নোটে ভর্তি হয়ে গেল ছোট্ট গর্তটা।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুন, ২০১৮ দুপুর ১:৫৩
১৪টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Humans are (not) from Earth-রূপের বৈচিত্র্য ও আঞ্চলিক প্রোগ্রামিং

লিখেছেন শেরজা তপন, ১৬ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৩৩

প্রশ্ন ও প্রারম্ভিক জিজ্ঞাসাঃ
আমাদের মনে কি এমন প্রশ্নের উদয় হয় না যে,"আমরা যখন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের অবয়ব, গায়ের রঙ, চুল কিংবা পুরুষদের মুখের দাড়ি-গোঁফের দিকে তাকাই, তখন এক অদ্ভুত... ...বাকিটুকু পড়ুন

শরীফ থেকে শরীফা ইস্যু কেন চাঙা হচ্ছে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:১৭


দেশে ট্রান্সজেন্ডার ও সমকামী ইস্যু নিয়ে জল ঘোলা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমকামী ইস্যুতে একের পর এক বহিষ্কারের ঘটনার মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে দুই... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্প - অভাগীর সুর ব্যঞ্জনা – পর্ব ১ -

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:০৮


শহরটা রাতে কখনও পুরো ঘুমোয় না। কেউ প্রেমে জাগে, কেউ স্বপ্নে, কেউ অপরাধবোধে।আর কেউ কেউ জেগে থাকে অভাবে। তিনতলার ছোট্ট ভাড়া-বাড়িটির জানালার পাশে বসে শিরীন হারমোনিয়ামের রিডে আঙুল রাখল।

বাইরে তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

জন্মদিনে তাহাদের জন্য শুভকামনা। আমার জন্মদিনের স্মৃতি...

লিখেছেন করুণাধারা, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৫৬



একেকটা জন্মদিন পার করা মানে জীবন বইয়ের একেকটা পৃষ্ঠা পড়ে ফেলা, কয়েক বছর পরপর সেই বইয়ের একেক অধ্যায় শেষ হয়! বইটা ট্রাজেডি না কমেডি, একেবারে শেষ পর্যন্ত না পৌঁছালে তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

চুপ - একদম চুপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



আমরা শুধু চুপ থাকবো -
আমাদের কথা বলার মুখ নেই
আমাদের দেখার মতো চোখ নেই
আমাদের শোনার মতো কান নেই
মনে হয়, মনে হয় -
আমাদের হাত-পাও নেই।

আমাদের বিবেক নেই
আমাদের চিন্তা-চেতনাও নেই
আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×