
লেদোয়ার চৌধুরী আমার বিশেষ বন্ধু মানুষ। বিশেষ বলছি এই জন্য যে, কোনকালে আমাদের বন্ধুত্বের সূচনা হয়েছিল বলতে পারি না। হতে পারে সেটা শৈশবের কোন রৌদ্রঝড়া দুপুরে ডাংগুলি খেলার মাঠে অথবা গোধূলীর শেষার্ধে গোল্লাছুটের হাত ধরে কিংবা ঝিমধরানো সন্ধ্যায় খড়ের গাদায় বসে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে। আমাদের বন্ধুত্ব সম্পর্কে বুঝতে হলে আরেকটু গভীরে যেতে হবে। কর্মের খাতিরে আমাকে কিছুকাল দেশের বাহিরে কাটাতে হয়েছিল তখনো সে নিয়ম করে চিঠি লিখতো আমাকে। আমি দেশে ফেরার পর আমাদের বন্ধুত্বটা এতটা গভীর হয়ে উঠলো যে, আমরা একে অপরের ছায়া সঙ্গী হয়ে উঠলাম। এই যে গভীরতা, দুয়ের মিলিত সঞ্চিবনী শক্তির লুটোপুটি, আত্মার বিমোহ শান্তি স্রোতধারার মত বহমান এগুলো সম্ভবপর হয়েছিল সম্ভবত আমরা দুজন বিপত্নীক বলেই। আরেকটি জায়গায় দুজনের সমানুপাতিক আগ্রহ ছিল যেখানটায় সেটা টাকা বৈ দ্বিতীয় কিছু নয়। তবে সেটা ছিল গোপনে, বিভক্ত। অর্থ্যাৎ এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও অর্থ সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয়াদি নিয়ে আমাদের মাঝে কোন আলাপই হতো না।
লেদোয়ার চৌধুরী হঠাৎ করে অগাধ ধনসম্পদের মালিক হলো কিভাবে এটা নিয়ে লোকজন যেমন চিন্তা করে তেমনি তার কি পরিমাণ অর্থকড়ি রয়েছে সেটা নিয়েও তাদের ভাবনার অন্ত নেই। লোকেদের এমনও বলতে শুনেছি যে, লেদেয়ারের যে পরিমাণ নগদ টাকা এক গাড়ি রাবার ব্যান্ড দিয়েও নাকি সেটা বাঁধা অসম্ভব। লোকেদের ধারণা যে নেহাত মন্দ নয় সেটার একটা আভাস পাওয়া গেল একদিন।
সেদিন সম্ভবত লালপানি পেটে একটু বেশিই পড়েছিল।
-বন্ধু! তুমি কি ধারণা করতে পারো আমার কত টাকা রয়েছে?
-এসব কথা থাক। অন্যকিছু বলো।
-থাকবে কেন? আমার একমাত্র প্রাণপ্রিয় বন্ধু হিসেবে এটা জানা তোমার একান্ত প্রয়োজন। তুমি কি জানো আমি আমার সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছি?
-সেকি! কেন?
-টাকা। বন্ধু টাকা। বুক ভরে টাকার গন্ধ নেওয়ার যে কি সুখ সে তুমি বুঝবে না।
-সত্যি বুঝতে পারছি না।
-চলো বন্ধুবর। তুমি যেখানে যাচ্ছো সেখানে আমি ব্যতিত অন্যকারো পায়ের ছাপ অব্দি পড়েনি এর আগে কোনদিন।
তালা খুলে আমরা যে ঘরটাতে স্থির হয়ে দাঁড়ালাম তার আদ্যোপান্ত চকচকে নতুন নোটে ভর্তি। ধাতস্থ হতে কয়েক মিনিট কেটে গেল আমার। ঘরটাকে একটি মাঝারি রকমের টাকশাল ব্যতীত অন্যকিছু ভাবাই যাচ্ছে না। থরে থরে নতুন টাকার বান্ডিল সাজানো। ঘর ভর্তি টাকার ট-ট গন্ধ। কিছু বলার আগেই সে এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোকপাত করলো যার সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ওয়াকিবহাল ছিলাম না আমি।
-কঠিন একটা অসুখে পড়েছি আমি। প্রতিদিন দশ বান্ডিল টাকা আমাকে খেতে হয় বন্ধু। তাই এই ব্যবস্থা। এভাবে কতদিন বাঁচতে পারবো বলে তোমার মনে হয়?
-কি বলছো এসব? তুমি কি পাগল হলে?
-হাঃ হাঃ। থাক এসব কথা। চলো বেরুনো যাক।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে সেদিনের মত প্রস্থান করলাম।
প্রায়শ তার টাকা সম্পর্কিত স্থুল রসিকতা আমার চরম বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ালো। অপরদিকে ঠিক একই সময়ে এক নারীর প্রেমে পড়লাম আমি। এই সামান্য বিরক্তি ও প্রেমই আমাকে তার বন্ধুত্ব থেকে ধীরে ধীরে দূরে ঠেলে দিল। তার বাসায় যাওয়া এক পর্যায়ে বন্ধই করে দিলাম।
একবছর ঘুরতে না ঘুরতেই দুঃসংবাদটি পেলাম আমি। ছুটে গেলাম বন্ধুর কাছে। তাকে দেখে সনাক্ত করাটাই আমার পক্ষে যুদ্ধসম মনে হলো। আয়তাকার লৌহ খাটিয়ায় সাদা কাপড়ে আচ্ছাদিত কঙ্কালসদৃশ শুয়ে থাকা মানুষটিই যে বন্ধুবর লেদোয়ার চৌধুরী, কেউ একজন না বললে আমি বুঝতেই পারতাম না।
-হায় বন্ধু আমার! তুমি এভাবে যেতে পারো না!
দুটো চোখ অাদ্র হয়ে উঠলো সহসাই। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকজন মিলে বন্ধুর লাশটা কাঁধে তুলে কবরের দিকে হেঁটে চললাম। বন্ধুর লাশটা শেষবারের মত ঠেলে দিতেই আমার হাত ছুয়ে দুমড়ানো মোচড়ানো কয়েকশো চকচকে নোটে ভর্তি হয়ে গেল ছোট্ট গর্তটা।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুন, ২০১৮ দুপুর ১:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




