somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জীবন্মৃত লেখক

০৫ ই মার্চ, ২০১৬ দুপুর ১:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সাতসকালে পরিচিত এক লেখকের সাথে দেখা। ভদ্রলোকের হাতে ব্যাগ, পরনে জুতসই কেতাদুরস্ত পোশাক। অফিস-আদালতে যাবার যোগ্য সাজ। বছর তিনেক আগে পরিচয় হয়েছিল। বইমেলায় বইখাতা বের করেছেন, ব্লগও লিখতেন। সেসময় পাঞ্জাবী ফতুয়া গায়ে আগুনঝরা কথাবার্তা বলতেন। দেশ বদলে দিতে হবে, বুর্জোয়া উৎখাত করতে হবে, সাম্যের গান গাইতে এবং গাওয়াতে হবে। কেউ না গাইলে রাস্তায় চিৎ করে টুঁটি চেপে গান গাওয়ানো হবে, ইত্যাদি।

পুরনো সাজের সাথে নতুন সাজ মিলছে না। আমিও আর আমি নেই। অপরিকল্পিত বৃক্ষনিধনের ফলে সুন্দরবন আরও ছোট হচ্ছে। খুলনা থেকে ফেরার সময় আমার উর্বর গালে সেই সুন্দরবনের একাংশ সাথে নিয়ে এসেছি। নিধনহীন ও উৎপাতহীন পরিবেশে ক্ষুদে বনাঞ্চল ভালোই আছে। চেহারার এই নতুন ভূগোল নিয়ে যখন চেনাজানা কারো সামনে হাজির হই, পরিচিতজনও সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। কে এই জঙ্গী?

আজও এর ব্যতিক্রম হল না। লেখক সাহেব ইতস্তত করে বললেন ,'আপনারে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।'
গাল থেকে দাঁড়িগোঁফ খুলে ফেলার ব্যবস্থা থাকলে আমি একটান দিয়ে খুলে ফেলে চিক্কুর দিতাম, 'অহন চিনছেন?' সঙ্গত কারনেই সেটা সম্ভব হল না। নাম বলতে না বলতেই জড়িয়ে ধরলেন। অতঃপর রাস্তার পাশে প্রকাশ্যে চা পান করার উদাত্ত আহ্বান, ভাষাবিদপুত্র অনন্য আজাদের প্রবচনগুচ্ছে আছে, 'প্রকাশ্যে চুম্বন খাও, চা খেও না'। সে প্রবচনকে কনিষ্ঠাঙ্গুলি দেখিয়ে আমাদের চা চক্র সম্পন্ন হল ।

লেখালেখি কেমন চলছে, জানতে চাইলে কিছুটা বিমর্ষ হয়ে যা বললেন-
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বছর দুয়েক শিল্পসাহিত্য নিয়ে কাটিয়েছেন। পরিবার ভেবেছিল, তিনি বোধহয় চাকরি-বাকরি পেয়ে যাবেন কারন দিনরাত বইখাতা নিয়ে থাকেন। 'এই বইখাতা যে সেই বইখাতা নহে' এটা বুঝতে তাদের দেরি হয়েছে। লেখক ভদ্রলোক আশায় ছিলেন, পিতৃদত্ত বাড়িতে বসবাস করে জীবন পার করে দেয়া যাবে। কিন্তু সেই পিতৃদেব হঠাৎ ভীষ্মদেব হয়ে উঠলেন। সাফ জানিয়ে দিলেন, 'আকাইম্মার ধাড়ি' লালনাপালনের কোন ইচ্ছে তার নেই। যদি অচিরেই চাকরি না জোটে, তবে বাড়ি ছাড়তে হবে। লেখালেখি শিকেয় তুলে মাসছয়েক লেগে রইলেন। সরকারি চাকুরির সোনার হরিণ হাতে এলো। চাকুরিযন্ত্রণায় তিনি এমনিতেই কাতর ছিলেন, তার উপর 'মড়ার উপর খাড়ার ঘা' স্টাইলে পারিবারিকভাবে বিয়ে ঠিক করা হল। বাপের ভয়ে চাকরিতে ঢুকেছিলেন, বউয়ের ভয়ে সুবোধ স্বামী সাজার চেষ্টা করলেন। টিএসসি কিংবা শাহবাগের আড্ডায় যাতায়াত কমে গেল। সমকালীন সাহিত্যের গুষ্ঠিউদ্ধারের মহৎ আলোচনা সভাগুলোতে হাজিরা কমতে লাগল। রাতে ল্যাপটপে দুয়েকটা লেখা লিখতে বসলে বউ ভিন্ন কিছু ভেবে বসে কিনা, এই ভয়ে অফিসের কম্পিউটারে অল্পবিস্তর লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এরই মধ্যে পুরনো একটি লেখা বইমেলার একটি গল্প সংকলনে ছাপা হয়। লেখার কাহিনী মোটামুটি এমন, অফিসের এক বস অধনস্ত এক মহিলা কলিগের শ্লীলতাহানি করে এবং পরবর্তীতে সেই মহিলার জীবনে কিভাবে দুর্যোগ নেমে আসে। শ্লীলতাহানির বর্ণনা বিশদ ও শৈল্পিকভাবে লেখার ফল হাতেনাতে পেয়েছেন তিনি। সেই বইটি কিভাবে কিভাবে যেন তার বাসায় চলে এসেছে। বউসহ বাড়ির অনেকের ধারনা, এটা তারই আত্মজীবনী। তিনিই বোধহয় সেই ধর্ষক, তা না হলে এতো বিস্তারিত বিবরণ তিনি কিভাবে লিখলেন? ভদ্রলোক হয়তো রাগে দুঃখে ক্ষোভে নিজের চুল ছিঁড়ে ফেলতেন, কিন্তু সেখানেও সংকট। সাহিত্যের সাথে গত দু'বছরে চুলগুলোও তাকে ছেড়ে গেছে।

বিদায়ের সময় মাথায় চুল গজানোর ওষুধপত্র জানতে চাইলেন। এমন বেদনাবিধুর কাহিনী শোনার পর সম্ভব হলে আমি নিজের গাল থেকে কিছু দাঁড়িই দান করে দিতাম। রক্ত কিংবা কিডনি দেয়ার মতো চুলদাঁড়ি দান করার ব্যবস্থা থাকলে ভালো হত।

কিন্তু হায়!
আমাদের সমকালীন বিজ্ঞানের সে ক্ষমতা নেই,
আমাদের পরিবারগুলোর নেই শিল্প লালনের ক্ষমতা।

সৃষ্টিতে অক্ষমতাই আজ সৃষ্টির মাঝে টিকে থাকার মোক্ষমতম শর্ত।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মার্চ, ২০১৬ দুপুর ১:০০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাবা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান, ছেলে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২১

মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে অনেক হৃদয়বিদারক ঘটনা আছে। কুমিল্লার এমনই একটি ঘটনার কথা বলেছেন একজন মুক্তিযোদ্ধা -

কুমিল্লা শহরের উত্তর দিকে রসুল আহমদ নামে একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান।... ...বাকিটুকু পড়ুন

শব্দের সীমা (জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সতর্কতা!)

লিখেছেন আবু সিদ, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪০

“সুন্দর শব্দ মধুচক্রের মতো, আত্মার জন্য সুমিষ্ট এবং অস্থির জন্য আরোগ্য।” — প্রবচন ১৬:২৪, বাইবেল

প্রতিদিন বাসা থেকে বের হলেই হাজারো শব্দ উড়ে এসে আছড়ে পড়ে আমাদের কানে। দূর ও নিকট... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন কর্মী ও তার ন্যায্য পাওনা

লিখেছেন কিরকুট, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২০

বাংলাদেশের বেসরকারি খাত নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা সাধারণত বিনিয়োগ, মুনাফা, ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি, বাজার সম্প্রসারণ কিংবা উদ্যোক্তার ঝুঁকির কথা ভাবি। কিন্তু এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ কর্মীর শ্রম নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটের জন্য দায়ী কে?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১১



২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও সরকারি স্থাপনাগুলোতে আকস্মিক বড় ধরনের বিমান হামলা চালায়।প্রথম দফার হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীসহ বেশ কয়েকজন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আ-তে আনন্দবাজার, আ-তে আওয়ামী লীগ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১৫


ইন্টারনেটে খবর পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা শিরোনাম সামনে এলো। পড়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বুঝি বিশাল কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। শিরোনাম, “আধ পয়সা বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×