ডিসপেনসারিতে কিংবা চা বাগানের হাসপাতালে খুব কম শ্রমিকই প্রয়োজনীয় ওষুধ পায়। ওষুধ,চিকিৎসা সরঞ্চামসহ চা বাগান হসপিটালগুলোতে উপযুক্ত চিকিৎসকের মারাত্মক অভাব লেগেই আছে। ফলে চিকিৎসা সুবিধার অভাবে নানা রোগে বিপন্ন হয়ে পড়ছে শ্রমিকদের জীবন। স্বাধীনতার পর দেশের বৃহৎ চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর জন্য শ্রম মন্ত্রনালয় মাত্র ২টি হাসপাতাল নির্মান করেছিল। তার মধ্যে সিলেট বিভাগের ৫০ শয্যা হাসপাতালটি ছিল অন্যতম। ১৯৮৪ সালে তৎকালীন এরশাদ সরকারের আমলে স্থানীয় এক অধিবাসীর কাছ থেকে জমি অধিগ্রহন করে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যায়ে শ্রীমঙ্গলের চা শ্রমিকদের জন্য শ্রম মন্ত্রনালয় এ হাসপাতালটি স্থাপন করে বাংলাদেশ চা বোর্ডের কাছে হস্তান্তর করে। অপরদিকে অন্যটি খুলনা বিভাগের শ্রমিকদের জন্য নির্মান করা হয় যা হস্থান্তর করা হয়েছিল শ্রমকল্যান মন্ত্রনালয়ের হাতে। কিন্তু শ্রমকল্যান মন্ত্রনালয় সেটা গ্রহন না করায় ঐ সময়ই তা বন্ধ হয়ে গেলে দেশের শ্রমিকদের জন্য একমাত্র শ্রীমঙ্গল ৫০ শয্যা হাসপাতালটি চালু ছিল। এবং এটিই ছিল চা শ্রমিকদের একমাত্র হাসপাতাল।
কিন্তু বিগত জোট সরকারের শেষ সময়ে এসে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান শ্রীমঙ্গল উপজেলায় দেশের বৃহৎ চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর জন্য নির্মিত ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটি বন্ধ করে দিয়ে সেখানে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের স্কুল ও আবাসিক ভবন এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তৎকালীন সময়ে এই ক্ষমতাধর মন্ত্রীর বিরুপ আচরণের প্রতিবাদ করতে সাহস করেননি এলাকার সাধারণ মানুষ। নির্বিঘ্নে চিকিৎসা সেবার পরিবর্তে স্কুল নির্মানের টেন্ডার দেওয়া হয় তার এক অনুসারীকে। মন্ত্রী নিজে এসে জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে বাহাবা কুড়িয়ে নেন জোট সরকারের। কিন্তু অবহেলিত চা জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবা চাপা পড়ে যায় তার টাইলস খচিত ভিত্তি প্রস্তরের নিচে।
জানা যায়, শ্রীমঙ্গল উপজেলার শহরতলী ইছবপুর এলাকায় এরশাদ সরকারের আমলে চা জনগোষ্ঠীর উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদানের লক্ষে সেখানে ৫০ শয্যা বিশিষ্ঠ একটি আধুনিক হাসপাতাল তৈরী করা হয়। কিন্তু বিগত জোট সরকার মতায় আসার পর এই হাসপাতালকে বন্ধ করে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন স্কুল ও আবাসিক ভবন নির্মানের উদ্দোগ নেয়া হয়। সে সময় অমানবিক এই কাজের প্রতিবাদে কেউ সাহস না করতে পারলেও উক্ত এলাকার বাসিন্দা ইউসুফ আলী নামের এক ব্যক্তির রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০০৪ সালের ২৭ জুলাই বিচারপতি মোঃ আব্দুল ওহাব মিয়া ও বিচারপতি জিনাত আরা সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন ব্রেঞ্চ ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালকে সিলেট শিাবোর্ডের রেসিডেনসিয়্যাল মডেল স্ড়্গুলে রুপান্তরিত করার সরকারী উদ্যোগের উপর রুলনিশি জারী করে। তাতে বলা হয়, হাসপাতালের বর্তমান অবকাঠামো কোন পরিবর্তন না করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কারন দর্শানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশিষ্ট কর্তৃপ সমুহকে। হাইকোর্ট হাসপাতালের কাগজ, ফাইল ও জিনিষপত্রের উপর স্থগিতাদেশ দিলেও জোট সরকারে কতিপয় সুবিধাভোগী গোষ্ঠী,সে সময় কেজির দরে কোটি কোটি টাকার সম্পদ বিক্রি করে দেয়।
সংশিষ্ট সুত্র জানায়, বিগত জোট সরকার তাদের ব্যাক্তিগত ফায়দা হাসিলের জন্য শ্রীমঙ্গল উপজেলাধীন ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সংলগ্ন ইছবপুর এলাকায় স্থাপিত ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটিকে সংশিষ্ট মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে গত ২০০৪ সালের ১২ মে সিলেট শিক্ষাবোর্ডের রেসিডেনসিয়্যাল মডেল স্কুলে রুপান্তরিত করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের কাছে একটি প্রস্তাব দেয়। সেই সূত্র ধরে সাবেক অর্থমন্ত্রীর আস্তাভাজন মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। এদিকে, এলাকাবাসী মন্ত্রীর এই হঠকারী সিদ্বান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠে। এ নিয়ে একাধিক পত্রপত্রিকায় লেখালেখি ছাড়াও চলে মিছিল, মিটিং, সড়ক অবরোধ। অবশেষে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা হলে হাইকোর্ট নির্মান প্রক্রিয়ার উপর স্থগিতাদেশ জারী করে। কিন্তু সংশিষ্ট কর্তৃপ হাইকোর্টের নির্দেশ তোয়াক্কা না করে হাসপাতাল বন্ধ করে জোট সরকারের স্থানীয় সন্ত্রাসীদের দিয়ে হাসপাতালের কর্মকর্তা -কর্মচারীদের বের করে সেখানে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এক পর্যায়ে মামলাটি হাইকোর্ট থেকে সুপ্রীম কোর্টে স্থানান্তর করা হয়। ২০০৫ সালের ৩ জুলাই সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরীর বেঞ্চ দুই সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দেয়। পরবর্তীতে একই বছরের ১৯ জুলাই থেকে ২৯ আগষ্ট পর্যন্ত স্থগিতাদেশ বর্ধিত করা হয়। কিন্তু সুপ্রীমকোর্টের স্থগিতাদেশ অমান্য করে চারদলীয় জোট নেতাদের নিয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম· সাইফুর রহমান ২০০৫ সালের ২৫ জুলাই সেখানে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন এবং স্থগিতাদেশের মধ্যেই স্কুল নির্মানের কাজ শুরু হয়। তখন অর্থমন্ত্রীর দাপট ও স্থানীয় জোট নেতা ও প্রশাসনের ভয়ে আন্দোলনরত এলাকাবাসী চুপসে যান। অপর দিকে, রাতের অন্ধকারে হাসপাতালের কোটি কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি,আসবাবপত্র কোন প্রকার নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে অন্যত্র সরিয়ে ও বিক্রি করে দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের কিছু মূল্যবান যন্ত্রাংশ জেলার দু’একটি হাসপাতালে লোক দেখানো স্থানান্তর করে বাকি গুলো নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
চলবে...
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মে, ২০০৭ বিকাল ৩:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




