বাঙ্গালী জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের একটি গৌরবময় অধ্যায় মহান মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাস যুদ্ধ করে মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন করেছিল এদেশকে। মাতৃভূমিকে পাক-হানাদার বাহীনির হাত থেকে মুক্ত করতে কৃষক, শ্রমিক জনতার সঙ্গে ছাত্ররাও অংশ নিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধে। বীর মুক্তিযোদ্ধা দেবেশ চন্দ্র সান্যাল। ১২ বছর ৬ মাস বয়সেই যৌবনের দীপ্ত প্রয়াস নিয়ে অংশ নিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধে। তখন তিনি ছিলেন রতন কান্দি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ ঢাকায় বাঙ্গালী নিধন শুরু হলে পাক-বাহীনির হাত থেকে প্রাণ রার জন্য নারী-পুরুষসহ সর্বস্তরের জনতা আশ্রয় নিতে থাকে নির্বিত গ্রাম ও পার্শ্ববতী রাষ্ট্র ভারতে। তেমনি রতন কান্দি গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেয় নারী-পুরুষদের কাছ থেকে নির্যাতনের কথা শুনে গা-শিউরে উঠে দেবেশ চন্দ্র সান্যালের। শরীরের রক্ত টকবক করতে লাগল তার। রাতেই স্কুলে সহ-পাঠিদের নিয়ে স্বাধীনতার পক্ষে মিছিল করে মাটি স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করলেন বাংলা মাকে স্বাধীন না করা পর্যন্ত ঘরে ফিরবেন না।
২৮শে মার্চ ৭১’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ডাকে ই·পি·আর· সদস্য কৃষক, শ্রমিক, যুবকসহ সর্বস্তরের মানুষ যার যা কিছু ছিল তাই নিয়ে নগরবাড়ী ফেরী ঘাটে প্রতিরোধ দুর্গ গড়ে তুলল। দেবেশ ও তার সাথীদের নিয়ে বেলা ১২টায় পৌছেঁ গেলেন নগরবাড়ী ফেরী ঘাটে। তখন পাক-বাহীনি জঙ্গী বিমান থেকে ব্যাপক গোলা বর্ষণ করছিল স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালীদের উপর। পাবনার ডাব বাগান (বর্তমানে শহীদ নগর) এ অবস্থান নেওয়া প্রতিরোধ দুর্গের এম·সি·এ· মোঃ আব্দুর রহমান, এম·এন·এ· অধ্যাপক আবু সাইয়্যিদ, মোঃ বাকী মির্জা, মোঃ আব্দুল রাজ্জাকসহ শতশত মানুষের সাথে পরিচয় হয় তার। প্রতিরোধ দুর্গে প্রতিদিন মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার দিয়ে রাত ৮টার মধ্যেই বাড়ী ফিরে যেতেন দেবেশ।
১৩ই মে ৭১’ তার এক আত্মিয়ের বাড়ী পাবনা জেলার সাঁফিয়া উপজেলার ডেমরা গ্রামে বেড়াতে যান তিনি। পাক-বাহীনি আসবে না এই বিশ্বাসে পাবনা, বেড়া, সাঁথিয়া, শাহাজাদপুর, কুচিয়ামারা নগরবাড়ীসহ প্রভৃতি অঞ্চল তেকে ধণাঢ্য হিন্দুরা এসে আশ্রয় নিয়েছিল ডেমরা গ্রামে। কিন্তু শেষ রাতে গগনবিদায়ীগুলির আওয়াজের শব্দে সবার সাথে চিৎকার দিয়ে উঠেন দেবেশ চন্দ্র সান্যালও। ১৪ই মে রূপসী ও ডেমরায় পাক-বাহীনির গণহত্যার শিকার হয়েছিল প্রায় ৮০০ নিরীহ বাঙ্গালী।
দেবেশ বলেন, সেদিন স্বামী ও পুত্রের জীবন ভিক্ষা চেয়ে যে মায়েরা হানাদার বাহীনির নিকট গিয়েছিল তাদেরকে নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। বলরাম রায় ও মাখন রায়ের গায়ে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে মেরেছিল পাক-বাহীনি, ডেমরার ঐতিয্যেবাহী কালি মন্দিরও আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এইসব বিভিষীকা ময় ঘটনাগুলো প্রত্য করে প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিলেন দেবেশ। রাত্রিতে চিৎকার দিয়ে উঠতেন ঘুম থেকে। সব সময়ই একটা আর্তনাদ কানে বাজতো তার ।
১৫ই আগষ্ট ১৯৭১ প্রদেশিক পরিষদ সদস্যা আব্দুর রহমানের ব্যবস্থাপনায় মুক্তিযোদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য ৮১ জনের দলের সাথে ভারতে চলে গেলেন দেবেশ সান্যাল। সীমান্তপাড়ী দেওয়ারপর পশ্চিম দিনাজপুর জেলার কামারপাড়া মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হল তাদেরকে। দেবেশের বয়স কম থাকায় মুক্তিযোদ্ধ প্রণি কতৃêপ তাকে ভর্ত্তি করতে চাননি। পরে পাবনা জেলার সাথিঁয়া বেড়া নির্বাচনী এলাকার এম·এন·এ· অধ্যাপক আবু সাইয়্যিদ এর বিশেষ সুপারিশে ভর্ত্তি করা হয় তাকে। কিছুদিন কামারপাড়া প্রণি দিয়ে প্রথমে মালঞ্চি ও পরে পতিরামপুর ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাদেরকে।
১লা সেপ্টেম্বর ৭১’ উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য শিলিগুরির পানি ঘাটা ইন্ডিয়ান আর্মি ট্রেনিং সেন্টারে নিয়ে আসা হয় তাদেরকে। ২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহীনি শিখ সেনা ডি·এস· ভিলন থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল, হ্যান্ড গ্রেনেড, মাইন, মর্টারসহ গেরিলা ও সম্মুখ যুদ্ধের প্রশিণ দেন তাদেরকে। প্রশিণ নং- এফ·এফ· ৪৭৪২। ট্রেনিং শেষে ভারতীয় সেনাবাহীনির সাথে হিলী সীমান্তে পাক-বাহীনির সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন তিনি। সেখানে ১১ দিন যুদ্ধ করার পর তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল ভারতের তরঙ্গপুরে। সেখানে কমান্ডার মোঃ আব্দুর মান্নানের নেতৃত্বে ১২ জনের একটি গ্রুফ করে দেওয়া হয় তাদেরকে।
দেবেশ চন্দ্র সান্যাল মুক্তিযোদ্ধে অংশ নেওয়ায় কৈজুরী রাজাকার ক্যাম্প থেকে প্রায়ই তার বাড়ীতে এসে তার বাবা, মাকে হত্যার হুমকি দিয়ে যেত রাজাকাররা। তাই প্রাণ রার জন্য দেবেশের বাবা পরিবারের সবাইকে নিয়ে আশ্রয় নিলেন ভারতীয় শরনার্থী ক্যাম্পে। ২৯শে সেপ্টেম্বর তরঙ্গপুর থেকে গোলা বারুদসহ রৌমারী ও বাহাদুরাবাদ ঘাঠ হয়ে দেশের ভিতর প্রবেশ করেন দেবেশ। সিরাজগঞ্জ জেলায় পোড়াবাড়ীর পূর্ব দিকে যমুনার চড়ে এসে নৌকার মধ্যে অবস্থান নিলেন তারা।
৮ই অক্টোবর ৭১’ মোঃ আব্দুল হামিদের পরামর্শে ও কমান্ডার সাহেবের নির্দেশে রাত ৯টায় কালিয়া-হরিপুরে অপারেশনে অংশ নিয়ে দেবেশ সাহসীকতার সাথে ক্রোলিং করে মাইন রেল লাইনে পুথে রেখে বৈদ্যুতিক তারটি কমান্ডারের হাতে এনে দেন। যুদ্ধ কালীন স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন ঐ রাত্রে আমাদের পাশ ওয়ার্ড ছিল গোলাপ ও জবা। ১০ অক্টোবর একজন বাদাম বিক্রেতার বেস ধরে বেলকুচি থানা রেকি করেন দেবেশ। রাত তিনটায় বেলকুচি থানা আক্রমন করে একঘন্টা যুদ্ধ হয় পাক-বাহীনির সাথে। পাক-বাহীনি চলে যায় যমুনার অন্য পাড়ে। তিনি বলেন এটি তার জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ মুক্তিযোদ্ধা দেবেশ চন্দ্র সান্যাল তার দল নিয়ে নিজ গ্রাম রতনকান্দি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে এসে সেল্টার নেন।
২০শে ডিসেম্বর ছুটি নিয়ে ভারতে গিয়ে মা,বাবা,ভাই,বোনকে স্বাধীন দেশে নিয়ে আসেন দেবেশ। ২৬শে জানুয়ারী সিরাজগঞ্জ জেলা সদর ইব্রাহিম বিহারীর বাসায় অস্থায়ী ক্যাম্পে সাবসেক্টর কমান্ডার মেজর গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর উপিস্থিতিতে লেঃ সাইফুল্লার কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে বাড়ীতে চলে যান দেবেশ চন্দ্র সান্যাল। ১৪ই ফেব্রুয়ারী সিরাজগঞ্জসহ মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে মুক্তিযোদ্ধের সর্বাধী নায়ক মুহাম্মদ আতাউর গণি ওসমানীর স্বারীত সার্টিফিকেট (নং- ১২৯১৫৮) গ্রহণ করেন তিনি। সাথে একটি সাদা কম্বল ও বকেয়া রেশনিং এ্যালাউন্স ১১০ টাকা দেওয়া হয় তাকে।
মাতৃভূমিকে মুক্ত করে রতনকান্দি আদর্শ বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণীর অটোপাশ সার্টিফিকেট নিয়ে শাহাজাদপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে ভর্ত্তি হন তিনি। ১৯৭৪ সালে মাধ্যমিক, ৭৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক ও ৭৯ সালে বি·কম· পাশ করে ৮০ সালে সোনালী ব্যাংকে চাকরি নেন তিনি। ৭১’এর রনাঙ্গনের বীর, কর্ম জীবনেও সৎ ও নিষ্ঠার সাথে তার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি সোনালী ব্যাংক লাহিরি মোহনপুর শাখায় ব্যবস্থাপক পদে কর্মরত আছেন।
যে দেশকে ভালোবেসে যুদ্ধে গিয়েছিলেন তিনি, যুদ্ধ পরবর্তী ভালোবেসে ছিলেন সেই দেশের মানুষকে। তাইতো সামাজিক অবয় রোধ করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীশ্রী রাধা কৃষ্ণ ভাবামৃত সংঘ। পাপ ও হিংসার পথ পরিহার করে মানুষকে সৎ ও ন্যায়ের পথে ফিরিয়ে আনতে তার এ প্রচেষ্ঠা আজও অব্যাহত আছে। এছাড়াও সমাজ উন্নয়নে তিনি অনেক সেবা মুলক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত আছেন। সরকারি চাকুরি করে যথটুকু সময়পান তার সবটুকু ব্যায় করেন এদেশ ও এদেশের মানুষের কল্যাণে। এলাকায় গরিব দুঃখী মানুষকে যথটুকু পাড়েন সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগীতা করে যাচ্ছেন তিনি। বন্যা, খড়া ও যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুস্থ ও অসহায় মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের পাশে গিয়ে দাঁড়ান সরকারি বা ব্যক্তিগত সাহায্য-সহযোগীতা নিয়ে।
সিরাজগঞ্জ জেলায় শাহাজাদপুর উপজেলায় রতনকান্দি গ্রামের এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, একাত্তরের অনেক স্মৃতি আজও আমাকে তারা করে। যুদ্ধকালীন সময়ের সেই বিভিষীকাময় দিনগুলির কথা মনে হলে এখনো গা-শিউরে ওঠে। তিনি এখনও ভীষণ ভালবাসেন এদেশকে। মুক্তিযোদ্ধা দেবেশ চন্দ্র সান্যাল এখনও স্বপ্ন দেখেন রক্তে গড়া এ দেশকে নিয়ে। তিনি বলেন, যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলাম এখনও সেই স্বপ্ন পুরণ হয়নি। তবুও নিজেকে ধন্য মনে করি বাংলামাকে স্বাধীন করে জাতিকে লাল সবুজের পতাকা এনে দিতে পাড়ায়। তিনি কর্মজীবন থেকে অবসর নেওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের উপর বই লেখা ও গবেষণা করার ইচ্ছা পোষণ করেন। মুক্তিযোদ্ধা দেবেশ চন্দ্র সান্যাল এর গেজেট নং- ১৬৭৯।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।







