somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আম গেল ছালাও গেল

২৭ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আমিনুল ইসলাম বুলবুল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার নাম মুছে ফেলা অসম্ভব। ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে শক্তিশালী পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করেছিলেন এই অধিনায়ক। এরপর ২০০০ সালে ভারতের বিপক্ষে দেশের অভিষেক টেস্টে প্রায় নয় ঘণ্টা ক্রিজে লড়ে খেলেছিলেন ১৪৫ রানের সেই অবিস্মরণীয় মহাকাব্যিক ইনিংস। খেলোয়াড় হিসেবে তার এই অবদান দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে তাকে এক কিংবদন্তির আসনে বসিয়েছিল। কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর পরিহাসে মানুষ কখনো কখনো ক্ষমতার মোহে নিজের হাতেই নিজের গৌরবোজ্জ্বল অতীত ধূলিসাৎ করে দেয়।

২০২৫ সালের মে মাসে যখন তাকে বিসিবির সভাপতি করা হয়, তখন দেশের ক্রিকেটে এক নতুন আশার আলো জেগেছিল। আইসিসিতে দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা এবং ক্রিকেটের রাজনীতিতে তার গভীর জ্ঞান থাকায় সবাই ভেবেছিল এবার হয়তো ভালো কিছু হবে। দায়িত্ব নেওয়ার সময় তিনি নিজে বলেছিলেন, বেশিদিন থাকবেন না; একটা সংক্ষিপ্ত 'টি-টোয়েন্টি ইনিংস' খেলে চলে যাবেন। কিন্তু ক্ষমতার চাদর গায়ে জড়াতেই সেই সিদ্ধান্ত বদলে গেল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচনে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেন তিনি। অনিয়মের অভিযোগ তুলে ৭২টি ক্লাবের মধ্যে ৪৫টিই সেই নির্বাচন বয়কট করলেও, তিনি জয়ী হয়ে নিজের সেই পদটিকে 'সম্পূর্ণ বৈধ' বলে দাবি করলেন।

এর পরের অধ্যায়টি বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য ছিল চরম হতাশার। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জন করল। যে মানুষটা ১৯৯৯ সালে দেশকে প্রথম বিশ্বকাপে নিয়ে গিয়েছিলেন, তার নেতৃত্বেই দেশ বিশ্বকাপ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল যখন প্রকাশ্য ঘোষণা দিলেন বাংলাদেশ ভারতে যাবে না, বুলবুল তখন নিজের চেয়ার বাঁচাতে চুপ করে থাকলেন। তিনি যদি তখন দৃঢ়তার সাথে প্রতিবাদের খাতিরে পদত্যাগ করতেন, তবে ইতিহাস তাকে চিরকাল নায়ক হিসেবে মনে রাখত। অথচ পরবর্তীতে যখন বাংলাদেশ বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে গেল, তখন সরকার দায় এড়িয়ে একে বিসিবি ও খেলোয়াড়দের সিদ্ধান্ত বলে চালিয়ে দিল।

এই রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে পাকিস্তান যখন বাংলাদেশের সাথে একাত্মতা দেখিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে না খেলার ঘোষণা দিল, বুলবুল তখন সেই ফাঁদে পা দিলেন। পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভির সাথে বৈঠক করতে তিনি লাহোরে ছুটে গেলেন এবং দেশে ফিরে কৃতিত্ব দাবি করলেন। অথচ পর্দার আড়ালের সত্যটা ছিল ভিন্ন; শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট সরাসরি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে মূল মধ্যস্থতা করেছিলেন, যেখানে বুলবুল ছিলেন কেবলই একজন সাধারণ অতিথি। তথাকথিত সেই বন্ধুত্বের আসল মূল্য যে কতটা ঠুনকো ছিল, তা পরবর্তীতে সবার সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়।

অবশেষে ২০২৬ সালের এপ্রিলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তদন্ত শেষে বুলবুলের নেতৃত্বাধীন বিতর্কিত বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয় এবং তামিম ইকবালকে অ্যাডহক কমিটির প্রধান করা হয়। এই সিদ্ধান্তকে 'সাংবিধানিক অভ্যুত্থান' আখ্যা দিয়ে বুলবুল আইসিসির কাছে নালিশ করতে ছুটলেন। কিন্তু আইসিসি তার এই দ্বিমুখী আচরণে সাড়া দিল না। কারণ কিছুদিন আগেই তিনি আইসিসিকে বলেছিলেন যে তিনি সরকারি নির্দেশনা মেনে চলছেন, আর পদ হারানোর পর হঠাৎই সরকারি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সরব হলেন। আইসিসির কর্মকর্তারা তার এই অবস্থানকে দ্বিমুখী আচরণ হিসেবেই গণ্য করলো ।

এরপর এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলে (এসিসি) একটি বড় পদে বসার সুযোগ এলেও এশিয়ার দুটি বড় দেশের ভেটোতে তা ভেস্তে যায়। নিজের হারানো ক্ষমতা ফিরে পেতে মরিয়া বুলবুল জুন ২০২৬-এ আইসিসির কাছে ১৪ পৃষ্ঠার একটি চিঠি পাঠান, যেখানে তিনি বাংলাদেশের সদস্যপদ স্থগিত করতে, তহবিল বন্ধ করতে এবং আইসিসি টুর্নামেন্ট থেকে দেশকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান। নিজের চেয়ার ফিরে না পাওয়ার ক্ষোভে দেশের ক্রিকেটকে ধ্বংস করার এই চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত তিনি ভিডিও বার্তায় অস্বীকার করলেও, চিঠিতে তার নিজের স্বাক্ষরই সত্যটা ফাঁস করে দেয়।


আইসিসিতে ২০ বছর ধরে তাজিকিস্তান থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত ক্রিকেট ছড়িয়ে দেওয়ার যে নীরব ও মহান কাজ তিনি করেছিলেন, আজ তা আড়ালে পড়ে গেছে। যদি তিনি সেই সম্মানজনক অবস্থান থেকে বিদায় নিতেন, তবে মানুষ তাকে চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করত। ক্ষমতার লোভ আর জেদের বশে তিনি নিজের সাজানো ক্যারিয়ারে নিজেই কালি লেপে দিলেন। আজ তার আইসিসির চাকরি, বিসিবির পদ, এসিসির সুযোগ এবং জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ—জনগণের শ্রদ্ধা, সব হারিয়ে গেছে। মেলবোর্নে পরিবারের কাছে ফিরে গিয়ে এখন তিনি 'হায়ার কনশাসনেস' বা উচ্চতর চেতনা নিয়ে গবেষণার কথা বলছেন। ১৯৯৯ সালের সেই বীর অধিনায়ক আর ২০২৬ সালে নিজের দেশকে নিষিদ্ধ করতে চাওয়া ব্যক্তিটি যে একই মানুষ—এই নিষ্ঠুর সত্যটি মেনে নেওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তদের জন্য সত্যিই এক চরম বেদনার।


বাংলাদেশকে নিষিদ্ধ করতে আইসিসিতে চিঠি সাবেক বিসিবি সভাপতির - বিডিনিউজ২৪
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:৪৩
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দাওয়াত দিয়েছে

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ২৬ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭

দাওয়াত দিয়েছে
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

এক পছন্দের মানুষ দাওয়াত দিয়েছে
তার ‍সুন্দর জেলা দেখার জন্য
আমিও বলেছি চলে আসবো হঠাৎ-
একদিন দেখতে, দেখবো ঘুরে ঘুরে
তার পুরো শহর , তার গ্রাম, তার বাড়ি
বিশেষ করে তাকে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ মোহমায়া

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৬ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬



খরস্রোতা নদীও একসময়
ক্ষীণ নালায় পরিণত হয়
কালের পরিক্রমায়,সময়ের চাহিদায় ।
তবু আশা বেঁধে রাখি।

ফিরবে সব আগের মত
চলবে জীবন অবিরত
কোন একদিন।


হারানো মুহুর্তরা কি সত্যিই  ফিরে আসে?
শত ব্যস্ততায়- মায়ের মত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙালি মুসলমান সম্বন্ধে ChatGPT র মূল্যায়ন !

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৬ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:০৯

ChatGPT কে "বাঙালি মুসলমান বনাম প্রকৃত ইসলাম" এর উপর একটা প্রবন্ধ লিখতে বলেছিলাম, কয়েক সেকেন্ডে যা লিখেছে হুবুহু তুলে দিলাম ! আপত্তি থাকলে চ্যাটজিপ্ট দায়ী !!

বাংলার মুসলমান সমাজকে দেখলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন্তব্যে অনন্য রাজীব নূর

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৬ শে জুন, ২০২৬ রাত ১০:৩২



অনন্য রাজীব নুর মন্তব্য বেলায়
পাওয়া ও দেওয়ায় লক্ষ করে পার
সম্মুখে এগিয়ে চলে গন্তব্যে অপার
প্রতিটি পোষ্টের ক্ষেত্রে তার আছে টান।
মন তার দোলে চলে আনন্দ ভেলায়
ব্লগেতে নিশ্চুপ দেখে পোষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

অপারেশন ইকারুস: জেনেভার ছায়া

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



বালি অপারেশন শেষ করে ঢাকায় পিবিআই সদর দপ্তরে যখন আরিয়ান, তানভীর ও বর্ষা ফিরে এলো, তখনো বাইরের আকাশ থমথমে। বালি থেকে উদ্ধার করা ৬০% ডেটায় একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×