বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১০ এর পর্দা উঠছে আগামী ১১ জুন। চূড়ান্ত ক্ষণ গনণা শুরু হয়ে গেছে। সেই সাথে বাড়ছে ফুটবল উন্মাদনা। শুরু হয়ে গেছে বাংলাদেশে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা সমর্থকদের তীব্র প্রতিযোগীতা। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে আক্রমণ করছে তাদের দুর্বল দিকগুলি নিয়ে। কে জিতবে কে হারবে,মেসি না কাকা তাই নিয়ে তীব্র বিতর্ক। প্রিণ্ট,ইলেক্ট্রনিক মিড়িয়াগুলো প্রচার করছে ফিচার। এমনই ফুটবল উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। এমন ফুটবল প্রেম খারাপ কিছু নয়। বরং ফুটবলের প্রতি বাঙ্গালীর তীব্র আকর্ষণের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু আমার ব্যাথা অন্য জায়গায়। ফুটবল প্রেমের বহিঃপ্রকাশে আজ সারাদেশে চলছে পতাকা ওড়ানোর মহোৎসব। ফুটবল প্রেমীরা তাদের পছন্দের টীমের পতাকা উড়াচ্ছে। এখানেও প্রতিযোগীতা,কার পতাকা কার চেয়ে বড়,কার পতাকা বেশী উড়ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। দেশের এমন কোন অঞ্চল খোঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে ব্রাজিল,আর্জেন্টিনার পতাকা নেই।বাসা-বাড়ী,গাড়ী,সরকারী-বেসরকারী অফিস,আদালত,শিক্ষা প্রতিষ্টান হেন কোন জায়গা নেই যেখানে ভিনদেশী পতাকা উড়ছে না! পতাকার কোন মাপ নেই,উচ্চতা নেই। যার যেমন খুশী পতাকা লাগাচ্ছেন। কিন্তু আমরা বেমালুম ভুলে বসে আছি,আমাদের একটি জাতীয় পতাকা আছে,রক্তে রঙীন লাল-সবুজের সেই পতাকার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য আছে বাংলাদেশ জাতীয় পতাকা আইন,১৯৭২। এই আইনের ৯ এর ১ ধারায় আছে “বিদেশের জাতীয় পতাকা ঐ দেশের বাংলাদেশস্থ কূটনৈতিক মিশনের প্রধান কার্যালয়,কনস্যুলার কার্যালয়ে উত্তোলন করা যাইবে কূটনৈতিক মিশনের প্রধানগণ তাদের দাপ্তরিক বাসভবন এবং মোটর গাড়িতে স্ব-স্ব জাতীয় পতাকা উত্তোলন করিতে পারিবেন।”
এই ৯ ধারারই ৪ উপধারায় বলা হয়েছে “ উপরোক্ত বিধিসমূহ যাহা বর্ণনা করা হইয়াছে সেই ক্ষেত্র ছাড়া গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সুনির্দিষ্ট অনুমতি ব্যতিরেকে কোন মোটর গাড়ী অথবা ভবনে বিদেশী পতাকা উত্তোলন করা যাইবে না।” এই বিধিমালার ৭ ধারার ৭ উপ-ধারায় আরো বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের পতাকার সাথে এই পতাকা (বিদেশী) হইতে উচ্চতায় অন্য কোন পতাকা বা রঙ্গিন পতাকা উড়ানো যাইবে না।” যে সকল জায়গার সাথে আমদের স্বার্বভৌমত্বের সম্পর্ক একেবারে নাড়ির মতো সেই সব জায়গায় ভিনদেশী পতাকা উড়ানো রাষ্ট্রকে কী এতটুকুও প্রশ্নবিদ্ধ করে না? সুপ্রীম কোর্ট বার কাউন্সিল ভবনসহ সরকারী গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে উড়ছে ভিনদেশী পতাকা! সবকিছুই কি সরকারের দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে? এতটুকুও বাস্তবায়ন নেই কেন? তবে আইনটা কেন বহাল আছে? আর কেনইবা সরকার সম্প্রতি এই আইন সংশোধনের প্রস্তাব আনতে যাচ্ছে? সরকার কি এই আইনের মাধ্যমে আমাদের রক্ত-স্নাত জাতীয় পতাকার মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখার জন্য গন-সচেতনতামূলক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে পারে না? আর মিড়িয়াগুলোও কেন ভিনদেশী পতাকা উড়ানোর সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করছে ?
এটা নিশ্চিত যে ফুটবলের সাথে আমাদের এক ধরনের আবেগ জড়িত। কিন্তু আবেগের বহিঃপ্রকাশের আরও মাধ্যম কি নেই! হোক আমার দেশ বিশ্বকাপ ফুটবল খেলতে পারছে না।আমি আমার দেশের পতাকা উড়াতে পারছি না। আমার দেশের পতাকার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়,বিদ্যমান আইন ভঙ্গ হয় এমন কাজ থেকে বিরত থেকে আমাদের ফুটবল প্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে তো পারি! আমাদের দেশে,আমাদের সংস্কৃতিতে হয়তোবা এই আইনের প্রয়োগ পুরোপুরি সম্ভব হবে না। কিন্তু আমাদের দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে এটি একটি অন্তরায় মনে হয়। পতাকা প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। এর সাথে জড়িত থাকে জাতীয় চেতনা। যেমনটা আমরা লাল-সবুজের এই পতাকা উড্ডীণ করেছি এক রক্তগঙ্গা পেরিয়ে।বাংলার সবুজ প্রান্তর রক্তে রাঙ্গিয়ে এসেছিলো স্বাধীনতা। আমরা নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করতে না পারায় ধীরে ধীরে পরদেশের প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছি। অন্য দেশের পতাকা উড়ানো ঐ রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের সামিল।
আমরা আশা করি, সরকার জোরালোভাবে চেষ্টা করবেন যাতে আমাদের পতাকাই ভবন ও গাড়িতে সবসময় উড়াতে পারি।আমাদের দেশপ্রেমের কষ্টিপাথরে শান দিতে পারি প্রতিদিন,প্রতিক্ষণ। প্রয়োজনবোধে বিদ্যমান আইন সংশোধন করে পতাকা অবমাননার শাস্তির বিধান করে,জনসাধারণকে সচেতন করে তিলতে হবে।আমরা যেন আর পরের পতাকা উড়িয়ে নিজেদের দেশের সম্মান ক্ষুন্ন করার মতো প্রয়াস না নেই। সরকারকে অবশ্যই ভিনদেশী পতাকা উড়ানোর এই সংস্কৃতি বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। আর আমাদের নিজ নিজ অবস্থানে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। এই লাল-সবুজের পতাকা আমার পরিচিতি,এই আমার স্বাধীনতা,আমার সার্বভৌমত্ব। এই পতাকার মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখা আমাদের নৈতিক নাগরিক দায়িত্ব। আমরা ফুটবলকে ভালোবাসব,প্রিয় খেলোয়াড়-টীমকে ভালোবাসব। সবই আমার পতাকা-আমার দেশকে উর্দ্ধে রেখে। আমাদের বড় অর্জনই হয়তো আমাদের দেশপ্রেম ও আমাদের আমিত্বকে উজ্জীবিত করবে। সেই সোনালী দিনের প্রত্যাশায় রইলাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


