যে যেভাবে দেখি
‘সাবা’র পথ নয়, মুক্ত আলোর পথ
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
বন্ধু আসফুদ্দৌলাহ, কোরানের তফসির নিয়ে ব্য¯,Í ফোন করলে জানান হয় যে জীবনের যে ক’টা দিন বাকি, কোরানের মধ্যেই ডুবে থাকতে চান। ‘কোনকিছুই আর মনকে আকষর্ণ করে না, কোরান ছাড়া’। টেলিফোন ছেড়ে অনেকক্ষণ চুপ।
ভাবছি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কতটুকু সময় কোরানের সঙ্গে ছিলাম। যে বয়স পেলাম মোট কত বছর ব্যয় করেছি এর পেছনে, আল্লাহ্তা’য়ালা যার নাম দিয়েছেন : ‘স্পষ্ট জ্যোতি’।
সকালে সুরা ‘সাবা’য় এসে থামলাম। ‘সাবা’ একটি জায়গার নাম। আমার বিশিষ্ট বন্ধু রেডিওতে চাকরী করতেন, ম. ন. মুস্তাফা, সংগীত নিয়ে কয়েকটি বই লিখেছেন। অফিসে আসার পর কিছু সময় ব্যয় করতেন কোরান পাঠে। একদিন বললেন, আব্বাসী, খুব ইচ্ছা, কোরানে যে সব জাতির কথা উলেখø আছে, যেমন আদ, সামুদ, সাবা এদের নিয়ে গবেষণা করব এবং জানতে চেষ্টা করব এদের ইতিহাস। কি দোষে এরা অভিশপ্ত জানার জন্যে বিদেশে পুস্তকাদির অন্বেষণ করতাম। রেফারেন্স পেয়েছি, বইগুলো সংগ্রহ হয়নি। এখানে কোন প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে জগতের জ্ঞান-বিজ্ঞানের বইগুলো সংগ্রহ করা। বিদেশের লাইব্রেরিগুলোতে কত গ্ের ন্থর সমাহার। বাইবেলবর্ণিত শহর-বন্দর, পথ-ঘাটের তথ্যাদিতে পরিপূণর্ পুরাতত্ববিদ ও ঐতিহাসিকদের ভারী ভারী পুস্তক। বাইবেলের পথ ধরে প্রস্তুত অসংখ্য ছবির অ্যালবাম। দু’হাজার বছর আগে বৈত নয়, পাঠকের সামনে শুধু বাইবেল নয়, সে সময়ের ভিজ্যুয়াল ছবি ও ম্যাপ। কোরান নিয়েও শুরু হয়েছে নতুন গবেষণা, নতুন দিগন্তের অভিসারী এই বিস্তারিত কর্মসূচী নতুন চিন্তা উন্মোচিত করে দিচ্ছে। বিভিন ড়ব দেশে মুসলিম প্রজন্মের মধ্যে এটি প্রবর্তন করেছে উৎসাহ ও উদ্দীপনা।
আজ সকালে ‘সাবা’ জাতির দ্বারে এসে থমকে দাঁড়ালাম। ‘সাবা’র নাম অনুসারেই কোরানের ৩৪ সুরা, যাতে ৫৪টি আয়াত, ৬টি রুকু। ইসলাম দমন করার জন্যে জুলুম অত্যাচারের তীব্রতা তখনও তেমনটি দানা বাঁধে নি, ছিল ঠাট্টা বিদ্রুপ গুজব মিথ্যা ও বিদ্বেষ প্রচারের প্রারম্ভকাল। মক্কায় নাজিল হয় এই সুরা। যদিও নাম ‘সাবা’, ‘সাবা’র ইতিহাস ও কর্মকান্ড বিধৃত অল্পই। হজরত দাউদ [আ]-কে যত মর্যাদা দান করা হয়েছিল তার মধ্যে ছিল : ১. পাহাড়কে অনুগত হওয়ার হুকুম ২. পাখিদেরকে অনুগত হওয়ার হুকুম ৩. লৌহকে নরম করে দেয়ার শিক্ষা, যা দিয়ে প্রস্তুত করা যেত বমর্ ও কড়া। হজরত সুলেমানকে যে মর্যাদা দান করা হয়েছিল তার মধ্যে ছিল ১. বাতাসকে অনুগত করে দেয়া ২. প্রভাতে এক মাসের পথ অতিক্রম করা ৩. সন্ধ্যায় এক মাসের পথ অতিμম করা ৪. গলিত তা¤্ররে প্র¯্রবন প্রবাহিত করে দেয়া ৫. এমন সব জিনকে অধিন¯ ’ করে দেয়া যারা রবের হুকুমে তার সামনে কাজ করত ৬. উঁচু উঁচু দালান, পুকুরের মত বড় বড় থালা ৭. বিরাট ডেক যা নড়ান যায় না।
‘সাবা’র বাসিন্দাদের নিদর্শন ডানে ও বামে ফুলের বাগান। বলা হয়েছিল রবের পক্ষ থেকে দেয়া রিজিক উপভোগ করার জন্যে এবং শুকরিয়া জানাবার জন্যে। উপভোগ করেছিল, শুকরিয়া জানাননি। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল শুকরিয়া জানান থেকে [যেমন প্রায়শঃই করে থাকি]। ওদের জন্যে এল বাঁধভাঙা বন্যা, বাগান আর রইল না, এল তেঁতো ফল, ঝাউগাছ ও কিছু বরই। এই ‘বরকত পূণর্ জনপদ’ ছিল সিরিয়া ও প্যালেষ্টাইনের এলাকা।
‘সাবা’ জাতির প্রসঙ্গে আল্লাহ্তা’য়ালা অনেক কিছুই বলেছেন, যা আমাদের সবার জন্যেই প্রযোজ্য। বলেছেন : ১. নবীকে গোটা মানব জাতির জন্যে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে পাঠিয়েছি। বেশির ভাগ লোকই তা জানে না ২. বান্দাদেরকে রিজিকের ভা- খুলে দেয়া হয়, আবার যাকে ইচ্ছা মেপে মেপে দেয়া হয় ৩. আরবরা পূজা করত ফেরেশ্তাদের, এটা আসলে শয়তানেরই এবাদত ৪. গভীরভাবে চিন্তা কর তোমাদের সাথীকে [মুহাম্মদ [সা] কেন পাঠিয়েছি।
মানুষ নিজকে নিয়েই মত্ত, ব্যস্ত আহার সংগ্রহে। নেতৃস্থানীয় স্বচ্ছল যারা, অধিকতর ধনসম্পদ আহরণের পিছনে। এখানে ‘সাথী’ [মুহাম্মদ [সা]] কথা চিন্তা করার সময় তাদের নেই। অথচ যতটুকু সময় বাকি আছে এখানে সময় দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
ইবনে কাসিরের তফসির অনুযায়ী ‘সাবা’র কাহিনী অনেক লম্বা। গোষ্ঠী ইয়েমেনের অধিবাসী। তুব্বা ও বিলকিস এই গোষ্ঠীর লোক ছিলেন, তারা প্রাচুর্যের অধিকারী। প্রেরিত রসুলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করতেন। এমন এক সময় এল যখন নানা রকম সম্পদের খেয়াল তাদেরকে করল অন্য পথের দিশারী। খেয়াল খুশি ও বাঁধভাঙা জীবনে হল অভ্য¯স্থ।’
সময় যখন এল, তাদের বাগানের ফুল হল তিরোহিত। রসুল [সা]-কে জিজ্ঞেস করা হল, ‘সাবা’ কে, পুরুষ, নারী, না ভূখ-? বললেন : ‘সাবা’ একজন আরব, যার ছিল দশ সন্তান, ছ’জন ইয়েমেনে, চারজন শাম দেশে। পুরো ঘটনার বর্ণনা জন্যে প্রয়োজন অনেক পৃষ্ঠার। আসল কথাটি : ইবাদতে অলসতা ঘণীভুত হলে তাদের সবকিছুই কেড়ে নেয়া হয়। আল্লাহ কেড়ে নিলে তাদের কাছে যা বাকি থাকবে : শয়তানের অনুগামী হওয়া।
কোরানের তিন জায়গায় লেখা আছে সেবিয়ানদের কথা। ইহুদী, খ্রিষ্টান ও সেবিয়ানদের এক সঙ্গে বর্ণনা করা হয়েছে, যেটি ‘সাবা’ থেকে আলাদা হওয়ার কথা। মুসলমান গ্রন্থকারদের মতে সেবিয়ানরা ছিলেন দাউদ [আ] নবীর কাছে আবর্তিত যবুর গ্রন্থের অনুসারী। যেহেতু এই সুরাতে দাউদ [আ] নবীর কথাও বর্ণিত, সম্ভবত সে কারণেই মারমাডিউক পিকথল এই দুই জাতিকে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। একটি আব্রাহামিক সেবিয়ান, অন্যটি হেলেনিষ্টিক সেবিয়ান।
হেদায়েত ও গোমরাহী স্বতন্ত্র পথ।
একটি বাতিলের, অপরটি হকের।
বাতিলের পথে চলতে আগ্রহী, সম্পদ কামিয়ে ফেলেছি যারা। আছি উচ্চতর বিলাসের মোহে।
বাতিলের পথ সম্মুখেই খোলা। একপাত্র খেলে কিই বা ক্ষতি হবে, সামান্য গোমরাহী, সামান্য অন্ধকার, টের পাবে না কেউ। গা ভাসিয়ে দেয়া যায় জোয়ারে, যেখানে উচ্ছ্বল যৌবনের ভরা গাঙ, যৌবনের মনখুশি উন্মত্ত আবেগ। ওরা আমার সঙ্গে যাবে না কেউ, গান ধরেছি সংক্ষিপ্ত পথের, নাম ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’। পথটি সুন্দর। এ পথ উন্মুক্ত, যে আসতে চায় আসতে পারে, ‘সাবা’র পথ ছেড়ে আলোর পথে।
১৭ই এপ্রিল, ২০১২
মুস্তাফা জামান আব্বাসী সাহিত্য-সংগীত ও সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই এপ্রিল, ২০১২ বিকাল ৪:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


