হুট করেই আমাদের সিদ্ধান্ত হয়ে গেল নেপাল যাবো। পরিবারের ট্যুর। দীর্ঘ উনিশ বছর আগে শেষ পারিবারিক ট্যুরে গিয়েছিলাম সিলেটে। তারপর সে তালিকা আর দীর্ঘ হয়নি।
রোজার ঈদের পরদিন সকাল ১০টায় আমাদের ফ্লাইট।
আমার বাবার সব কিছুতেই সিরিয়াস প্রবণতার কারণে মহা ঝামেলায় ছিলাম বিমানে ওঠার আগ পর্যন্ত। কদিন আগে থেকেই তার তাড়া। সময় ঠিক করা। খুব সকালে উঠে রওয়ানা হতে হবে। তার এই তাগাদায় এতো টেনশনে ছিলাম যে এর কদিন আগে থেকে মাথার উপর দিয়ে কোনও
বিমান গেলেও আতকে উঠতাম। বিমানটা মিস হয়ে গেল নাকি?
যাই হোক নির্দিষ্ট দিন এত আগে উঠে বিমান বন্দরে গিয়ে পৌঁছেছি যে, আমার ধারণা তখনও বিমানের পাইলট সাহেবও নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলেন।
তারপর বিশাল সময় ঘুরে ঘুরে, বসে চোখ বন্ধ করে এবং অসমাপ্ত ঘুমের গণিত মেলাতে মেলাতে সময় পার করলাম। আর মাঝে মাঝে উঠে গিয়ে নানানজনকে প্রশ্ন, ভাই ওই বিমানের কার্যক্রম কোন দিকে? কয়টায়?
সবাই কনফিডেন্টলী ভুল উত্তর দিয়ে আমাকে সাহায্য করছিল। পরে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখি এক জায়গায় আমাদের মত কাগজপত্র নিয়ে বিশাল লাইন। জিজ্ঞাসা করার আগেই বুঝে নিলাম এবং সবার আগে এসে সবার পেছনে দাঁড়ালাম। এখান থেকে পাশ করলেই বিমানের পারমিশাণ। পরে দেখলাম, না। এরপরও ইমিগ্রেশন বলে একটা জায়গা আছে। সেটাও পার হতে হয়।
২.
বিমানে উঠলাম বেশ পরিপাটি ভদ্রলোকের বেশে। এমন একটা ভাব কোনও কথা বলা যাবেনা। কোনও অভদ্রতার লেশও আনা যাবেনা। আচরণ কোড অনুযায়ি উঠে সিট বের করে বসলাম। কিন্তু পেছন থেকে তেমন কোড মেন্টেনের আওয়াজ পেলাম না। অন্য আওয়াজে বিমান তোলপাড়। অনেকের অযথাই বিমাণবালাদের ডাকাডাকি, সিট কই? সিট বেল্ট নাই। পাশের হ্যাণ্ডেলটা ঠিক করে দেনসহ নানান আওয়াজ। কেউ কেউ এসির বাতাস পাচ্ছেননা বলেও হাঁক ছাড়লেন। বিমানবালা এসে যাত্রীর মাথার উপর দিয়ে দেখে জানালো, স্যার ঠিকই তো আছে। তখন তাদের চেহারায় প্রশান্তি চলে এলো। বিমানবালা বলার পরই যেন তারা এসির হাওয়া টের পেলেন।
আমার লাভ ইন নেপালের প্রথম পর্বটা এখানেই শুরু। বাংলাদেশ এবং নেপালের মাঝামাঝি কোন এক নাম না জানা জায়গায় এক বিমানবালাকে দেখে। নাম, আর্নিকা। বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল সেদিকে। কিন্তু পাশের সিটে বাবা থাকায় ততটা নির্লজ্জ হতে পারছিলাম না। তাই তাকে না দেখে যাত্রীদের দেখছিলাম। যাদের সবাইকে দেখলাম, এটা যে তার প্রথম বিমান ট্যুর না সেটা প্রমাণে ব্যাস্ত।
বিমানে ঢাকা থেকে নেপাল এক ঘন্টার দুরত্ব। এই এক ঘন্টায় বিমানে উপবিষ্ট বিচিত্র মানুষ আর আকাশে মেঘের বিচিত্রতা দেখতে দেখতে চলছিলাম। মেঘের উপরে যে কি বিশাল সৌন্দর্য তা মাটি থেকে কখনোই বুঝিনি। এক ঘন্টা ধরে সেই খেলাই দেখলাম। দেখতে দেখতে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, নিচের ছোট ছোট বাড়ীগুলো কেমন করে যেন বড় হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ বুঝলাম, বিমান নামছে। আনন্দের চেয়ে একটা অজানা বিরহে মনটা ভারী হয়ে গেল। এটা দেশের বিরহে নয় বিমানবালার বিরহে।
আমরা এখন নেপালে। আমাদের ভুবণ ছেড়ে একটা নতুন ভুবণে। নেমে অবাক আরে এটাতো একটা ভুবণ না। তিনটা ভুবণ। আমরা যে বিমানবন্দরে নামলাম তার নাম, ত্রিভুবণ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট।
বিদেশের মাটিতে পা রাখায় কেন জানি খুব বেশি শান্তি পাওয়া যায়না।
বিমানবন্দর থেকে হোটেলে যেতে হবে। হোটেলের নাম মানাং। নেপালের মার্কেট বলে খ্যাত থামেল-এ অবস্থিত। নেপালবাসীর কাছে শুনে প্রথম যে এলাকার নাম বুঝিনি। তাদের উচ্চারণ তমেল। সেখানে আমাদের যাওয়ার পথেই দেখলাম এক আজব দৃশ্য, হুট করে গাড়ীর সামনে এসে পড়ল গোটা ত্রিশেক বানর। আবার সাথে সাথেই হাওয়া। কেন কী কারণে তাদের এই রাজপথে নামা তার কারণ জানা গেলনা। তবে মানুষের পূর্বপুরুষেরা আমাদের আতিথেয়তায় এসেছিল কিনা তাও অবশ্য নিশ্চিত হওয়া গেলনা।
বানরেরটা পাওয়া যাক আর না যাক মানুষেরটা পাওয়া গেল। প্রথম ঘন্টাতেই বুঝে গেলাম নেপালে মানুষ অসম্ভব ভালো। নিরীহ। পর্যটকের সাথে প্রতারণা করার মানসিকতা তাদের নেই। তবে এটা বুঝেও যাচাইয়ের জন্য আরো তিন দিন সময় রেখে দিলাম কারণ আরো তিনদিন তো আছি। দেখি তাদের এই অবস্থা কতটুকু থাকে। জানাং এর জন্য অপোয় রইলাম। আপাতত হোটেল মানাং এসে গেছি, সেখানে ঢুকি। (জানাং মানে 'জানা'। হোটেলের নাম মানং এর সাথে মিল রেখে এই অদ্ভুত শব্দীয় কারিশমায় কেউ দুঃখ পেলে ক্ষমাং চাই)
নেপালের প্রথমদিন বুঝতে বুঝতে সন্ধ্যা। তবে প্রাথমিক অবস্থায় যা বুঝেছি আমরা একটা ভালো হোটেল পেয়েছি। যার আশেপাশের দৃশ্য অসাধারণ। মনে হয় দূর পাহাড়ে ঘেরা প্রাসাদ।
(চলবে)
ছবি : ১. হোটেল থেকে তোলা বাইরে দৃশ্য, থামেল
২. দরবার স্কয়ার
৩. ত্রিভুবণ এয়ারপোর্ট
৪. শয়ম্ভুনাথ স্তুপা
৫. দরবার স্কয়ার

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




