somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

না ফেরার দেশে সেনবাগের মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মাওলা। সাত চল্লিশ বছর পর চায়ের ঋণ শোধ

০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ রাত ১:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


না ফেরার দেশে সেনবাগের মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মাওলা।
সাত চল্লিশ বছর পর চায়ের ঋণ শোধ

জাহাঙ্গীর বাবু

না,আমি মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মাওলার মহাপ্রয়াণের সংবাদ দিচ্ছিনা। এক জন মহৎ মানুষের কথা বলব।যা আমার অসুস্থ্য বাবা আমাকে দুই ফেব্রুয়ারি দুইহাজার উনিশ সালের সন্ধ্যায় বলেছিলেন। মুক্তি যোদ্ধার বার্ধ্যক্য জনিত মৃত্যু সংবাদটি নীচের অংশে জুড়ে দিলাম,সংবাদটি সেনবাগ প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক এম এ আউয়াল সাহেবের।সত্য গল্পটা মুক্তিযোদ্ধার প্রতি আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি।

এবার আমার বাবার কথায় আসি। গত কয়েক মাস পুর্বে বাবা সেনবাগ বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন।এক জন লোক উঁচু কাধ।সাদা দাড়ি,ফর্সা যেন অবঃপ্রাপ্ত জাদরেল আর্মি অফিসার। বাবার সামনে এসে বললেন,আপনি হক সাহেব,তাই না।বাবা বললেন,হ্যা,আমি। আপনাকে ঠিক।তার জবাব,হক সাহেব আমি আপনার কাছে ঋণী সেই উনিশশো একাত্তর সাল থেকে।বাবা মনে করতে পারছিলেন না।ইতস্তত বোধ করলেন।দুজনে গেলেন, সেনবাগের ঐতিহ্যবাহী তাজনেহার রেস্টুরেন্ট, যা ওহাব মিয়ার হোটেল নামে পরিচিত।সেনবাগের জিরো পয়েন্ট,থানার মোড়ের সেই রেষ্টুরেন্টে বসলেন।চায়ের চুমুকের ফাঁকে বাংলার বীর সন্তান সেনবাগের গর্ব মুক্তিযোদ্ধা বললেন,মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে একদিন গভীর রাতে সেনবাগ পুর্ব বাজারের মসজিদ সংলগ্ন টার্নিংএ দাদার চা দোকান এসেছিলেন তারা কয়েকজন।

শীতের রাত।এমনিতে বাবা, দাদার চা দোকানে বসতেন সরকারী রেলওয়ের চাকরী থেকে চলে আসার পর। মাঝে মাঝে ছদ্মবেশে গ্রামে গ্রামে তেল নুন ফেরী করে মুদি মালামাল বিক্রিও করতেন। আবার দাদার চায়ের দোকানেও বসতেন।তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের গুপ্তচর।

রাজাকার,আলবদর,পাকীস্তানী সৈন্যরা সেই দোকানে চা, বিস্কুট নাস্তা খেতে আসতো, আসতো মুক্তি যোদ্ধারাও।দাদার চায়ের দোকানে টেবিল চেয়ারের পাশাপাশি বড় একটি চৌকি ছিলো।দাদার বয়সীরা সেখানে বসতেন।আশির দশকে সে চৌকি আমিও দেখেছি। সে চৌকির নীচের লাকড়ী আর বস্তা,চটের মাঝে মুক্তি যোদ্ধারা অস্ত্রও রাখতো। সে গল্প আমি ছোট বেলায় শুনেছি বাবার মুখে।

আসি সেই শীতের রাতে,সে রাতে মুক্তি যোদ্ধা গোলাম মাওলা তার কয়েক জন সাথী নিয়ে এসেছিলেন।দরজা পিটিয়ে জাগিয়েছিলেন বাবাকে।তারা চা খেতে চেয়েছিলেন।বাবা লাকড়ীর চুলা জ্বালিয়ে চা করে খাইয়েছেন।সে রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের পকেট ছিলো শুন্য।

স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মাওলা চলে যান চট্টগ্রামে।বাবা তার কর্মস্থল ঈশ্বরদীতে।সে রাতের পর আর দেখা হয়নি।সে দিন সাতচল্লিশ বছর পর বাবাকে পেয়ে চায়ের টেবিলে বলেছিলেন, সে চায়ের টাকা ঋণের কথা। বাবার স্মরণে নেই। কয়জন ছিলেন তাও মনে করতে পারেন নি।কারণ অনেক মুক্তি যোদ্ধা দিনে রাতে আসতো। পাকীস্তানীদের কথপোকথনে কোন তথ্য আছে কিনা।মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোন ম্যাসেজ আছে কিনা।হক সাহেব মানে আবদুল হক আমার বাবা,তার বড় ছেলে হিসাবে অনেক গল্প জানা আছে। দুই ফেব্রুয়ারি মোবাইলে কাসেম নামে একজন কল দিয়েছিলো বাবা বুঝে উঠতে পারেননি কোন কাসেমের ফোন।

সন্ধ্যায় কল ব্যাক করে জানতে পারেন, উনিশশো একাত্তর সালের ঋণ দুই হাজার আঠারো সালে ফেরত দিতে আসা জাতির সুর্য্য সন্তান স্বাধীন দেশের লাল সবুজের পাতাকা ছিনিয়ে আনা,বিশ্ব ভুমন্ডলে একখন্ড সবুজ ভুমির চাষী,একটি মুক্ত মানচিত্র এনে দিয়েছিলেন যারা,এক তর্জনীর ইশারায় মাতৃভুমির জন্য জীবন বাজি রাখা,দেশের জন্য ভালোবাসার সেই সৈনিক সেনবাগ,নোয়াখালীর কৃতী সন্তান গোলাম মাওলা সাহেবের জানাজা হয়ে গেছে দুই ফেব্রুয়ারি। সংবাদ পেলে ঠিকই যেতেন জানাজায়।বাবা বলেন,রিকশায় চড়ে সকালে একজনকে মাটি দিতে গিয়েছিলেন বাবুপুর,জানলে কাদরাও যেতেন, মহানুভব মানুষটির চেহারার বর্ননা দিয়েছেন আমায়, বলেছেন সবাই চলে যাচ্ছেন একে একে। আমার বুঝি হলো সময়। মাওলা সাহেব বোধ বুঝতে পেরেছিলেন,তার সময় ফুরিয়ে এসেছে। তাই চায়ের কাপের ঋন শোধ করেছেন চা পান করা আর কুশল বিনিময়ের মাধ্যমে।তাও আটচল্লিশ বছর পর।তিনি নাকি বাবাকে বহুবার খুজেছেনও।

স্যালুট জানাই,মাগফেরাত কামনা করছি,সেনবাগের গর্ব বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মাওলার প্রতি।ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা সেনবাগ উপজেলা প্রশাসন ও সাংবাদিক আউয়াল সাহেবকে।

এবার সংবাদঃ সেনবাগের অর্জুনতলা ইউপির দক্ষিণ মানিকপুরে রাষ্ট্রীয় সম্মানে বীরমুক্তিযোদ্ধা মো: গোলাম মাওলা (৬৫)র যানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শনিবার বিকেলে সেনবাগ থানা পুলিশের দেয়া গার্ড অব অনারে অংশ নিয়ে সম্মান জানিয়েছেন সেনবাগ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রক্তিম চৌধুরী । এসময় উপস্হিত ছিলেন সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল ওহাব।
দক্ষিণ মানিকপুর মজুমদার বাড়ীর হাজী জুলফিকার আলী মেম্বারের পুত্র বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মাওলা শুক্রবার রাতে চট্রগ্রামের একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। যানাজায় মরহুমের আত্বীয় স্বজন সহ শতশত লোকজন অংশগ্রহন করেন।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ রাত ১:৩৬
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জলরেখার নীচে

লিখেছেন তাহমিদ রহমান, ১১ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:৫১

পৃথিবী প্রতিদিন একটি নতুন উচ্চতা আবিষ্কার করে।
কোনো জানালায় আলো জ্বলে,
কোথাও কাচের গায়ে সাঁটা হয় আরেকটি সাফল্যের বিকেল।
সিঁড়িগুলো মানুষের পদচিহ্নে মসৃণ হতে থাকে।

আমি দূর থেকে দেখি—
যেন আমার চোখই কেবল যাত্রা করে,
শরীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সময়

লিখেছেন শাহেদ শাহরিয়ার জয়, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৩৩

আহ সময়,
তুমি শেখাও,আমি শিখি না।
তুমি পড়াও,আমি পড়ি না,
তুমি দেখাও, আমি দেখি না।
বলেছিলে- একদিন বুঝবো,
সবকিছু হারিয়ে খুঁজবো!


তুমি ভুল!

চেয়ে দেখো-
আমি আজো বুঝি না,
আজো হা-হুতাশ নিয়ে কিছু খুঁজি না!

বি:দ্র: অনেকদিন পর!কেউ আছে আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

রসায়ন পরীক্ষায় রসটাই আসল :D

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:০৩

রসায়ন পরীক্ষায় রসটাই আসল। না দেখলে মিস!! =p~


সালোকসংশ্লেষণ B-)

...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার ঘোষণা আলোচনায় থাকারই কৌশল মাত্র

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৮

চব্বিশের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া সাবেক স্বৈরশাসক ও বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার আগামী... ...বাকিটুকু পড়ুন

জন্মান্তরের ক্ষুধা

লিখেছেন ইসিয়াক, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:০৮




ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, সেই সাথে গুমোট আকাশ। মেঘাচ্ছন্ন  আবহ । একটানা টুপটাপ আওয়াজ ছাড়া চারদিক সুনসান।বৃষ্টি তার ক্লান্তি কাটাতে  যেই একটু থমকে দাঁড়িয়েছে অমনি বুনো শালিকেরা নেমে এলো খাবারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×