somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জাহিদুল হক শোভন
এই শহরে অনেক হাজার হাজার ছেলে আছে যারা চুপচাপ থাকে, কথা কম বলে। পৃথিবীতে তারা বোকা, লাজুক, হাঁদারাম নামে পরিচিত। আমাকে এর সাথে তুলনা করলে তেমন একটা ভুল হবে না। নিজের ব্যাপারে বলাটা অনেক কঠিন। তবে নিজেকে মাঝে মাঝে অনিকেত প্রান্তর ভাবি।

গল্প: চতুর্থ প্রেম

১৬ ই আগস্ট, ২০১৮ দুপুর ২:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বাবার কাছে আমি একটা কুলাঙ্গার, অপদার্থ, অকর্মা সন্তান। যার অর্থ দাঁড়ায় আমাকে দিয়ে কিছু হয় না। কিছু আশা করা যায় না। এমনকি কোন কিছুর জন্য নির্ভর করা যায় না। ঘন্টাখানেক আগেও যখন খাবার টেবিলে বসে ভাত খাচ্ছিলাম তখন বললো “কিরে অপদার্থ খাইতে তোর লজ্জা করে না?” আমি চুপ করে ছিলাম। আম্মা যখন প্লেটে মাছের মাথাটা দিল আব্বা টেবিলে তার হস্ত দিয়ে সজরে একটা বাড়ি দিয়ে বললো “যতদিন বাপ আছে ততদিন গিলতে পারবা,বাপ নাই এইসব খাওয়া দাওয়া চোখেও দেখবা না।” আম্মা একটু মুখটা গোমড়া করে বললো “আহা খাওয়ার সময় অন্তত একটু চুপ থাকেন।”

মানুষের শত্রু থাকে। সেই হিসেবে মনে হয় আমিই এখন উনার শত্রু। যাকে সহ্য করা যায় না। উনি লবনের বাটি থেকে এক চিমটি লবন প্লেটের একপাশে রেখে বললো ”আমি একটা অকর্মা জন্ম দিয়েছি।” কথাটা শুনেই খাবার টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ালাম। ভাতের প্লেটে পানি ঢেলে দিয়ে বললাম ”এই গুলা তো আপনার জাতীয় গালি কুলাঙ্গার অপদার্থ, অকর্মা, শুনতে শুনতে টায়ার্ড হয়ে গেছি পারলে অন্য কিছু শুনান। মানুষ দিন দিন নিত্য নতুনে আপডেট হচ্ছে, আপনিও আপডেট হোন।” আমার কথাগুলা শুনে উনি হা করে তাকিয়ে বললো ”দেখছো অকর্মটার কথা শুনছো।” আমি বাসা থেকে বের হয়ে যাই। আম্মা বার বার বলতে লাগলো ভাত খেয়ে যা। কই যাস? আমি উপেক্ষা করে চলে আসি নির্জন রাতের আধাঁরে। অবশ্য আধাঁর বলা যাবে না। চাঁদ আর ল্যাম্পোষ্টের আলো আছে। চারপাশে যেন এই দুই আলো একাকার হয়ে মিশে আছে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাটছি। আর সেই মিশ্রিত দুই আলোকে বললাম “এই যে তোমরা দুজন মিশে গেছো। দুজন দুজনার হয়ে গেছো এখন যে তোমাদের মাঝে আমি আসলাম তোমরা ডিস্টার্ব ফিল করছো না?

হাটতে হাটতে কিছুটা যেন হাপিয়ে গেছি। ফুটপাথেই বসে গেলাম। গাড়ির শব্দ আর তার লাল সাদা বাতি গুলা দেখে অনুধাবন করলাম জীবনটাই মনে হয় এই রকম লাল সাদা। একটু পর রাস্তার একটা কুকুর আমার সমুক্ষের কিছুটা দুরে এসে ঘেউ ঘেউ করে চিল্লাতে লাগলো। মেজাজটা কেমন করে যেন উঠলো। চিল্লানি দিয়ে বললাম...

"হালা চিল্লাস ক্যান? যাবি সামনে থেইকা?

এই রাত্রিতে গাড়ির শব্দ আর কুকুরের আওয়াজ আমার শ্রবনে বেশ ধেয়ে আসছে। যেন আমায় তাড়া করে বেড়াচ্ছে। বাসায় ঘ্যান ঘ্যানানির শব্দ, এইখানে গাড়ির শব্দ কুকুরের শব্দ। অবশ্য একজন মার্ষ্টাস কমপ্লিট করা ছেলে যদি বেকার হয়ে ঘুরে ঘুরে বাবার হোটেলে খায় ঘ্যান ঘ্যানানি তো শুনতেই হবে। আমার বাবার ইচ্ছা আমিও উনার মত একটা সরকারী চাকরি যেন করি। কিন্তু আমি এই নিয়ে বিভিন্ন সরকারী পরীক্ষা দিয়েছি দুইটা ছাড়া অন্য গুলাতে টিকিনি। আর সেই দুইটাতে একটা বড় অংকের টাকা চেয়ছিল। কিন্তু আমার বাবার কাছে সুদ আর ঘুষ এই দুইটা খুবি জঘন্য টাইপের। উনি যেমন নিজের যোগ্যতা দিয়ে চাকরি পেয়েছে আমাকেও তা পেতে হবে। কিন্তু আমার মহামান্য বাবা হয়ত জানে না এই যুগে এইসব চলে না। যার টাকা আছে তার নারী বাড়ি গাড়ি সবই আছে। শেষ মেষ আমি আর সরকারী চাকরির জন্য ট্রাই করিনি। হাল ছেড়ে দিয়েছি। তারপর প্রাইভেট চাকরির পিছনে ছুটতে লাগলাম। বেশি ছুটতে হয় নি। পেয়েও গেলাম এডমিনিষ্ট্রাসন পদে। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেই চাকরি আমার দ্বারা হলো না। যার মেয়াদ ছিল আট দিন। ম্যানেজার যখন আফজাল ভাইকে তার ভুলের কাজের জন্য তিরষ্কার করছিল তখন আমি বললাম...

"স্যার আমার মনে হয় কি বিষয়টা এইভাবে সকলের সামনে না বলে উনাকে পার্সোনালী বললে ভাল হবে। যেহেতু উনি অফিসের সিনিয়র এবং পুরানো ইমপ্লোয়ী।

উনি আমার দিকে কেমন একটা লুক নিয়ে তাকালো। আমি বেশ বুঝতে পেরেছিলাম উনার তাকানোর ধরনটা। লুকটা এমন ছিল যেন আমাকে বলছে সব বিষয়ে নাক গলাতে এসো না। নিজের চড়কায় তেল দাও। ঠিকি উনি আমাকে বললো...

"তোমার কাছ থেকে শিখতে হবে? আমাকে কি করতে হবে নাকি করতে হবে না।
"না স্যার আপনি ভুল বুঝছেন। আমি তা মিন করি নি।
"আমাকে শিখাতে এসো না আন্ডারস্ট্যান্ড?

এরপর আমি আর কিছু বলিনি। পরে উনি ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে অবহিত করেন এই যে ম্যানেজার সাবকে কি করতে হবে আর কি করতে হবে না তা যেন আমার কাছ থেকে শিখে। আমি নাকি উল্টা পাল্টা বলেছি। ডিরেক্টর স্যার আমাকে বলে..

"কত দিন হয়েছে চাকরি করেছেন?
"জ্বি স্যার আজ নিয়ে আট দিন।
"আগে কোথাও করেছেন?
"জ্বী না। এটাই ফার্স্ট।

এরপর উনি আমাকে কিছু কথা বললো। যা আমার একটুও ভালো লাগেনি। আমি স্হির করলাম এইখানে আমাকে দিয়ে হবে না। এরপর থেকে আমি আর ওখানে যাইনি। ভেবেছিলাম বাবার হোটেলে আর খেতে হবে না। চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাসায় এসে বাবাকে বলি বাবা তোমার হোটেলে খেতে খেতে মায়া লেগে গেছে। চিন্তার কারণ নেই তোমার হোটেলেই আগামীকাল থেকে আবার খাবো। উনি দাঁতে দাঁত চেপে কটমট করে বললো ”তুই আসলেই একটা কুলাঙ্গার।” রাস্তার কুকুরটা এখনো ঘেউ ঘেউ করে চিল্লাচ্ছে। আমি চুল গুলা চুলকিয়ে দাঁড়িয়ে আইজ তোরে খাইছি এই বলে কুকুরটাকে দৌড়ানি দিলাম। ওর পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে হাপিয়ে যাই। একটা রিকশা আমার সামনে থামে। তার মাঝে আদনান ভাই বসা। উনি রিকশা থেকে নেমে ভাড়াটা দিয়ে রিকশা চালককে বিদায় দিয়ে আমাকে বলে...

"কিরে দৌড়াস ক্যান?

আমি চুপ করে থেকে হাপাতে হাপাতে বললাম হালারে দৌড়াইসি। উনি আমার দিকে অবাক করা দৃষ্টি নিয়ে বলে ”বিয়ে করছিস? তোর সালার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতি।” আমার মেজাজটা একটু খারপ হলো। উনি সব সময় একটু বেশি বুঝে। আমি বললাম “তুমি কি জানো তুমি কি? তুমি একটা ব আকার ল। এত বেশি বুঝো ক্যান?” উনি আমার কথাটা গায়ে মাখলো না। তারপর অদ্ভুত একটা হাসি দিয়ে বললো..

"তোর সাথে কিছু কথা আছে।
"কি কথা?
"আমার মনে হয় কোথাও বসে বলি, কি বলিস।

এদিক ওদিক তাকিয়ে বললাম “কাহিনী কি?” উনি আমায় একটা চায়ের টঙ্গে যেতে বলে। আমি বললাম, না হোটেলে চলো ভাত খেতে খেতে বলি। তারপর আফসার মিয়ার হোটেলে যাই। সব কিছুর অর্ডারের পর যখন খাচ্ছিলাম উনি বললো “তুই কয়টা প্রেম করছিস?” আমি লোকমাটা দিয়ে তাকিয়ে থাকলাম। উনি চা খাচ্ছে। হোটেলের খাবার উনি তেমন খায় না। বউয়ের হাতের রান্না মিস করে না। আমি কিছু না বলে খেতে লাগলাম। আমার চুপ থাকা দেখে আবার বললো...

"প্রেম কয়টা যেন করছিস?
"সবই তো জানো। ক্যান তোমার কাছে তো সব কিছুই শেয়ার করছি।
"হুম তিনটা করছিস। আচ্ছা যে মেয়ে গুলার সাথে প্রেম করছিস তাদের বিয়ে হয়ে গেছে তাই তো? বা বিয়ে ঠিক হয়ে যায়।

আমি আরেকটা লোকমা দিয়ে বললাম হ্যাঁ অনেকটা সেরকম। উনি চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে টেবিলে একটা বাড়ি দিয়ে বললো ”তোরে দিয়ে হবে বুঝলি। আচ্ছা তোর একটা চাকরি দরকার তাই তো?” আমি হ্যাঁ সূচক ইশারা দেই। উনি আবার বলতে লাগলো এবার তোর চাকরি ফাইনাল নিশ্চিত থাক। শুধু মাত্র ছোট্ট একটা কাজ করতে হবে। আমি খেতে খেতে বললাম ”কি কাজ?” উনি বললো তেমন কিছু না, একজনের সাথে একটু প্রেম করবি এই আরকি। এতে মেয়েটার অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে যাবে আর বিয়ে হয়ে গেলে মেয়ের বাবা তোকে একটা চাকরি দিবে।” আমি কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে পানির গ্লাসে পানি ঢেলে পানি খেয়ে বললাম ”আমি তোমাকে এমনি এমনি ব আকার ল বাল বলি না।” আদনান ভাই আবার বলতে লাগলো ”আরে মেয়ের বাবা বিরাট পয়শা ওয়ালা। বুঝলি জাহেদ পৃথিবীতে আল্লাহ কিছু কিছু মানুষকে অনেক কিছু দিয়েছে কিন্তু সুখ ভালোবাসা তেমন দেয় না। আবার অনেক মানুষ আছে যাদের কিছুই নেই কিন্তু সুখ ভালোবাসা সব আছে। আমাদের কোম্পানীর চেয়ারম্যানের মেয়ে কথা বলতে পারে না। এই নিয়ে বেশ কয়েকজন দেখতে এসেছে কিন্তু বোবা বলে কেউ রাজি হয়নি। তুই মেয়েটার সাথে একটু প্রেম করবি তারপর ওর বিয়ে ঠিকি ঠিক হয়ে যাবে। যেহেতু তুই যার সাথেই প্রেম করিস কয়েকমাস পর তার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়।” আমি শুধু চুপ করে রইলাম। কি বলবো কিছুই বুঝতে পারছি না। আসলেই ব্যাপারটা ঠিক। আমি তিনটা প্রেম করেছি কিন্তু প্রেম করার কয়েকমাস পর মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। আমি বেকার বলে কিছুই করতে পারি নি। আর মেয়ে গুলোও তাদের বাবা মার কথার উপর না বলতে পারবে না। তবে তৃতীয় নাম্বার যে প্রেমটা করেছিলাম সে আমার সাথে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল কিন্তু আমি রাজি ছিলাম না। আমি খাওয়া শেষ করে বললাম আদনান ভাই এইসব আমাকে দিয়ে হবে না। আমি যাই। উনি আমায় বিষয়টা ভেবে দেখতে বলে।

"ভাইয়া কি করিস?

আমি মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে বললাম চোখে কি কম দেখস? নিধি আমার কাছে এসে বলে ”তুই সব সময় উল্টা পাল্টা কথা বলিস ক্যান? তোরে কিছুই বললেই তুই আমার সাথে এইভাবে কথা বলিস। আমি তোর বোন নাকি শত্রু?” আমি ওর দিকে কিছুক্ষন তাকালাম। আমি যদি একলাইন বলি আমার বোন পাঁচলাইন বলে। আমি বললাম...

"আমার ঘাঢ়ের একটা রগ ত্যারা জানস না? কি বলতে আসছিস বইলা ভাগ।
"আমি একটু বাহিরে যেতে চাচ্ছিলাম।
"তো যা।
"না আসলে আমাকে তুই একটু দিয়ে আসবি? আব্বা বাসায় আছে বের হতে দিবে না।
"এই দুপুর বেলা কই যাবি?

নিধি একটু চুপ করে রইলো। আমার ওর চোখের দিকে ভালো করে তাকালাম। ওর চোখ দুটো আমাকে বলছে ভাইয়া তুই তো সবি জানিস। আমার বুঝতেও বাকি রইলো না। তারপর বললাম আরাফাতের কাছে যাবি তাই তো? নিধি মাথা দিয়ে ইশারা দিল। ভাই হয়ে বোনের প্রেম মেনে নিচ্ছি এবং ওদের প্রেমের সাপোর্ট দিচ্ছি ভাবতেও কেমন যেন লাগে। আমি বললাম দুপুর বেলা যাওয়া লাগবে না। ফোনে কথা বল তাতেই হবে। নিধি আমার হাত ধরে বললো ভাইয়া প্লিজ একটু চল বেশিক্ষন থাকবো না। বিশ মিনিটের মত থাকবো। তোর সাথেই চলে আসবো।

আমি নিধিকে নিয়ে সি আর বি গেলাম। আরাফাত চুপ করে বসে আছে। ওর কাছে যেতেই ও আমাকে সালাম দেয়। আমি বললাম ”কি অবস্হা তোমার সব ঠিকঠাক চলছে তো?” ও বললো সব ঠিকঠাক আছে ভাইয়া। নিধি ওর কাধের ব্যাগটা একপাশে রাখলো। আমি বললাম ”তোরা কথা বল আমি ঐদিকটাতে যাই।” আমি একটু দুরে গিয়ে খেয়াল করলাম নিধি তার ব্যাগ থেকে খাবারের বক্স বের করলো। আর একটা পানির বোতল। আমার কেমন জানি লাগলো বিষয়টা দেখে। আজ বাসায় ভালো রান্না হয়েছিল বিরিয়ানী আর পায়েশ। আমি দুর থেকে তাকিয়ে থাকলাম। ভালোবাসা গুলা হয়তো এমোনি। প্রিয় মানুষটার জন্য কিনা করা হয়। নিধি পানির বোতল থেকে পানি ঢালছে আর আরাফাত হাত ধুয়ে নিয়ে তারপর খাওয় শুরু করে। নিধি চুপ করে তাকিয়ে আছে। আরাফাত ব্যাচেলর থাকে। ওর বাবা মা কুমিল্লায় থাকে। বাবার নিজের ইলেকট্রিকেল বিজনেস আছে। পড়ালেখার জন্য ও চট্টগ্রাম থাকে। ওরা দুজনে একসাথেই পড়ে কয়েক মাস পর ওদের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা।প্রথম যেদিন আরাফাতকে আমি নিধির সাথে দেখি আমার মাথাটা কেমন করে যেন উঠেছিল। হাত ধরে হাটছিল। আমি ওদের সামনে যাওয়াতে দুজনে ভয় পেয়ে যায়। আমি সব কিছু আস্ক করি। সব কিছু জানার পর বুঝলাম দুজনেই দুজনকে চায়। তারপর আরাফাতের কাধে হাত রেখে বলেছিলাম আমার বোনের চোখে যদি পানি দেখি না, তুমি কল্পনাও করতে পারবা না আমি তোমার কি করবো। আমার বোনকে একদমই কষ্ট দিবা না বলে দিলাম। আরাফাত এখনো বিরিয়ানী খাচ্ছে। তিয়ানাও ঠিক এমনিভাবে বাসায় নিজ হাতে ভালো কিছু রান্না করলে আমার সাথে দেখা করে আমাকে খাওয়াতো। ও ছিল আমার প্রথম ভালোবাসা। পৃথিবীটা কত নির্মম। ও কোথায় আর আমি এখন কোথায়। অনার্সে পড়ার সময় এক বড় ভাই একদিন ডাক দিল। আমি কাছে গিয়ে বললাম জ্বি ভাইয়া। উনি আমায় বললো কিসে পড়ো? আমি বললাম জ্বি অনার্স প্রথম বর্ষ। একাউন্টিং বিভাগে। উনি সানগ্লাস ঠিক ঠিক করতে বলে আগে দেখি নাই যে? আচ্ছা যাই হোক একটা কাজ করে দিতে হবে। আমি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলাম বলুন কি কাজ। উনি আমার কাধে হাত রেখে বললো ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের প্রথম বর্ষ একটা মেয়ে আছে নাম তিয়ানা, চশমা পড়ে, চুল কুকড়া। তুমি তাকে এই কাগজটা দিবে। আমি হাসলাম, বললাম ভাইয়া জটিল কেইস তাই তো? মানে ইয়ে আর কি ইয়ে। উনিও একটু হাসলো। আমি বলি এটা কোন ব্যাপারই না।

আমি ঠিকি ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে গিয়ে সেই চশমা পড়া, কুকড়া চুল তিয়ানাকে খুঁজতে লাগলাম। একজনকে বললে সে আমায় দেখিয়ে দেয়। আমি দুর থেকে দেখেই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। বিধাতার কি সৃষ্টি। বিধাতা কিছু কিছু মানুষকে এমন রুপ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠায় যেন চারপাশের জিনিস গুলো আলোয় পরিণত হয়। আমি কি ভেবে যেন সেই চিঠি টা খুলে পড়তে লাগলাম। তারপর এটা ফেলে দিয়ে নিজ হাতে লিখে, লেখার নিচে আমার নাম দিয়ে ওর নিকট দিয়ে দ্রুত চলে আসি। এর পরের দিনেই ও আমাদের ডিপার্টমেন্টে কয়েক জন মেয়ে নিয়ে এসে সোজা আমার সামনে এসে দাঁড়ায় তারপর বলে..

”এই লেখার মানে কি?

আমি চুপ হয়ে মাথা নেড়ে না সূচক ইশার দিলাম কিছুই না। ও একটা ঝাড়ি দিল। আমি সত্যিটা বলে দি এই যে, এক বড় ভাই একটা চিঠি দিতে বলেছে আপনাকে। কিন্তু আমি আপনাকে দেখে তার চিঠি ছিড়ে ফেলে দিয়ে নিজের নাম দিয়ে লিখে ওটা দেই। আমি কি করবো? এই রকম ভয়ংকর সুন্দর হওয়া উচিৎ ছিল না আপনার। আরেকটু কম সুন্দর হলে হতো না?

আমার কথা শুনে ও হেসে দিল। তারপর কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে চলে গেল। ও খুব চমৎকার একটা মেয়ে। এরপর প্রতিদিন ওকে দেখার জন্য ওর ডিপার্টমেন্টে যেতাম।একপর্যায়ে ও আমাকে ফ্রেন্ড হিসেবে মেনে নেয়। তার কয়েকমাস পর শুরু হয় নতুন অধ্যায়। যাকে সহজ ভাষায় বলা চলে ভালোবাসা। ওর আচার আচারন আমার প্রতি কেয়ার গুলো আমাকে ভাবাতো আমি একটা স্বর্গে আছি। অনার্সের তৃতীয় বর্ষে উঠার মাসখানেক বাদে ও আমার সাথে আগের মত কথা বলতো না। কিছু আস্ক করলে এড়িয়ে চলতো। আমি ওকে বুঝতে পারি না। দুরুত্ব বাড়তে থাকলো দুজনের মাঝে। যার ছোয়া, ভাবনা, অনুভূতি আমাকে ঘিরে থাকতো। আমার মনে হতো আমি কিছু ভুল করেছি। আমি বার বার তার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি সে আমায় এড়িয়ে চলে। আমি বলেছিলাম তোমার অভিমানের কারনটা আমায় বলবে? ও চুপ করে ছিল। আমি আবার বললাম আমার দোষটা একটু বলবে কথা দিচ্ছি তোমার সামনে আর আসবো না। ও চুপ করে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। ওর চোখের কথা গুলো আমি ঠিক ধরতে পারছিলাম না। আমার বুকটা ধক করে উঠে। আমি ওর হাতটা ধরে বললাম কি হয়েছে প্লিজ বলো। ও কান্না করতে থাকে তারপর কাদঁতে কাঁদতে বললো “আমি ভার্সিটি থেকে বাসায় যেতেই আম্মু বলে তৈরি হ। আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। তারপর জানলাম আমাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। আমি কি করবো বুঝতেই পারছিলাম না। কি করবো আর না করবো তা ভাবতে ভাবতেই ওরা চলে আসে। আমাকে দেখতে এসেই আংটি পড়িয়ে আকদ হয়ে যায় সাথে সাথেই। বিশ্বাস করো আমি কিছুই করতে পারিনি। ওর কথা শুনে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। নিজেকে শান্তনা দেওয়ার কোন শক্তি ছিল না আমার। আমার কিছুই করার ছিল না। আমি চুপ করে ওর সামনে থেকে চলে গিয়েছিলাম। আমার কিছুই ভালো লাগতো না। একদম ভালো লাগতো না।”

ওদের দিকে তাকিয়েই দেখি আরাফাতের খাওয়া শেষ। আমি ওদের কাছে গিয়ে বলি কিরে যাবি? নিধি আরাফাত থেকে বিদায় নেয়। রিকশায় উঠে আমি নিধিকে বললাম আমাকে বললেই হতো আমি আরাফাতের কাছে খাবার পৌছে দেবার ব্যবস্হা করতাম। ও বলে ”নিজে সামনে বসে ওর খাওয়া দেখে কতটা ভালো লাগা অনুভব করা যায় তুই বুঝবি না ভাইয়া।” সত্যিই আমি বুঝি না। আমার চোখে জল চলে আসে। সেই জলের প্রতিটা শব্দ আমি কাউকে বুঝতে দেই না।

আদনান ভাইয়ের কথাটা অনেক দিন ধরে আমায় ভাবাচ্ছে। কি করা উচিত্ আমি কিছু অনুধাবন করতে পারি না। সন্ধ্যার নাগাত আদনান ভাইয়ের বাসায় যাই। ভাবী দু কাপ চা দিয়ে যায়। আদনান ভাই ফিসফিস করে বলে ”আমি জানতাম তুই আসবি। চা খেয়ে ছাদে চল। এসব কথা এখানে বলা যাবে না। তোর ভাবী শুনলে অবস্হা বারোটা বাজাবে।” ছাদে গিয়ে আমি রেলিং এ হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম “একটা ছেলে জন্মের পরই সে যত বড় হয় তার কাধে আস্তে আস্তে দায়িত্বের কাজ বাড়তে থাকে। বাবা মায়ের দায়িত্ব, বউ সংসার ছেলে মেয়ের প্রতি দায়িত্ব। আমার বাবা কি না করেছে আমাদের জন্য। বিশ্বাস করো আদনান ভাই বাবার মুখে কুলাঙ্গার অকর্মা অপদার্থ ডাক শুনতে প্রথম প্রথম খারাপ লাগলেও এখন যদি একদিন না শুনি তারচেয়ে বেশি খারাপ লাগে। বাবা যদি মাঝে মাঝে কোন কারনে ভুলে যায় আমি ইচ্ছে করে বাবার সামনে গিয়ে নানা রকম উল্টা পাল্টা কাজ করি আর মনে মনে বলি আজকে বকা দিবা না বাবা?

আদনান ভাই আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। আমি আবার বললাম “আসলেই কি সত্য চাকরি হবে? তুমি আমার সাথে ফান করছো নাতো?” উনি আমায় উনার অফিসে আগামীকাল নিয়ে যাবে সেটা বলে।

আদনান ভাই এর অফিসে বসে থাকার ঘন্টা খানেক বাদে চেয়ারম্যান আসলে আমাকে উনার কাছে নিয়ে যায়। উনি আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বললো...

"তো মি. ইয়াঙ্গ ম্যান আদনান তোমায় সব বলেছে?
"জ্বী হ্যাঁ।
"আচ্ছা তোমার মনে প্রশ্ন জাগছে না কেন আমি একজন বাবা হয়ে এমন করছি?

আমি চুপ করে আদনান ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে তারপর উনাকে বললাম ”কারণ তো নিশ্চয় একটা আছে। প্রথম আপনার মেয়ে কথা বলতে পারে না। আর দ্বিতীয় আপনার মেয়ে মনোহর বা ভালো লাগার মত না।” উনি একটু হাসলো। তারপর পেপার ওয়েটটা ঘুরাতে ঘুরাতে বললো ”আমার মেয়ে দেখতে মা শা আল্লাহ। তবে হ্যাঁ কথা বলতে পারে না। ওর মা নেই। আমার মেয়েটা আমার আদরেই বড় হয়েছে। মেয়েদের একটা নির্দিষ্ট সময় হলে তার জন্য অন্য একটা মায়া অন্য মানুষজন, তার পরিবার হিসেবে আবদ্ধ হয়। আমি আমার মেয়েকে সেই অন্য পরিবারের কাছে দিতে অনেক চেষ্টা করেছি। কতজনকে দেখিয়েছি যদিও আমি এইগুলাতে এতোটা বিশ্বাসী না। এই দেখোই না তোমার সাথে প্রেম করতে তোমাকে ঠিক করেছি। হা হা হা। আদনান তোমার কথা আমায় বলেছে। এতো কিছু চেষ্টা করলাম তোমাকে দিয়ে না হয় একবার চেষ্টা করি। বাবার মন তো তাই। তবে হ্যাঁ আমার মেয়েকে ছোয়া যাবে না। আমার মেয়ে কিন্তু এইসবের ব্যাপারে কিছুই জানে না। তাই তোমাকে ওর বন্ধু হতে হবে। ও যেন কিছু জানতে না পারে। আমার মেয়ের নাম জেনিয়া। ও ছবি আকঁতে বেশ পছন্দ করে। একটু অভিমানিও বটে।

এই রকম একটা কাজ আমি করবো বা আমার কপালে লিখা ছিল ভাবতেও কেমন যেন লাগছে। আমি জেনিয়ার বন্ধু হওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করে নিলাম। কিভাবে কি করবো কিছুই বুঝছি না। কয়েকদিন লুকিয়ে লুকিয়ে ওকে ফলো করলাম। ওর সম্পর্কে আমার একটা ধারনা হলো। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবারে সে ছবি আকাঁর জন্য বের হয়। প্রকৃতির ছবি আকেঁ। তার আকাঁর তুলিতে নানা বিচিত্র ফুটিয়ে তুলে।

আজকেও শুক্রবার। আমি তার পিছন পিছন আসতে আসতে খাগড়াছড়ি চলে এসেছি। একটা মানুষের কত সখ থাকতে পারে। সেই সখ পূরণ করতে মানুষ কতটা পথ দুরে আসতে পারে আমি জেনিয়াকে দেখে বুঝলাম।

ছবি আকায় যখন ও ব্যাস্ত আমি আস্তে করে ওর পাশে গিয়ে বললাম ”মানুষ ছবি আকে কেন?” ও একটু তাকিয়ে আবার আঁকায় ব্যাস্ত হলো। আমি আবার বললাম ”আচ্ছা আপনার ছবি কথা বলতে পারে?” এবার ও একটু ভ্রু কুচকে আমার দিকে এমনভাবে তাকালো যেন বলছে কি চাই? প্রবলেম কি আপনার? আমি জানি ও কথা বলতে পারে না। তারপরো না জানার ভান করে বললাম “আপনার প্রকৃতি ভালো লাগে?” এবার ও কোমড়ে এক হাত রেখে আর এক হাত দিয়ে ও আমায় ইশারা করলো কি হচ্ছেটা কি?” আমি যথারীথি না বুঝার ভান করে বললাম কিছুই তো বুঝলাম না। ও এদিকে ওদিক তাকিয়ে সে যেটাতে ছবি আকঁছে সেটার আরেকটা পেজে লিখলো ”আমি কথা বলতে পারি না। আপনি কে? কেনই বা গায়ে পড়ে কথা বলতে এসেছেন?

আমি একটু অবাক হওয়ার ভঙ্গিমা ধরলাম কি বলেন আপনি কথা বলতে পারেন না এই টাইপের। ও চুপ করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি ইতস্তত করে বললাম “সত্যিই আপনি কথা বলতে পারেন না? ও মাথা নেড়ে না সূচক ইশারা দেয়। আমি ওর চারপাশে হাটতে থাকলাম তারপর আশ্চর্য টাইপের কিছু আচরণ করে বললাম...

"আপনার সাথে এই ছবি গুলার অনেক মিল।

ও কি বলবে বুঝতে পারছে না। আমি একটা অপরিচিত ছেলে আর কেনই বা ওর সাথে কথা বলছি ও কিছুই অনুধাবন করতে পারছে না। অবশ্য না বুঝারি কথা। ওর চুপ করে থাকা দেখে আমি আবার বললাম...
.
"এই যে দেখুন বিধাতা আপনাকে সৃষ্টি করেছে অথচ মনের ভাব প্রকাশ করার উচ্চারন শক্তি দেয়নি। ঠিক আপনার আকাঁ ছবি গুলা দেখুন। ছবিটাতে আকাশে কাক উড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু দেখুন কাকটার কোন শব্দ শোনা যাচ্ছে না।

আমার কথাটা শুনে জেনিয়ার মুখটা কেমন জানি হয়ে গেল। না বলা কত শব্দ যে ওর মাঝে জমা হয়ে আছে। আমি ওর আহত মন দেখে বললাম প্রকৃতিকে দেখুন সে কত নিশ্চুপ তবুও তার সৌন্দর্যের তুলনা হয় না, ঠিক যেন আপনার মত। আপনি যেমন নিশ্চুপ তেমন মনোহর। জেনিয়া কথা টা শুনে ছবি আকাঁর কাগজটার কাছে গিয়ে ওখানে লিখলো “কে বলেছে আপনাকে মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য উচ্চারন প্রয়োজন? আর হ্যাঁ আমি প্রকৃতির মতো এতো মনোহর না।” এইটুকু লিখে থামে তারপর চুল কানে গুজে আমার দিকে তাকিয়ে আবার লিখলো আচ্ছা আপনাকেই বা কেন আমি এইগুলা বলছি?

ক্রমান্বয়ে এইভাবেই জেনিয়ার সাথে কথা বলাটা শুরু করি। আমার আকাশে নতুন মেঘ জমেছে। সে মেঘ আকাশে ভেসে বেড়ায়। যেমন টা মিথিলার সাথে আমার পরিচয় হয়। রাইসুলের মামার বিয়েতে যখন গিয়েছিলাম তখন। একদিন আমি দরজা দিয়ে বের হচ্ছিলাম আর ও ঢুকছিল। ওর সাথে আমার মাথায় বাড়ি খায়। ও মাথায় হাত দিয়ে উফ করে বলে ”চোখে দেখতে পান না নাকি?” আমিও মাথায় হাত দিয়ে স্যরি বলে চলে আসি। এর ঘন্টাখানেক পর আমার কাছে এসে বলে ”আপনার সাথে আমার মাথায় বাড়ি খেয়েছি আরেকবার খান। আমি বললাম কেন? ও বলে একবার বাড়ি খেলে মাথায় শিং উঠে জানেন না? আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে বলি ”এইগুলা আপনাকে কে বলেছে? ও ভ্রু কুচকে তাকিয় থেকে আমার মাথার সাথে বাড়ি খেয়ে চলে যায়। ও ছিল খুব সহজ সরল একটা মেয়ে। এই সহজ সরল মেয়ের সাথে কিভাবে প্রেম হয়ে গেল আমি নিজেও এখনো বুঝতে পারি না। একদিন আমায় বলে ”আপনার শহরে পুকুর আছে?” আমি বলি তেমন একটা নেই। ও হাসতে থাকে। তারপর বলে এমন শহরে থাকেন কিভাবে? কখনো আকাশের নিচে পুকুরে পা ডুবিয়েছেন? আমি মাথা নেড়ে বুঝাই না। ও বলে আচ্ছা ঠিক আছে আমাদের গ্রামে যে নদীটা বয়ে গেছে তার মাঝে আমার সাথে পা ডুবিয়ে রাইখেন। সেদিন আমি ওর সাথে পা ডুবিয়ে রেখেছিলাম। তিয়ানার এই ভাবে চলে যাওয়ার আঘাতটা যেন মিথিলার আচার আচারণ আমাকে স্বস্থি দিচ্ছিল। আমি শহরে চলে আসি। আসার আগে মিথিলাকে বলি তোমার সাথে হয়তো আমার আর কথা হবে না, জানো খুব ভালো লাগে তোমার সাথে কথা বলতে। ও বলে ”আমারো কেন যেন ভালো লাগে। আমাদের গ্রামে আবার আসিয়েন। সেদিনই ওর নাম্বারটা আমি নেই। শহরে আসার পর ওর সাথে আমার ফোনে কথা হয়। কথা বলতে বলতে হঠাৎ অনুভব করলাম আমরা দুজন দুজনার। সে জানায় আমাকে কতটা চায়।

সব ঠিক ছিল। কিন্তু এর কয়েক মাস পর খবর পেলাম ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে। আরেকটা ধাক্কা খেলাম। ও ওর বাবা মায়ের অমত হতে পারবে না। আমার চোখে এবার পানি আসে আষাঢ়ের ঝুম বৃষ্টির পানি।

জেনিয়া কোথায় যায় আর কি করে এদিকে আমি সব খোঁজ খবর নিতে লাগলাম। আবার সে কোন এক শুক্রবারে বের হয় পতেঙ্গার দিকে। আমি যথারীথি তার সামনে যাই। গিয়ে বললাম “আচ্ছা আপনি কি আমায় ফলো করেন? ও অবাক হয়। ওর তীক্ষ্নদৃষ্টিতে আমি মাতাল হওয়ার গন্ধ পাই। যাকগে ওসবে জড়াতে যাব না। যদিও আমিই ওকে ফলো করি তবুও কথা বলার তো একটা অযুহাত দেখাতে হবে। সে মাথা আর হাত দিয়ে ইশারা করে আমায় বুঝাতে লাগলো মোটেও আমি আপনাকে ফলো করছি না, বরং আপনি আমায় ফলো করছেন? আমি বললাম ”আচ্ছা আপনার সাথে আমার বার বার দেখা হয়ে যাচ্ছে কেন?” ও চুপ করে রইলো। তারপর আমাকে ইগনোর করে ছবি আকাঁতে মনোযোগ দেয়। আমি খুব শান্ত ছেলে হয়ে তার ছবি আকাঁর দিকে তাকিয়ে থাকি। কি চমৎকার ছবি আকেঁ মেয়েটা।
.
আমি অনুধাবন করি বিধাতা এই মেয়েটার মুখে শব্দ দিলে কি এমন হতো। ওকে বিয়ে করতে চায় না। আবার অনেকে রাজিও হয়েছে কিন্তু জেনিয়ারও অনেককে পছন্দ হয়নি। বোবা হলেও কি এই মেয়েটার পছন্দ থাকতে পারে না? আমি ওকে বলি ”কেউ যদি আপনার সাথে বন্ধু করতে চায় করবেন বন্ধুত্ব?” জেনিয়া আমার দিকে ফিরে তাকায়। একটা আর্ট পেপারে বড় করে লিখলো "না"। আমি হাসলাম। আস্তে আস্তে হেটে হেটে সাগরের এপার থেকে জোরে একটা চিত্‍কার দেই ওপাশ থেকে প্রতিধ্বনি ফিরে আসে। একটু পর জেনিয়াও আমার একপাশে এসে আ........ করে জোরে একটু চিত্‍কার দেয়। দিয়ে আমার দিকে তাকায়। আমি আবার দিলে ও আবার দেয়। আমি ওকে বলি একসাথে দুজনে দেই কেমন? ও মাথা নেড়ে বুঝায় আচ্ছা ঠিকাছে। তারপর দুজনে কয়েকবার মিলে আওয়াজ করি। ও ওর ছবি আকাঁর কাগজে আমাকে লিখে বলে ”কি নাম আপনার? জাহেদ বলেই ডাকে। কিন্তু আপনার নাম আমি জানি। ও অবাক হয়ে বুঝায় কিভাবে? আমি বলি এই যে আর্ট পেপারে আপনার নাম আছে। ও একটা হাসি দেয়। সারাটা বিকাল ওর সাথে ছিলাম। খালি পায়ে পানিতে হাটলাম। যাবার বেলায় ওর নাম্বারটা দেয়। আমি রাতে ফোন দেই কিন্তু ও চুপ। কি করেন আজকের দিন কেমন কাটলো জিজ্ঞাসা করলাম। ও কি রকম যেন শব্দ করলো আমি কিছুই বুঝি নি। আমি বার বার বললাম বুঝতে পারছি না। তারপর ও ফোনটা কেটে দেয়। আমি একটু অনুধাবন করলাম তারপর ওকে মেসেজ দিলাম...

"কি মন খারাপ?
"কি মনে হয়?
"মনে হয় মন খারাপ।
"কেন মনে হয়?
"এক দেশে এক রাজকুমার ছিল। সে রাজকুমার একদিন এক রাজকুমারীর সাথে সন্ধ্যান পেল। তার বন্ধুত্ব হয়। ফোন নাম্বর নেয়। রাজ কুমার কল দিয়ে কথা বলতে থাকে কিন্তু রাজ কুমারী তা পারছিল না। সে কারনে তার মন খারাপ।
"আপনি না একটা।
"আমি একটা কি? পাগল?
"জানি না। তার থেকেও বেশি।
"হা হা হা।
"হাসির কিছু বলি নি যে এইভাবে পাগলের মত হাসতে হবে।
"আমি তো পাগলই। দেখলেন না কিভাবে পরিচিত হলাম আপনার সাথে।
"আমিও ঠিক এটা কল্পনা করতে পারি নি। আপনার সাথে আমার এইভাবে পরিচয় হবে।

আমি জেনিয়ার সাথে এইভাবে দিনের পর দিন কথা বলতে থাকি। তার সাথে সময় কাটানো ভালো লাগার দৃশ্য গুলো আমায় ভাবায়। আমি কী ভুল করতে যাচ্ছি? এই রকম করা কী ঠিক হচ্ছে?

তৃতীয় প্রেমটা করেছিলাম ইভানার সাথে। দুইটা ধাক্কা খেয়ে যখন আমি দিশেহারা হয়ে গেলাম কারো সাথে কথা বলতাম না তেমন। বাসায় চুপ করে থাকতাম নিজের রুমের মাঝে। আব্বা এসে বকা দিত। আমি ছাদে চলে আসতাম। আমাদের ছাদ আর ইভানাদের বিল্ডিং এর ছাদ পাশাপাশি ছিল। আব্বা সরকারী চাকরি করলেও সরকারি কোয়ার্টারে থাকতো না। আমি ছাদে চুপচাপ বসে থাকতাম মনমরা হয়ে। একদিন ইভানা আমায় ডাক দেয়...

"এই যে শুনছেন?

আমি চুপ করে থাকি কোন কথা বলি না। ও আবার ডাক দেয়...

"আপনি এইভাবে মন মরা হয়ে বসে থাকেন কেন?

আমি তারপরো কিছু বলি না। ঠিক এই রকম কয়েকটা দিন কেটে যায়। একদিন আমার সামনে এসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে...

"প্রেমে ব্যর্থ তাই তো? অবশ্য প্রেমে ব্যর্থ হলেই ছেলেরা এইভাবে থাকে।

আমি চুপ করে ছিলাম। সে কানে চুল গুজে বলে, প্রেমে ব্যর্থ হলে আবার প্রেম করতে হয়। তার সাথে কি থেকে কি হয়ে গেল কয়েকমাস পর ওর সাথে আমার সময় কাটতে কাটতে ওর সাথেই প্রেমটা করি। কিন্তু আগের মত প্রেমে জড়ানোতে যে ফিলিংসটা ছিল সেটা কাজ করতো না। ওর সাথে প্রেম করার পর ওর বাসায় বিয়ের প্রস্তাব আসে। ছেলে আমেরিকা থাকে। ইভানা খুব হতাশ হয়ে যায়। আমাকে বলে চলো পালিয়ে যাই। কিন্তু আমার মাঝে ঐ ফিলিংসটা আসেনি। দু বার ধাক্কা খাওয়ার পর বিষয়গুলো কেন যেন সহজ মনে হতে লাগলো। তারপর ইভানার বিয়ে হয়ে যায়। সে এখন আমেরিকা। আমি বুঝি না আমার সাথেই বা কেন এমন হয়?

এদিকে জেনিয়ার সাথে আমার পার করা দিন গুলো ভালোই এগোতে লাগলো। তার সাথে ছবি আকঁতে যাওয়া। সে আমার ছবি আকেঁ। একসাথে হাটি ঘুরি। মেসেজে আমাদের কথার ঝুলি বাড়তে থাকে। জেনিয়াকে ঘিরে আমার পথে আলো ফিরে আসে। অভিনয় করতে করতে আমার অচেতন শহরে শান্তির বৃষ্টি নামে। যে বৃষ্টি গরমকে দুর করতে আকাশ থেকে নেমে আসে। আমার অন্ধনির্জনেও সেই বৃষ্টি নামে আধার দুর করতে। কিন্তু আমি চাইনা এসবের। তিন মাস হয়ে যায়। জেনিয়ার বাবা আমায় ফোন করে বলে তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। আমি এটা বিশ্বাস করতে পারছি না এমনটা হয়। জেনিয়াকে আবির নামের একজন দেখতে আসার কথা। আসার আগে আমি তাকে সব কিছু বলি। কিন্তু আমি বলার আগেই সে সব কিছু বলে দেয়। সে সব কিছু জেনেও রাজি।

আমার আকাশে মেঘের ছায়া নামে। যে ছায়ার কোন আলো নেই। চারপাশে কালো ছায়া। আমি জেনিয়ার সাথেই প্রেম করার আগেই এমন হয়ে গেল। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না। এটা কি করে সম্ভব। কেন এমনটা হয়। শর্ত অনুযায়ী আমাকে এখন একটা চাকরি দেওয়া দরকার। কিন্তু জেনিয়ার বাবাকে আমি বলে দেই চাকরিটা আমাকে দিয়ে হবে না। আমার দিন যায় রাত যায় ভালো লাগার মত কিছু নেই আমার মাঝে। আম্মা ডাক দিলে খাবার টেবিলে বসি আব্বা আমায় দেখে বলে আর কত এইভাবে চলবি? আর কথ অকর্মা থাকবি? আমি কিছু না বলে চুপ করে খেতে থাকি। আমার গলা দিয়ে খাবার নামে না।

রাত্রে বেলা ঘুম যখন আসছিল না তখন ছাদে যাওয়ার জন্য রুম থেকে বের হতেই শুনতে পেলাম আব্বা আম্মাকে বলছে ”জাহেদের মা, জাহেদের কি যেন হয়েছে ছেলেটা দিন দিন কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে। ঠিক মতো কি খাওয়া দাওয়া করে না? আম্মা বললো ”কিভাবে করবে? খাওয়ার সময় তো উল্টা পাল্টা কথা বলেন। আব্বা বলতে লাগলো আরে আমি বলবো নাতো কে বলবে? আমি তো আর ইচ্ছে করে বলি না। না বললে কিছু করার প্রতি ওর আগ্রহ আসবে না। তাই বলে তুমি ওর খাওয়া দাওয়ার প্রতি নজর দিবা না।”

আমার কেন যেন খুব কান্না আসে। না এই কান্না আষাঢ়ের ঝুম বৃষ্টি না। আব্বাকে জড়ায় ধরতে ইচ্ছে করছে আর বলতে ইচ্ছে করছে আব্বা এখন একবার অকর্মা অপদার্থ বলে ডাকবেন?

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে যখন ফ্রেশ হলাম তখনি নিধি বলে ভাইয়া এইদিকে আয় তো। আমি গিয়ে দেখি জেনিয়া। খানিকটা অবাক হলাম। তার চোখে আমি জল দেখি। সে আমাকে বুঝায় তার সাথে যোগাযোগ কেন করছি না। আমি কি বলবো বুঝতে পারি না। জেনিয়া এদিক ওদিক তাকিয়ে নিধিকে ইশারা দিয়ে বলে খাতা কলম হবে? নিধি খাতা কলম এনে দিলে জেনিয়া বড় করে লিখলো। আমি এখানে একেবারে চলে এসেছি। ওর এই লেখার ধরনটা ঠিক বুঝলাম না। কি বলে এসব। ও আমাকে ইশারা দিয়ে বলতে লাগলো যা হবার হবে এই বাসা থেকে আমি যাবো না। তোমার সাথে পরিচয়ের পর কথা বলার একেক টা সময় আমার কাছে অন্যরকম ছিল। এই কয়দিন যখন আমার সাথে যোগাযোগ করো নি আমার একদম ভালো লাগছিল না। পরে বুঝলাম আমি তোমাকে চাই। আর বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছে। আমি বউ হলে এই বাড়ির বউ হবো। ওর ইশারা করা কথা গুলা শুনে আমার কি বলা উচিত্‍ বুঝতে পারছি না। শুধু এইটুকুই ভাবছি এবার একটা সাহসের মত কাজ করা দরকার। আর না। এইভাবে বার বার ধাক্কা খেতে আর সহ্য হচ্ছে না...
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জানুয়ারি, ২০১৯ রাত ৯:৪৭
৬টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার একান্ত মুহূর্ত কি লুকানো ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে, জেনে নিন শনাক্তের উপায়

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৩৬

আপনার একান্ত মুহূর্ত কি লুকানো ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে, জেনে নিন শনাক্তের উপায়

USB Charger এর ভেতরে লুকানো ক্যামেরার ছবিটি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ভূমিকা

ভ্রমণ মানেই নতুন জায়গা দেখা, প্রিয়জনের সাথে সময় কাটানো... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের সেই মানুষগুলো কোথায় গেলো

লিখেছেন অর্ক, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:২৬



স্বাধীনতা পরবর্তী, পচাত্তর পরবর্তী সময়ের ঘটনা। পচাত্তরের পনেরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। ক্যু হয়েছে দেশে। সামরিক বাহিনীতে সংঘাত। বহু সদস্য হতাহত। জেনারেল জিয়া অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভুটান ও বাক স্বাধীনতা!

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:৪৪

ভুটানের নাগরিকদের জন্য দেশটির সরকার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা নিশ্চিত করেছে, যা দেশটির "গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস" (GNH) দর্শনের মূল ভিত্তি। ভুটানের সাধারণ মানুষ মূলত যে সমস্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাঝা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:০৬



বর্তমানে জনসংখ্যার বিচারে 'বিহার' ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম রাজ্য।
বিহারের রাজধানী পাটনা। বিহার মূলত দরিদ্র অঞ্চল বলা যেতে পারে। এখানে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। অনেক পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা ছিলো মূলত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি ক্যাশলেস সোসাইটি এর জন্য কি পারফেক্ট?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



এটা বাংলা কিউ আর কোড। বাংলাদেশ ব্যাংক সকল ব্যাবসায়ীদের বাংলা কিউ আর কোড বাধ্যতামূলক করেছেনভ এটার ভালো দিক ও খারাপ দিক দুইটাই আছে। বাংলাদেশের সিস্টেম, কারিগরি দক্ষতা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×