মক্কা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা দান এবং মওলানা তাহের চোম্বলের কাছে ইসলাম ও আত্মশুদ্ধি সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান লাভ করতে থাকেন হাজী শরীয়তুল্লাহ।
কিন্তু স্বদেশে ফেরার জন্যে তাঁর হৃদয়টা ব্যাকুল হয়ে উঠলো।
কেবলই মনে পড়তে থাকলো তাঁর আপন মাতৃভূমির কথা। স্বজনদের কথা। প্রিয় চাচার কথা।
চাচা মুহাম্মদ আজিমের অসুস্থতার খবরও তিনি পেয়ে গেছেন।
এসব কথা ভাবতে গিয়ে মক্কার প্রবাস জীবনে অস্থির হয়ে ওঠেন হাজী শরীয়তুল্লাহ।
সিদ্ধান্ত নেন মক্কা থেকে স্বদেশে ফিরে আসার।
অবশেষে তিনি ফিরে এলেন স্বদেশের মাটিতে।
সময়টা ছিলো আঠারো শো আঠারো সাল।
হাজী শরীয়তুল্লাহ দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে যখন নিজ গ্রাম শামাইলে পৌঁছুলেন, তখন দেখলেন তাঁর একমাত্র জীবিত চাচা মুহাম্মদ আজিম তালুকদার ভীষণ অসুস্থ।
প্রাণ-প্রিয় চাচার এই করুণ অবস্থা দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ!
চারদিকে আঁধার কালো
খুব শৈশবে গ্রাম ছেড়েছিলেন শরীয়তুল্লাহ।
তিনি মক্কা থেকে ফিরে এসে তখনকার সেই পরিচিত মুখগুলোর মধ্যে অনেককেই আর দেখতে পেলেন না!
এর মধ্যে হারিয়ে গেছে তাঁর কত যে চেনা মুখ! কত যে কাছে মানুষ! কত যে খেলার সাথী!
স্বজন হারানোর এই বেদনা হাজী শরীয়তুল্লাহকে খুব ব্যথিত করে তুললো।
কিন্তু তার চেয়েও তিনি বেশি ব্যথিত হলেন চার পাশের মানুষ ও তাদের পরিবেশ দেখে।
আতকে উঠলেন তাদের অধঃপতন দেখে!
কুসংস্কার, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অভাব দারিদ্র্য আর শোষণ নির্যাতনে মুষড়ে পড়া মুসলিম পরিবারগুলোর দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারেন না হাজী শরীয়তুল্লাহ!
চারদিকেই আঁধারের কালো ছায়া!
এদেশ তখনো ইংরেজদের দখলে।
ইংরেজদের শোষণ আর অত্যাচারে অতিষ্ঠ শহরের মানুষ। তার চেয়েও বেশি অতিষ্ঠ গ্রামের মানুষ।
পাড়া-গ্রামে চলছে অত্যাচারী জমিদার, মহাজন আর নীল করদের একচেটিয়া দাপট।
শুধু ইংরেজই নয়।
এদেশের হিন্দু জমিদাররাও তাদের সাথে মিশে অত্যাচারের বিষে জর্জরিত করছে সাধারণ মুসলমানকে।
সে সময়ে গ্রামের অধিকাংশ মুসলমানই ছিলো অত্যন্ত দরিদ্র।
তাদেরকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দিতো না একদিকে ইংরেজ, নীল কর এবং অপরদিকে এ দেশীয় হিন্দু এবং হিন্দু মহাজন ও জমিদাররা।
অসহায় দরিদ্র মুসলমানদের অধিকাংশই ছিলো অশিক্ষিত।
একটু যারা শিক্ষিত তারাও ছিলো অনেকটা অসচেতন।
ইংরেজরা হিন্দু ও হিন্দু জমিদারকে খুব সুনজরে দেখতো।
হিন্দুদেরকে তারা খুব কদর করতো। আর মুসলমানরা ছিলো তাদের দু’চোখের বিষ।
তারা মুসলমানদেরকে শত্রু ভাবতো।
তাই তারা সুকৌশলে সকল সময় হিন্দুদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলতো দরিদ্র অশিক্ষিত মুসলমানদের ওপর।
ইংরেজদের আশকারা আর মদদ পেয়ে হিন্দুরা ছলে-বলে-কৌশলে মুসলমানদেরকে গ্রাস করতে উদ্যত হতো।
তারা গ্রাস করতো মুসলমানদের অর্থ-সম্পদ, জমি-জায়গা।
তাতেও তারা খুশি হতো না।
এরপর তারা মুসলমানদের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও ধ্বংস করার চেষ্টা করতো সর্বক্ষণ।
মুসলমানদেরকে ইসলাম থেকে, তাদের ঐতিহ্য থেকে দূরে রাখার সকল প্রকার অপকৌশল প্রয়োগ করতো হিন্দুরা।
তাদের হাতে ক্ষমতা আর অর্থ থাকার কারণে তারা সহজেই প্রভাবিত করতে পারতো দরিদ্র-অশিক্ষিত মুসলমানদেরকে।
এইভাবে এক সময় মুসলমানরা কুসংস্কারের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়লো।
হাজী শরীয়তুল্লাহ দেখলেন মুসলমানদের এই করুণ পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থা।
তিনি দেখলেন, মুসলমানরা রোযা-নামাযসহ আল্লাহর ইবাদাত ছেড়ে দিয়ে, আপন সংস্কৃতি ভুলে গিয়ে হিন্দুদের সংস্কৃতিকে গ্রহণ করে নিয়েছে!
তারা নামেই কেবল মুসলমান আছে।
তাদের মধ্যে নেই ইসলামের কোনো ছায়া চিহ্ন।
ইসলামের কোনো কিছুই তারা পালন করে না।
দীর্ঘকাল হিন্দুদের দ্বারা প্রভাবিত হবার কারণে হিন্দুয়ানী আচার অনুষ্ঠান ও হিন্দু সংস্কৃতিতে তারা গা ভাসিয়ে দিয়েছে।
ইসলামের যে মৌলিক ও পৃথক সংস্কৃতি বলে কিছু আছে এ কথাও তারা ভুলে গেছে।
কি সর্বনেশে ব্যাপার!
তাদের এই অধঃপতন দেখে খুবই মর্মাহত হলেন হাজী শরীতুল্লাহ।
তিনি পথভোলা মানুষের কাছে নতুন করে ইসলামের দাওয়াত দেবার প্রয়োজনবোধ করলেন। এই বোধ থেকেই তিনি শুরু করলেন ইসলামের দাওয়াতী তৎপরতা।
বেগবান করলেন তাঁর সংস্কার আন্দোলন।
মানুষকে আহ্বান জানান তিনি সত্যের দিকে।
আল্লাহর দিকে।
সাধারণ মুসলমানকে তিনি বুঝান ইসলামের আকীদা-বিশ্বাস।
বুঝান ইসলামের সুমহান আদর্শ ঐতিহ্য।
বুঝান সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য।
কিন্তু কি আফসোস!
গ্রামের মুসলমানরা এতোটাই অন্ধকারে ডুবেছিলো যে, হাজী শরীয়তুল্লাহর শত আহ্বানেও তারা প্রথমত এতোটুকু সাড়া দেয়নি।
তারা চিনতে ভুল কললো সত্য-সঠিক পথ।
বুঝতে ভুল করলো হাজী শরীয়তুল্লাহকে।
অন্ধ মানুষের মধ্যে দীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে প্রথম দিকেই ব্যর্থ হলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ।
তাদের গুমরাহীতে ভীষণ কষ্ট পেলেন তিনি।
ভেবেছিলেন, অন্ধকারাচ্ছন্ন-পথভোলা গ্রামের আপন মানুষকে তিনি পথের দিশা দেখাবেন।
তাদেরকে আবার ইসলামের আলোয় আলোকিত করবেন।
কিন্তু পারলেন না তিনি। পারলেন না হাজী শরীয়তুল্লাহ।
কারণ তাঁর কথা কেউ শুনলো না!
***** আগামী পর্ব - আবারো মক্কার পথে
***** গত পর্ব - মক্কার পথে
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৩:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


