somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের সংগ্রামের উজ্জ্বল পুরুষ- হাজী শরীয়তউল্লাহ (৬ষ্ঠ পর্ব)

০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৩:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

স্বদেশের দিকে
মক্কা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা দান এবং মওলানা তাহের চোম্বলের কাছে ইসলাম ও আত্মশুদ্ধি সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান লাভ করতে থাকেন হাজী শরীয়তুল্লাহ।
কিন্তু স্বদেশে ফেরার জন্যে তাঁর হৃদয়টা ব্যাকুল হয়ে উঠলো।
কেবলই মনে পড়তে থাকলো তাঁর আপন মাতৃভূমির কথা। স্বজনদের কথা। প্রিয় চাচার কথা।
চাচা মুহাম্মদ আজিমের অসুস্থতার খবরও তিনি পেয়ে গেছেন।
এসব কথা ভাবতে গিয়ে মক্কার প্রবাস জীবনে অস্থির হয়ে ওঠেন হাজী শরীয়তুল্লাহ।
সিদ্ধান্ত নেন মক্কা থেকে স্বদেশে ফিরে আসার।
অবশেষে তিনি ফিরে এলেন স্বদেশের মাটিতে।
সময়টা ছিলো আঠারো শো আঠারো সাল।
হাজী শরীয়তুল্লাহ দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে যখন নিজ গ্রাম শামাইলে পৌঁছুলেন, তখন দেখলেন তাঁর একমাত্র জীবিত চাচা মুহাম্মদ আজিম তালুকদার ভীষণ অসুস্থ।
প্রাণ-প্রিয় চাচার এই করুণ অবস্থা দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ!

চারদিকে আঁধার কালো
খুব শৈশবে গ্রাম ছেড়েছিলেন শরীয়তুল্লাহ।
তিনি মক্কা থেকে ফিরে এসে তখনকার সেই পরিচিত মুখগুলোর মধ্যে অনেককেই আর দেখতে পেলেন না!
এর মধ্যে হারিয়ে গেছে তাঁর কত যে চেনা মুখ! কত যে কাছে মানুষ! কত যে খেলার সাথী!
স্বজন হারানোর এই বেদনা হাজী শরীয়তুল্লাহকে খুব ব্যথিত করে তুললো।
কিন্তু তার চেয়েও তিনি বেশি ব্যথিত হলেন চার পাশের মানুষ ও তাদের পরিবেশ দেখে।
আতকে উঠলেন তাদের অধঃপতন দেখে!
কুসংস্কার, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অভাব দারিদ্র্য আর শোষণ নির্যাতনে মুষড়ে পড়া মুসলিম পরিবারগুলোর দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারেন না হাজী শরীয়তুল্লাহ!
চারদিকেই আঁধারের কালো ছায়া!
এদেশ তখনো ইংরেজদের দখলে।
ইংরেজদের শোষণ আর অত্যাচারে অতিষ্ঠ শহরের মানুষ। তার চেয়েও বেশি অতিষ্ঠ গ্রামের মানুষ।
পাড়া-গ্রামে চলছে অত্যাচারী জমিদার, মহাজন আর নীল করদের একচেটিয়া দাপট।
শুধু ইংরেজই নয়।
এদেশের হিন্দু জমিদাররাও তাদের সাথে মিশে অত্যাচারের বিষে জর্জরিত করছে সাধারণ মুসলমানকে।
সে সময়ে গ্রামের অধিকাংশ মুসলমানই ছিলো অত্যন্ত দরিদ্র।
তাদেরকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে দিতো না একদিকে ইংরেজ, নীল কর এবং অপরদিকে এ দেশীয় হিন্দু এবং হিন্দু মহাজন ও জমিদাররা।
অসহায় দরিদ্র মুসলমানদের অধিকাংশই ছিলো অশিক্ষিত।
একটু যারা শিক্ষিত তারাও ছিলো অনেকটা অসচেতন।
ইংরেজরা হিন্দু ও হিন্দু জমিদারকে খুব সুনজরে দেখতো।
হিন্দুদেরকে তারা খুব কদর করতো। আর মুসলমানরা ছিলো তাদের দু’চোখের বিষ।
তারা মুসলমানদেরকে শত্রু ভাবতো।
তাই তারা সুকৌশলে সকল সময় হিন্দুদেরকে ক্ষেপিয়ে তুলতো দরিদ্র অশিক্ষিত মুসলমানদের ওপর।
ইংরেজদের আশকারা আর মদদ পেয়ে হিন্দুরা ছলে-বলে-কৌশলে মুসলমানদেরকে গ্রাস করতে উদ্যত হতো।
তারা গ্রাস করতো মুসলমানদের অর্থ-সম্পদ, জমি-জায়গা।
তাতেও তারা খুশি হতো না।
এরপর তারা মুসলমানদের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও ধ্বংস করার চেষ্টা করতো সর্বক্ষণ।
মুসলমানদেরকে ইসলাম থেকে, তাদের ঐতিহ্য থেকে দূরে রাখার সকল প্রকার অপকৌশল প্রয়োগ করতো হিন্দুরা।
তাদের হাতে ক্ষমতা আর অর্থ থাকার কারণে তারা সহজেই প্রভাবিত করতে পারতো দরিদ্র-অশিক্ষিত মুসলমানদেরকে।
এইভাবে এক সময় মুসলমানরা কুসংস্কারের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়লো।
হাজী শরীয়তুল্লাহ দেখলেন মুসলমানদের এই করুণ পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থা।
তিনি দেখলেন, মুসলমানরা রোযা-নামাযসহ আল্লাহর ইবাদাত ছেড়ে দিয়ে, আপন সংস্কৃতি ভুলে গিয়ে হিন্দুদের সংস্কৃতিকে গ্রহণ করে নিয়েছে!
তারা নামেই কেবল মুসলমান আছে।
তাদের মধ্যে নেই ইসলামের কোনো ছায়া চিহ্ন।
ইসলামের কোনো কিছুই তারা পালন করে না।
দীর্ঘকাল হিন্দুদের দ্বারা প্রভাবিত হবার কারণে হিন্দুয়ানী আচার অনুষ্ঠান ও হিন্দু সংস্কৃতিতে তারা গা ভাসিয়ে দিয়েছে।
ইসলামের যে মৌলিক ও পৃথক সংস্কৃতি বলে কিছু আছে এ কথাও তারা ভুলে গেছে।
কি সর্বনেশে ব্যাপার!
তাদের এই অধঃপতন দেখে খুবই মর্মাহত হলেন হাজী শরীতুল্লাহ।
তিনি পথভোলা মানুষের কাছে নতুন করে ইসলামের দাওয়াত দেবার প্রয়োজনবোধ করলেন। এই বোধ থেকেই তিনি শুরু করলেন ইসলামের দাওয়াতী তৎপরতা।
বেগবান করলেন তাঁর সংস্কার আন্দোলন।
মানুষকে আহ্বান জানান তিনি সত্যের দিকে।
আল্লাহর দিকে।
সাধারণ মুসলমানকে তিনি বুঝান ইসলামের আকীদা-বিশ্বাস।
বুঝান ইসলামের সুমহান আদর্শ ঐতিহ্য।
বুঝান সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য।
কিন্তু কি আফসোস!
গ্রামের মুসলমানরা এতোটাই অন্ধকারে ডুবেছিলো যে, হাজী শরীয়তুল্লাহর শত আহ্বানেও তারা প্রথমত এতোটুকু সাড়া দেয়নি।
তারা চিনতে ভুল কললো সত্য-সঠিক পথ।
বুঝতে ভুল করলো হাজী শরীয়তুল্লাহকে।
অন্ধ মানুষের মধ্যে দীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে প্রথম দিকেই ব্যর্থ হলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ।
তাদের গুমরাহীতে ভীষণ কষ্ট পেলেন তিনি।
ভেবেছিলেন, অন্ধকারাচ্ছন্ন-পথভোলা গ্রামের আপন মানুষকে তিনি পথের দিশা দেখাবেন।
তাদেরকে আবার ইসলামের আলোয় আলোকিত করবেন।
কিন্তু পারলেন না তিনি। পারলেন না হাজী শরীয়তুল্লাহ।
কারণ তাঁর কথা কেউ শুনলো না!

***** আগামী পর্ব - আবারো মক্কার পথে
***** গত পর্ব - মক্কার পথে
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৩:৫১
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×