somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের সংগ্রামের উজ্জ্বল পুরুষ- হাজী শরীয়তউল্লাহ (৮ম পর্ব)

১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৪:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বারবার লড়ে যায় বীর
বারো শো তিন সাল থেকে সাড়ে পাঁচশো বছর পর্যন্ত মুসলমানরা বাংলার শাসন পরিচালনা করেছিলেন।
অবশেষে এলো সতেরো সাতান্ন সাল।
পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলাহ।
এই যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে ইংরেজরা কেড়ে নিলো মুসলমানের হাত থেকে বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা।
কেড়ে নিলো তারা জনগণের সকল স্বাধীনতা।
ইংরেজ শাসনের সময় হিন্দুরা ছিলো তাদের অনুগত দাসানুদাস।
আর মুসলমানরা ছিলো বিদ্রোহী।
পলাশীর যুদ্ধে পরাজয় বরণ করে মুসলমানরা কেবল রাজ্যই হারালো না, তারা হারালো সর্বস্ব।
একদিন যে মুসলমানের হাঁক-ডাকে সরব হয়ে উঠতো চারদিক, মুহূর্তেই থেমে গেলো তাদের সেই তুমুল গর্জন!
একদিন যে মুসলমানের জন্যে দরিদ্র কিংবা নিঃস্ব হওয়া ছিলো প্রায় অসম্ভব, ইংরেজরা ক্ষমতা দখলের পরপরই সেই মুসলমানরা পরিণত হলো কাঠুরিয়া এবং ভিস্তিওয়ালায়।
লাঞ্ছিত এবং বঞ্চিত হতে থাকলো তারা নির্মমভাবে।
মীর জাফরের মতো গুটিকয়েক অপরিণামদর্শী উচ্চাভিলাষী নামধারী মুসলমান ইংরেজ ও হিন্দুদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে বেপথু হয়ে সিরাজদ্দৌলাহকে পলাশীতে বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দিলো।
সেখান থেকেই মুসলমানের ভাগ্যে অংকিত হয়ে গেলো অপমান আর লাঞ্ছনার কালো চিহ্ন।
তবুও সংগ্রাম থেমে থাকেনি একটি মুহূর্তের জন্যেও।
কেনই বা থামবে?
মুসলমানদের রক্তে যে মিশে আছে ঈমান আর অসীম সাহসের বারুদ!
প্রয়োজনে তারা জ্বলে ওঠে বারবার।
গর্জে ওঠে সিংহের মতো।
যেমন গর্জে উঠেছিলো সেদিন অনেকেই।
ইংরেজদের দুঃশাসন আর হিন্দুদের অত্যাচার থেকে এই দেশকে মুক্ত করার জন্যে, এই জাতিকে রক্ষা করার জন্যে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো সময়ের সাহসী পুরুষেরা।
আবারো জেগে উঠলো তাদের সাথে মুসলমান।
তাদের সংগ্রামকে প্রতিহত করার জন্যে হিন্দুদের সহযোগিতায় ইংরেজরাও তৎপর হয়ে উঠলো।
মুসলমানদের ওপর তারা চালাতে শুরু করলো অকথ্য জুলুম আর নির্যাতনের স্টিম রোলার।
তবুও থেমে থাকলো না সংগ্রামের দাবানল!
সতেরো শো চৌষট্টি সাল।
বিদ্রোহী নবাব মীর কাসিম বাংলার স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের জন্যে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
কিন্তু বক্সারের যুদ্ধে তিনি পরাজিত হলেন চরমভাবে। ব্যর্থ হলো প্রাণ-প্রিয় বাংলাকে রক্ষা করার তাঁর সর্বশেষ প্রচেষ্টাও।
বক্সারের যুদ্ধের পূর্বেই জেগে উঠেছিলো এদেশের আর এক বিদ্রোহী গোষ্ঠী।
‘ফকির বিদ্রোহ’ নামে খ্যাত এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীতে ছিলেন সেই যুগের বহু পীর, ফকির ও অসংখ্য আলেম।
এই বিদ্রোহের নাম ছিল -‘ফকির বিদোহ।’
ফকির বিদ্রোহের নেতা ছিলেন দুঃসাহসী এক লড়াকু সৈনিক মজনু শাহ।
সতেরো শো তেষট্টি সাল।
ফকির বিদ্রোহীরা আকস্মিকভাবে আক্রমণ করলেন বাকেরগঞ্জ ইংরেজ কোম্পানীর কুঠি।
তাঁরা মীর কাসিমের বাহিনীতেও যোগ দিয়েছিলেন।
তাঁরা সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে।
ফকির বিদ্রোহীদের নেতা মজনু শাহের মৃত্যুর পর মুসা শাহ, চেরাগ আলী, সোবহান শাহ, মাদার বকশ, করিম শাহ প্রমুখ ফকির নেতা এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন।
তাঁদের সংগ্রাম ছিলো মূলত ইংরেজদের বিরুদ্ধে।
এই বিদ্রোহের ফলে ইংরেজ কোম্পানীর সৈন্যদের সাথে তাঁদের অনেক
যুদ্ধ হয়েছে। অনেক সংঘর্ষ হয়েছে।
কিন্তু তারা এতোটুকুও পিছু হটেননি। বরং বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলের একটি বিশাল এলাকা জুড়ে তাঁরা ইংরেজদেরকে কাঁপিয়ে তুলেছিলেন।
তাঁদের সেই সংগ্রামের কথা আজো ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
আঠারো শো ছাব্বিশ সাল।
ফকির বিদ্রোহ যখন একটু ঝিমিয়ে পড়েছে তখনই গর্জে উঠলেন আর এক সাহসী সৈনিক -সৈয়দ আহমদ শহীদ!
তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে, অত্যাচারী শিখ রাজার বিরুদ্ধে এক মহা বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন।
তাঁর আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিলো মুসলমানদের আল কুরআন ও আল হাদীসের শিক্ষায় পূর্ণভাবে ফিরে আনা এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সময়ের মতো ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
মুসলমানদের স্বাধীনতা এবং ইসলামের আদর্শ ও ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠায়ও এই আন্দোলনের বিশেষ ভূমিকা ছিলো।
এই সকল লক্ষ্যকে সামনে রেখে সৈয়দ আহমদ শহীদ তাঁর আন্দোলনকে বেগবান করে তুলেছিলেন বাঁধভাঙ্গা স্রোতের মতো।
আফগান সীমান্তের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে ঘাঁটি গেড়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে মুসলমানরা শুরু করলো মুক্তির সংগ্রাম।
আঠারো শো ছাব্বিশ সালে ইংরেজ-মিত্র শিখদের সাথে তাদের প্রথম যুদ্ধ হলো।
ভয়ংকর এক যুদ্ধ!
সৈয়দ আহমদ শহীদ এই প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরুর প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন প্রায় এক দশক আগে।
বাংলাদেশসহ গোটা ভারত সফর করে তিনি সকল মুসলমানকে জাগিয়ে তুলেছিলেন।
আঠারো শো একত্রিশ সাল।
এই বিদ্রোহের নায়ক সৈয়দ আহমদ বেরেলভী বালাকোটে শাহাদত বরণ করলেন।
বিশ্বাসঘাতকদের শিকার হয়ে তিনি এবং তাঁর শীর্ষস্থানীয় সাথীরা শাহাদাত বরণ করেছিলেন।
বালাকোটে যারা শাহাদাত বরণ করেন তাঁদের মধ্যে নয় জন বাংলাদেশীর নাম পাওয়া যায়।
আহতদের মধ্যে ছিলেন আরও চল্লিশ জন।
নারকেল বাড়িয়ার রণাঙ্গনে পরাজয় ও শাহাদাত বরণ করেন বাংলার আর এক সিংহপুরুষ, দুঃসাহসী -সেনাপতি সাইয়েদ নিসার আলী তিতুমীর!
সেটিও ছিলো আঠারো শো একত্রিশ সাল।
মহা বিস্ময়েরই ব্যাপার বটে!
এই সংগঠন আঠারো শো ছাব্বিশ সাল থেকে আঠারো শো আটষট্টি সাল -এই দীর্ঘকাল যাবৎ ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে চলেছিলো।
এই সকল আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় যুক্ত হলেন আর একজন সংগ্রামী পুরুষ।
আর একজন সাহসী বীর।
তাঁর নাম -হাজী শরীয়তুল্লাহ!

***** আগামী পর্ব - গর্জে উঠলেন সাহসী সৈনিক
***** গত পর্ব - আবারো মক্কার পথে (৭ম পর্ব)
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ বিকাল ৪:১৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×