somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মহাশ্মশান

২৪ শে আগস্ট, ২০১৬ দুপুর ২:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার একটা কথা ছিল! সুপ্তি'র কথা কানে যাবার ফুরসত হয় না, আজাদের। সে এখন ব্যস্ত রানিং শু'র ফিতে লাগাতে। কোথাও হয়ত ঘুরতে যাবে বন্ধুদের সাথে। কোথায় যাবে সুপ্তি আগে জানতে চাইত। এখনও জানতে চায়, কিন্তু জিজ্ঞেস করে না। একবার ভেবেছিল মেনে নেবে না, কিন্তু একলা হয়ে "সামাজিক" শিকারের পরিণত হবার কথা ভেবে নিরুৎসাহিত হয়। তবে আজাদ মানুষ হিসেবে বেশ। কূটকচালে নেই, চাইলে কোন কিছু 'না' করে না, আর অন্ততপক্ষে কোন কিছুতে বাঁধা দেয় না। বাঁধা আর কিসেই বা দেবে। সুপ্তি খুব বেশি হলে, বাপের বাড়িতে গিয়ে দু'চারদিন থাকে। নয়ত কখনও কখনও ওর কলেজ পড়ুয়া বান্ধবীর সাথে একটু কোথাও বসে ফুচকা খায়। আজাদকে নিয়ে ফুচকা খাওয়ার শখ তার ছিল বৈকি, কিন্তু ভবিতব্য, ওই জিনিস আজাদ মুখেও নেয় না। সুতরাং সুপ্তির স্বাধীনতার সুযোগ করে দিয়ে আজাদ তার মতো করে এক স্বপ্নের জগতে বাস করে। চোখের জল নাকের জলের দিন শেষ, এখন শুধু দুর্বিষহ শূন্যতা নিয়ে দিনাতিপাত করে সুপ্তি।

আজাদ বরাবরই একরোখা গোছের, কিন্তু এমন নয় যে সে যুক্তি বোঝে না। সে খুব ভালোই যুক্তি জানে, আর সে খাতিরে সে গোয়ারের মতো যুক্তি নিয়েই লড়তে থাকে। কিন্তু নিজেই সে অযৌক্তিক কাজ করে হরহামেশা। যেমন সে আজ করতে চলেছে। ছোটবেলা থেকেই আজাদ নিজের মতো করে বড় হয়েছে। সেসময় থেকেই আশেপাশে তাকানোর স্বভাব তার যুক্তি জ্ঞান কে শাণিত করেছে। 'মন্দের ভালো' - এ শব্দদ্বয়কে সঙ্গী করে আজাদ খুব নিরিবিলি ভাবেই তারিয়ে তারিয়ে এ জীবন উপভোগ করেছে। হয়ত সুপ্তির সাথে সামাজিক দায়বদ্ধতায় আবদ্ধ না হলে, সে এখনও একই রকম তারিয়ে তারিয়ে জীবন উপভোগ করত। এদিকে সুপ্তিও চাইলে হয়ত একটা স্বাধীন জীবন করে নিত। কিন্তু বিধিবাম, সুপ্তি'র সংসারী হবার ইচ্ছে আর আজাদের নরম তোষকে, তিন বেলা পেট ভরে খেয়ে কোলাহলময় সন্যাসী হবার ব্রত, অমোঘ নিয়তির ঝাপটায় এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে। বিয়ের চার বছর পরেও সেই টুকরোগুলো খুঁজে পাওয়া যায় নি! আজাদ আর বৃথাশ্রম করে নি, না খুঁজে পাওয়া অংশের প্রতিবিম্ব মস্তিষ্কের কোন নিওরনে বন্ধী করে দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছে।

সকাল বেলা সুপ্তি যখন চান সেরে চুল শুকোচ্ছে, সাতটা বাজে মনে হয়। আজাদের জলতেষ্টায় ঘুম ভেঙ্গে গেল। আধ চোখ বুঁজে, আজাদ সুপ্তিকে পানি দিতে বলে উঠে বসে। জানালা দিয়ে সকালের কাঁচা রোদ শ্যামলাবরণ সুপ্তির গায়ে আলোছায়া দিয়ে যায় যেন আর আজাদ মুগ্ধ বিস্ময়ে ভাবে, এ জীবনে যুক্তিরও অধিক কিছু থাকে তা নইলে পাহাড়, নদী, ঝর্ণাধারা, সাগর কিংবা হাওড় বাওড়ের দেশে আর কিইবা ভালো লাগার ছিল। ছিপ নিয়ে একদিন নদীতে কাটানো আনন্দ হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে না অন্য কোন নাগরিক কোলাহলে, নিঝুম দ্বীপে দেখা হবে না হয়ত কোন ডাগর হরিনী'র। শ্বাসমূলে বসে আর হয়ত শ্বাস নেয়া হবে না কোন বক পাখির, কামটের কামড়ে পায়ের আঙ্গুল হারানো দুলাল মাঝি নৌকা বাইতে বাইতে আর বলবে না সেই সাহসী যুদ্ধের কথা। এসবই হবে স্মৃতি। শব্দে শব্দে গেঁথে এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে আমাদের সম্পর্ক। ঢকঢক করে গিলে গেলাসটা সুপ্তির হাতে ফেরত দেয়, আজাদ। আরামে চোখ বোঁজে। সুপ্তি শেষবারের মতোন নিজেকে আয়নায় দেখে নেয়। সারাদিনে কি আর সময় হবে এ সময়টুকুর। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুপ্তি কিচেনে ঢোকে।

পৌনে আটটায় নচ্ছার মোবাইল বেজে উঠলে আজাদের মধুনিদ্রার সমাপ্তি ঘটে। তড়াক করে লাফানোর কথা থাকলেও দু'হাত কপালে নিয়ে হাতের চেটো উলটো করে আরো মিনিট দুয়েক শুয়ে থাকে। তারপর খুব দ্রুত উঠে পড়ে সে। মশারি খুলে, কাঁথা সহ ভাজ করে রাখে আলমারিতে। মিনিট পাঁচেকের মাঝে গোসল সেরে নিয়ে জামা কাপড় পরে আজাদ। খাকি কালারের প্যান্ট আজাদের বেশ প্রিয়, আর একটা পাতলা সুতির শার্ট গায়ে চাপিয়ে জুতোতে পা গলায় সে। সুপ্তি একবার উঁকি দিয়ে দেখে যায় আজাদকে। রাতের থেকে যাওয়া মাংসের ঝোল, হাতে সেঁকা রুটি আর অমলেট করে সুপ্তি আজাদকে দিয়ে, যায় চা বানাতে। সুপ্তি'র চা বানানোর বিশেষ সুনাম আছে আগে থেকেই। আজাদও চা খেতে ভালোবাসে। আজাদ গোগ্রাসে গিলে, তাকে যেতে হবে অনেক দূরে। আজ আরেকটা যুক্তির লড়াইয়ে হারতে যাবে জেনেও, আজাদ পিছুপা হয় না। মানুষের চিরাচরিত প্রশ্ন করার অভিপ্রায় আর উত্তর খোঁজার মানসিকতা, তাদের যুগে যুগে প্রতিবাদী করেছে। আর যৌক্তিক কারনেই আজাদ আজ নৈরাজ্যবাদী হতে চলেছে। কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে চায় সে, ভুলে ভরা ঘুণে ধরা সমাজকে ঝাঁকিয়ে দিতে চায় আজাদ আর আজাদের মতো, কাছাকাছি অথবা দূরতম মানসিকতার আরো কিছু মানুষেরা। আজ আর বাছাই করার সময় নেই, আজ অপেক্ষার প্রহর গত। যে করেই হোক, বাঁচাতে হবে এ ধরণীকে। চা নিয়ে এসে সুপ্তি খাটের কিনারায় বসে। আজাদ ফিরতে দেরি হবে বলে চুমুক দেয় চায়ের কাপে। জুতোর ফিতে বেঁধে নেয় আজাদ চা খাবার ফাঁকে। সুপ্তি কিছুক্ষণ চা খাওয়া দেখে আনমনে। আজাদের দিকে তাকিয়ে সুপ্তি গাঢ় কন্ঠে বলে, "আমার একটা কথা ছিল"।

আজাদ চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। কখনও যা করে না আজ তাই করে আজাদ। সুপ্তির কপালে চুমো খায়, আজাদ। অনভ্যস্ততা বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না আজ কারুর মাঝে। খুব স্পষ্ট করে আজাদ বলে "যদি সুন্দরবন বাঁচে, তবে, তোমায় নিয়ে সে এক মায়াবী ডাগর হরিন দেখিয়ে আনব। আর রোদ পোহানো ছোট একটা বাচ্চা কুমিরের গায়ে বসা বকের সাথেও পরিচয় করিয়ে দেব। দেখো সত্যি বলছি, তোমার অনেক ভালো লাগবে"।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে আগস্ট, ২০১৬ সকাল ১০:১৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ঢাবিতে "মব সায়েন্স" পড়তে হলে কী কী যোগ্যতা লাগে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:১৮



- রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তৌহিদী জনতার ব্যবহার করা জানতে হবে।

- রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও মবকে থামাতে না পারলে সেটাকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা না বলে "জনতার শক্তি" বলতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোকুলে বাড়িছে সে

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৪

গোকুলে বাড়িছে সে

পরিস্থিতি যতই ঘোলাটে হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে- ক্ষমতার অন্দরমহলে অস্বস্তি বাড়ছে। একের পর এক বক্তব্য, ভিডিওবার্তা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দেখে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে- এত অস্থিরতার কারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আর্কাইভ থেকে: ফেলে আসা এক সড়কের কথা

লিখেছেন অর্ক, ২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:১৫



ফেলে আসা এক সড়কের কথা মনে পড়ে। হলুদ নিয়ন বাতির ম্লানাভ সন্ধ্যেবেলা। পলেস্তারা খসা বয়োজীর্ণ দেয়াল। দুয়েকটি রিক্সা। সিটের ’পর পা তুলে আঁটোসাটো ঝিমানো চালক। খেলা শেষে ঘরে ফেরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোথাও একটা ভুল হচ্ছে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৪২

একটা ছোট নৌকা পাল তুলে পাড়ি দিচ্ছে-
অনন্ত নক্ষত্রবীথি।
পেরিয়ে যাচ্ছে- গ্রহ নক্ষত্র, মহাজাগতিক উল্কা।
দূরে কোথাও সংঘর্ষ হচ্ছে।
ধীর, অতি ধীর তার গতি। নৌকায় কয়েকজন মানুষ!
একটি শিশু,... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিদারাবাদ থেকে মাছুয়াপাড়া

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৫৫

আপনার সবচেয়ে অপছন্দের খাবার হচ্ছে শুকর। শুধু অপছন্দের না, এটা আপনি ঘৃণাও করেন। কিন্তু আপনার পাশে বসে সবাই শুকর খায়। যে পাতিলে শুকর রান্না করা হয়, সেই পাতিলেই আপনার জন্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×