বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। এর প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার তটরেখা ও ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত উর্বরা সমুদ্র এলাকা রয়েছে, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় ৩২ শতাংশ। এই কোস্টাল এলাকায় বসবাস করে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন জনগন, যা দেশের সমগ্র জনগণের প্রায় ২৮ শতাংশ (পপুলেশন সেনসাস-২০০১)। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে শরীয়তপুর জেলা অত্যান্ত দূর্যোগপূর্ণ জেলা। জেলাটি সমুদ্র উপকুলবর্তী জেলা হিসেবে ওয়ান্ড ফুড প্রোগ্রাম এর মানচিত্র (WFP) অন্তুভূক্ত। এছাড়াও WFP ও কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের মতে শরীয়তপুর জেলা Food insecured জেলা হিসাবে পরিচিত।
নদী বিধৌত শরীয়তপুর জেলার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে পদ্মা ও মেঘনা নদী। পদ্মা নদীর মোহনায় গড়ে উঠা দুলার চর, চরআত্রা, কাচিকাটা, তারাবুনিয়া, কোদালপুর, গরীবের চরসহ অসংখ্য চর। শরীয়তপুর জেলার মোট আয়তন ১১৮২ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে চরের আয়তন প্রায় ৬০ শতাংশ। এই চর ও চরের মানুষগুলো মুল ভুখন্ড থেকে প্রায় আলাদা ও বিচ্ছিন্ন।
ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ। এর বসবাস বিশাল সমুদ্রে। একক প্রজাতি হিসাবে সর্ববৃহৎ এবং সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মৎস উৎপাদনে ইলিশ মাছের অবদান প্রায় ১৩-১৪ শতাংশ। জিডিপিতে ইলিশ মাছের অবদান প্রায় ১ শতাংশ। ইলিশ সামুদ্রিক মাছ হলেও ডিম পারার সময় হলে এরা ঝাঁকে ঝাঁকে নদী কিংবা নদীর মোহনায় প্রবেশ করে। বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা সহ বিভিন্ন নদ-নদী ও উপকুলীয় এলাকায় জাটকা বিচরণ করে এবং সেখান থেকে খাদ্য গ্রহণ করে বড় হয়। নদী গবেষণা কর্তৃক পরিচালিত জরীপে দেখা গিয়েছে বাংলাদেশে জাটকা ইলিশের দুটি বড় বিচরণক্ষেত্র রয়েছে। প্রথমটি শরীয়তপুর-চাঁদপুর হয়ে নীল কমল হয়ে হাজীমারা পর্যন্ত বিস্তৃত এবং দ্বিতীয়টি খুলনা জেলার দূবলার থেকে পটুয়াখালী জেলার কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়াও পদ্মা ও মেঘনা নদীর উজানে প্রচুর জাটকা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য আইন ১৯৯০ অনুসারে যে সকল ইলিশ মাছের আকার ২৩ সে.মি. বা তার চেয়ে কম তাকে বলা হয় জাটকা। ১৯৯২-১৯৯৪ সালের জরীপে দেখা গিয়েছে যে পদ্মা ও মেঘনার অববাহিকা এবং উপকূলীয় এলাকা থেকে জগৎবেড় জাল, কারেন্টজাল ও অন্যান্য জালের সাহায্যে গড়ে ৩৭০৭মেঃ টন জাটকা ধরা হয়। সংখ্যায় হিসাব করলে এর পরিমাণ দাড়ায় ৪৬৩ মিলিয়ন। ধৃত জাটকার গড় দৈর্ঘ্য ৭.৩ সে.মি এবং গড় ওজন ৮.০ প্রায়।
শরীয়তপুর জেলার ৬টি উপজেলার প্রায় ২২টি চরে বাস করে জেলার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২২ শতাংশ জনগণ। এদের অধিকাংশের পেশা মাছ ধরা ও কৃষি কাজ। যুগ যুগ ধরে এই পরিবারগুলো এই পেশার সাথে জড়িত। জেলে পরিবারের মাত্র ২৫ শতাংশ সদস্য তাদের নাম সহি করতে জানে এবং ৭৫ শতাংশ সম্পূর্ণ নিরক্ষর। এ পেশার সাথে জড়িত প্রায় ২২ হাজার জেলে পরিবারের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার পরিবার সরাসরি ইলিশ বা জাটকা আহরণের সাথে জড়িত।
যে সকল পরিবার সম্পূর্ণভাবে মৎস্য পেশার সাথে জড়িত, কোন কারণে তাদের মাছ ধরা বন্ধ হলে এদের জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। তখন তারা মানবেতর জীবন যাপন করে। এই জেলেরা আর্থিক সমস্যা এবং কারিগরি জ্ঞানের অভাবে অন্য কোন পেশার সাথে জড়িত হতে পারেনা। এ সময় তারা বাধ্য হয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য মহাজনদের নিকট থেকে চড়া সূদে ঋণ গ্রহণ করে। কেউ কেউ আবার মহাজনদের নিকট অগ্রীম শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এর ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে আগস্ট, ২০০৮ সকাল ১১:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


