somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দুঃখবোধন

১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কান্না-হাসির ব্যাপারটা আমার কাছে তখন নিতান্তই স্থুল। শরীরে ব্যথা পেয়ে বা গুরুজনের শাসনে মানুষ কাঁদে, এছাড়া অন্যকোন কারণে কেউ কাঁদে বলে আমার জানা ছিলো না। এই অবধি জ্ঞান নিয়ে মায়ের কনিষ্ঠাঙ্গুল ধরে চা-বাগানের এ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজারের বাংলোতে যেদিন প্রথম এলাম, সেদিন একগাল হেসে আমাদের স্বাগত জানিয়ে, আমাকে প্রায় টেনে নিয়ে বাসায় উঠালো যে মানুষটি তার নাম বারিন।

আমাদের আগে যারা এবাসায় থেকেছেন তাদের মধ্যে কেউ বারিনকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। সেই থেকে এ বাসাই তার স্থায়ী ঠিকানা। বয়স অনুমান করা যায়না- চল্লিশ কিংবা সত্তর হতে পারে। মাথার চুলগুলো নিকষ কালো, তার গায়ের রংয়ের মতোই। খাঁকি হাফপ্যান্ট আর সাদা ছেঁড়া গেঞ্জি তার নিত্য পোশাক। বয়সের কারণে হাসলে মুখের চামড়ায় কয়েকটি ভাঁজ পড়তো। এজন্য ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে হাসতো যখন, তখন বয়স কিছুটা ঠাহর করা যেতো।

চাই বা না চাই, আমরা বাসায় আসার দিন থেকেই সে আমাদের দেখভালের দায়িত্ব নিয়ে নেয়। বাসার সকলের ফরমায়েশ করা তার প্রধান কাজ। সকলের মনের কথা যেন পড়তে পারতো, না চাইতেই প্রয়োজন পূরণ করতো। আমার নাম জানতো কিনা জানিনা, ভাগ্নি বলে ডাকতো। চারশব্দের বাক্যে আটবার ভাগ্নি বলতো।

আসার দিন থেকেই বারিনের “ভাগ্নির জন্য কিছু করার চেষ্টা” অত্যাচারে রূপ নিলো। মাঠ-ঘাট ঝোপঝাঁড় খুঁজে নিয়ে আসতো কচুর লতি, হেলেঞ্চা শাক, ঢেঁকিশাক, কলমি শাক। মা ধমক দিতেন – কি রে বারিন, তুই আবার ঝোপ-জঙ্গল তুলে বাসায় এনেছিস? হেসে বলতো – রাগ হইওনা দিদি ঠাকরাইন।ভাগ্নি খাইবো, বাইটামিন আচে। একদিন ভোরে কুক্কুরু কু শব্দে ঘুম থেকে উঠে দেখি ১০/১২টি মুরগী ছোট উঠানে বেঁধে রেখেছে। মাকে দেখে অপ্রস্তুত হেসে বললো – রাগ হইওনা দিদি ঠাকরাইন। তুমি টেকা দিবায় কইয়া হরিয়ার মুরগী কিনিয়া আনলম। ভাগ্নি ডিম খাইবো।

ভাগ্নিদের জন্য তার নানা ফন্দি ফিকির আর বহুবিধ আয়োজনে আমরা বিশেষ করে মা অতিষ্ঠ হয়ে বাবাকে নালিশ করলেন। বাবা হেসে বলেন – বাদ দাও।ওর মধ্যে সুপ্ত পিতৃতৃষ্ণা আমার মেয়েতে জেগে উঠেছে।

বারিনের সুপ্ত পিতৃস্নেহের পুরোটা আমাদের মাঝে ঢেলে দিয়ে কয়েক বছর পার করলো সে।

একদিন ভোরে ফুলের বাগানে কাজ করার সময় কাশতে কাশতে বেহুঁশ হয়ে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর জানা গেল যক্ষা। বাবা সিলেট যক্ষা হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেন। দুইমাস চিকিৎসার পর মারা গেলো বারিন। চা বাগানের তত্বাবধানে আনা হলো তার লাশ। কিন্তু তার জাতের লোকের মধ্যে এক পঞ্চায়েত টাইপ শ্রমিক বাগড়া দিয়ে বললো তারা বারিনের লাশ নেবেনা কারণ সে মুসলমানের ঘরে গরু খেয়েছে। বাবার অনেক দৌড়ঝাপের পর তারা আপোষ করে লাশ গ্রহন করলো।

চিতায় উঠলো বারিনের লাশ। দাউ দাউ চিতার আগুন জ্বললো। এদিকে অন্ধকার ঘরে একা আমি হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করি। ব্যথাটা যেন কলজে মুচড়ে দিলো।বিশাল এক ঢেউ যেন গড়িয়ে-পাকিয়ে বুক থেকে গলায় উঠে চোখ দিয়ে বেরিয়ে এলো। ছটফট করতে করতে অনুভব করলাম আমি কাঁদছি। প্রথমবার আমি বুঝলাম মানুষ কাঁদে ব্যথায় – সে ব্যথা হৃদয়েও হয়।

সর্বশেষ এডিট : ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সকাল ১০:৪৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মৃত্যুর আগে কি মানুষ টের পায়, সে মারা যাচ্ছে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



মৃত্যুর কয়েক মুহুর্ত আগে, টের পাওয়া যায়- মরে যাচ্ছি।
সময় শেষ। তবে সবাই বুঝতে পারে না। কেউ কেউ বুঝতে পারে। আমার বাবা একদিন মাকে বলল, আমার দোষ ত্রুটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোল্ডেন সেপিয়া দিগন্ত এবং ভ্যাঞ্জেলিসের অমর সুর: এক কালজয়ী সমুদ্রযাত্রার মহাকাব্য

লিখেছেন চারাগাছ, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:০০




গোল্ডেন সেপিয়া দিগন্ত এবং ভ্যাঞ্জেলিসের অমর সুর: এক কালজয়ী সমুদ্রযাত্রার মহাকাব্য


সময়টা যেন হুট করেই থমকে যায়, যখন ইথারে ভেসে আসে সেই অতিপ্রাকৃত সুরের মূর্ছনা। চোখ বন্ধ করলেই মনের ক্যানভাসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার এআইনোক্কিও

লিখেছেন শায়মা, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৪


এক জীবনে কত কিছু দেখা হয় কত কিছু জানা হয় মানুষের! আসলেই কত অজানারে! লেখক শংকরের এই নামে একটি বই আছে। কবিগুরুর আছে কবিতা কত অজানারে জানাইলে তুমি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ সাইটের জন্য ডোমেইন নাম সাজেস্ট করুন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:৫৫


বাংলায় ব্লগিং করার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরী করতে চাচ্ছি। আপাতত মূল উদ্দেশ্য হলো সামুতে লিখা আমার সবগুলো পোস্ট ধীরে ধীরে সাইটটিতে আর্কাইভ করে রাখা। সামুতে অনেকে নিবেদিত প্রাণ ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড্যাম কেয়ার সেই মেয়েটি AI দিয়ে সাজে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:২২



ড্যাম কেয়ার সেই মেয়েটি AI দিয়ে সাজে
==================================
পিঠ ছুঁয়ে নামা মেঘবরণ তার লম্বা কালো চুল,
তারই মাঝে লুকিয়ে হাসে একটি সাদা ফুল।
চোখ দুটো তার ডাগর ডাগর, অবাক করা আলো,
দুষ্টুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×