‘অনেক পাপ করলে ঢাকায় আসতে হয়। এইখানে এতো কষ্ট যে অনেকটা পাপ এইখানে ধুয়ে যায়।’ ঢাকায় এসে জ্যামে আটকা পড়ে এভাবেই মনের খেদ ঝাড়লেন এক বাসযাত্রী। ক্ষোভের কারণও আছে যথেষ্ট। উত্তরাঞ্চলের একটি জেলা থেকে ঢাকার প্রাšেত্ম পৌঁছেছেন মাত্র ৪ ঘণ্টায়। কিন্তু উত্তরা থেকে মতিঝিল এসেছেন ৩ ঘণ্টায়।
সেই হিসেবে ঢাকায় বসবাসকারী মানুষের পাপ বলতে আর বেশি কিছু থাকার কথা নয়। তবুও প্রতিদিনই এই ভোগাšিত্মতে নিজের পাপ মোচন করছেন রাজধানীর বাসিন্দারা। আরেকজন বললেন, ‘দেশের বাইরের লোক এসে জ্যাম সৃষ্টি করে না। আমরাই আমাদের জ্যাম সৃষ্টি করি।’ এই কথাটাও সত্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আজিজ সুপারমার্কেট, বারডেম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আর শিশুপার্ক। এই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু শাহবাগ।
ঢাকার সবচেয়ে বড় চারটি ব্যবসা কেন্দ্র সদরঘাট ও শ্যামবাজার (কাঁচাবাজারের আড়ৎ), ইসলামপুর (কাপড়), বাংলাবাজার (বই ও প্রকাশনা শিল্প), নবাবপুর ও ধোলাইখাল (মোটরপার্টস)। এছাড়া এই এলাকায় রয়েছে ১০টি স্কুল, তিনটি কলেজ ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। এই সবগুলো এলাকায় যাওয়ার একটাই রা¯ত্মা নয়াবাজার ও গুলি¯ত্মান।
এছাড়া মিডিয়াপাড়া কাওরানবাজার, মালিবাগ-মগবাজারের জ্যাম এখন মানুষের কাছে আতঙ্কের ব্যাপার। এই সিগন্যালগুলোতে আসলে কেউ বলতে পারে না কখন সিগন্যাল ছাড়বে আর কখন পৌঁছাতে পারবেন গšত্মব্যে। যদিও এখন এই সিগন্যালগুলোতে বসানো হয়েছে ডিজিটাল টাইমলাইন। সেখানে দেখানো হচ্ছে ঠিক কতক্ষন পর সিগন্যাল ছাড়া হবে।
তবে যতটা না সিগন্যাল তারচেয়েও বেশি জ্যাম সৃষ্টি করে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং আর যাত্রী উঠানো-নামানো গাড়িগুলো।
অনেকেই গাড়ি চালানোর ফাকে পড়ে নেন আ¯ত্ম একটি পত্রিকা। বাসে অনেক শিক্ষার্থীকে দেখা যায় ক্লাসের পড়া গুলোয় চোখ বুলিয়ে নিতে। অনেক বইপোকা বাসে ওঠেন কোন উপন্যাস নিয়ে। গšত্মব্যে পৌঁছাতে কতক্ষণ লাগবে জানেন না, এই ফাঁকে যতটুকু পড়ে নেয়া যায়। চলমান হকাররাও অনেকটা নিশ্চিšেত্ম বেচাকেনা করেন বাসযাত্রীদের সাথে। কারণ একটাই, জ্যাম।
সিগন্যাল ছেড়ে পরের রা¯ত্মায় গিয়েও রেহাই নেই। গাড়ি দাড়িয়ে থাকে এক জায়গাতেই। সবচেয়ে করুণ অবস্থা হয় অ্যাম্বুলেন্সে থাকা রোগীদের। রোগীর স্বজনরা অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকেন কখন জ্যাম ছুটবে এই আশায়। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন মানুষের মনে আর দাগ কাটে না। মনে করিয়ে দেয় না অ্যাম্বুলেন্সে থাকা রোগীদের অসহায়ত্বের কথা। বরং সাইরেনের শব্দে বিরক্ত হয় আশেবাশের লোকজন।
নো পাকিং!
নো পাকিং লেখা স্থানে সবচেয়ে বেশি গাড়ি পার্ক করে রাখা হয়। নো পাকিং লেখা হয় এমন জায়গায় যেখানে অšত্মত এতটুকু জায়গা আছে যেখানে গাড়ী রাখা সম্ভব। তাই ট্রাফিক পুলিশ কর্তৃপক্ষ অত্যšত্ম সচেতনতার সাথে লিখে রাখে ‘নো পার্কিং’। আর এতেই চালকদের সুবিধা। অšত্মত দূর থেকে বোঝায় যায় এখানে গাড়ি পার্ক করা সম্ভব।
সিটিং বাস !
রাজধানীতে ‘সিটিং বাস’ বেশ জনপ্রিয় একটি উচ্চারণ। যাত্রীকে আকৃষ্ট করার জন্য সিটিং সিটিং বলে হাকতে থাকে কন্ডাকটররা। কিন্তু চালক-যাত্রী সবাই জানে এখানে কোন বাসই সিটিং না এমনকি স্ট্যন্ডিংও না। গাদাগাদি করে বাসে দাড়িয়ে যেতে হয়। তাতেও শাšিত্ম নেই। কন্টাকটার ধাক্কিয়ে বাসের পেছনদিকে পাঠিয়ে দেয়। গšত্মব্যস্থলে পৌঁছালেও বাসের পেছন থেকে দরজার কাছে আসা অনেকটা দুরহ ব্যাপার। তাই অনেক যাত্রীই মাটি কামড়ে পড়ে থাকে বাসের সামনের দিকে। শুনতে হয় চালকের খি¯িত্ম-খেউড়। যাত্রীরা এই সার্ভিসকে হরহামেশাই ‘চিটিং সার্ভিস’ বলে সম্বোধন করেন।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে তাপমাত্রার উর্ধগতি। গরমে ঘেমে প্রাণ ওষ্ঠাগত যাত্রীদের। গšত্মব্যের আর কিছু বাকি। গাড়ি থেমে আছে। ভাবছেন হেঁটেই যাবেন, সেই উপায় নেই। কারণ ফুটপাথ এখন আর পথচারীদের হাঁটার জায়গা নয়। দোকানিদের মালপত্র হকাররদের বেচাকেনার জায়গা ছেড়ে দিয়ে যেটুকু দিয়ে পথচারীরা হাঁটার চেষ্টা করে সেটা এখন চলে গেছে বাইকওয়ালাদের দখলে। এমনকি কোন কোন ফুটপাতের সামতে দাড়ালে হকাররা সরিয়ে দিয়ে বলে ‘দোকানের সামনে ভিড় কইরেন না’।
নাগরিকদের অধিকার বঞ্চিত করে, রা¯ত্মাঘাট আর ফুটপাত দখল করে দিনের পর দিন এভাবেই জনজীবন অতিষ্ঠ করে তোলা হচ্ছে। পত্র-পত্রিকা আর টিভি চ্যানেলগুলো রিপোর্ট করতে করতে ক্লাšত্ম হয়ে গেছে। তবুও টনক নড়ছে না কোনও কর্তৃপক্ষেরই। রাজধানীবাসী এভাবেই পাপমোচন করছে, করবে। আর ঢাকার বাইরের লোক এসে বলবে ‘অনেক পাপ করলে ঢাকায় আসতে হয়’।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




