somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

50তম পোস্ট : একটি এক টাকার আত্মজীবনি

২৭ শে জুলাই, ২০০৬ দুপুর ১২:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এই পোস্টটি উৎসর্গ করলাম এস. এম. মাহবুব মোর্শেদ ভাইকে যিনি একটা পোস্ট দিয়েছিলেন "জেনে নিন নতুন ফিচার: অপেক্ষা করুন টেস্ট শেষ হবার"। সেই পোস্টের মন্তব্যে নতুন টিপস শেখানোর জন্য উনি সবার কাছ থেকে এক টাকা চেয়েছিলেন যদিও আমি এক ডলার দিতে চেয়েছিলাম। সেই এক টাকাই আজকের লেখাটার মূল অনুপ্রেরণা।

আমি একটি এক টাকার নোট। অনেক হাত ঘুরে অবশেষে আমি এখন মাহবুব মোর্শেদের ব্যক্তিগত মুদ্রা সংগ্রহশালায়। কিন্তু এ পর্যন্ত আসার আগে আমাকে অনেক চড়াই উৎরাই পেরুতে হয়েছে। অনেক সুন্দর এবং বেদনাদায়ক মুহুর্তের অংশীদার হবার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। আজ আমি আপনাদের আমার ঘটনাবহুল জীবনের সে কাহিনিগুলোই শোনাবো। আপনাদের সে সময় আর ধৈর্য্য হবে তো?

আমার জন্ম সিকিউরিটি প্রেসে। অতপর: আমি ব্যাঙ্কের হাত ঘুরে এসে পড়ি এক সরকারী কর্মচারীর হাতে। প্রথম রাত তার পকেটেই ছিলাম। পরদিন ভোরে অফিসে যাওয়ার সময় তিনি আমাকে সঁপে দেন তার ছয় বছরের তুলতুলে মেয়েটির ছোট্ট হাতে। আমার কড়কড়ে মিষ্টি গন্ধে সে কি উল্লাস তার ! কি কোমল ছিল সেই ছোট্ট হাতের পরশ। ঠিক চেহারার মতোই মিষ্টি। আমি খুকুমণির সাথে সেদিন স্কুলে গেলাম। সেকি কোলাহল বাচ্চাদের। আমার খুব ভালো লাগছিল সেই কল্লোলের মাঝে হারিয়ে যেতে। কিন্তু দুপুরে যখন খুকুমণি স্কুলের গেইটের দারোয়ানটার কাছে আমাকে জমা দিয়ে যখন আচার কিনলো তখন আমি খুব রাগ করেছিলাম। আচারওয়ালা ট্যাকের মধ্যে গুজেঁ দেয়ার আগে শেষবারের মতো অভিমান ভরে খুকুমণিকে দেখে নিয়েছিলাম। সেই মুখটা আজো আমি ভুলতে পারিনি। সেদিন বিকেলেই আমি হস্তান্তর হয়ে গেলাম। শুরু হলো আমার যাযাবর জীবন। পুরোটা বললে বিশাল ইতিহাস হয়ে যাবে। তাই শুধুসুখ আর দু:খের ঘটনাগুলোই বলবো।

আমার সুখস্মৃতিগুলোর মধ্যে প্রথম মনে পড়ে ছোট্ট খুকুমণির সাথে কিছুটা সময় কাটানোর মুহুর্তগুলি। এরপর একদিন আমি কালক্রমে গিয়ে পড়েছিলাম এক রূপসীর হাতে। তিনি আমাকে সযত্নে তার বুকের ভিতর লুকিয়ে রেখেছিলেন। কি নরম, স্নিগ্ধ ছিলো সেই স্পর্শ, আমি কখনোই ভুলতে পারবো না। আরেকবার এক রূপসী 101 টাকার বাজি জিতে আমাকে চুমু খেয়েছিলো। তার গোলাপী লিপিস্টিকের দাগ এখনো আমার বুকের মাঝে লেগে আছে। আর এখন যেখানে আছি সংগ্রহশালায় সেটাও নিরুদ্রপ জীবন। খুব ভালো আছি আমি।

কিন্তু সুখের চেয়ে দু:খের স্মৃতিগুলোই বেশি। একবার আমি এক ভিক্ষুকের থালায় পড়েছিলাম প্রায় তিন ঘন্টা দুপুরের গনগনে রোদে। উফ! সে কি কষ্ট! তিয়াসে আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল। আরেকবার ছিলাম এক কসাইয়ের টাকার বাক্সে। মাংসের উৎকট গন্ধে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। ভাগ্যিস সে যাত্রায় এক ক্রেতার হাতে সঁেপ দেওয়ায় আমি প্রাণে বেঁচেছিলাম। এক মাতাল যুবক আমাকে দুমড়ে মুচড়ে ছুড়ে দিয়েছিলো জুয়ার আসরে। সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। খুব। আর একবার এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল যার নীরব সাক্ষী ছিলাম শুধু আমি। এক পাজি লোকের হাতে গিয়ে পড়ি আমি। সে লোকটা তার দুলাভাইয়ের দোকান থেকে বিস্কুট কিনে। কিন্তু একটাকা কম দেয়। আমি তখন ছিলাম সেই পাজিটার পকেটে। অতপর কথা কাটাকাটি, একপর্যায়ে হাতাহাতি, মারামারি। দুলাভাইকে আচ্ছামত পিটিয়ে লোকটি মোড়ের দোকান থেকে আমাকে দিয়ে একটা সিগেরেট কিনে শুকটান দিতে দিতে চলে যায়। সেই দোকানে আমি ছিলাম দুইদিন। পরেরদিন দোকানের বাক্সে থেকেই আমি শুনতে পেয়েছিলাম ওই পাজি লোকটার মার খেয়ে তার দুলাভাইটা মরে গেছে। সেদিন যে কি কষ্ট লেগেছিলো। মনে হচ্ছিল এর জন্য আমিই দায়ী। সামান্য আমির জন্য একটা লোক এভাবে মরে গেলো! আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছিলো। মানুষ যে এতো নিষ্ঠুর হতে পারে আমার ধারণায় ছিলো না।

এরকম অনেক অনেক অভিজ্ঞতার নীরব দর্শক আমি আজ মাহবুব মোর্শেদের সংগ্রহশালায়। এখানে আমি ভালোই আছি। আরো অনেক বন্ধু পেয়েছি দেশ বিদেশের। সবার সাথে গল্প করে দিন কেটে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে নতুন নতুন দর্শক এসে আমাদের দিকে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে। তখন জন্মটাই সার্থক মনে হয়। ইচ্ছে হয় অনন্তকাল বেঁচে থাকি মানুষের ভালোবাসার মাঝে।

** শেষের দিকের অংশটা প্রথম আলোতে মাস দু'য়েক আগে পড়া একটি সত্যি ঘটনা। এক টাকার জন্য 60 বছর বয়স্ক এক ভদ্রলোক নিহত হন আপন শালার হাতে। তখন থেকেই শুধু একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিল, জাতি হিসেবে আমারা কি আরেকটু সহনশীল হতে পারি না ?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জুলাই, ২০০৬ সকাল ৭:১৮
২৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের বিজয় খুব দরকার ...

লিখেছেন অপলক , ১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৩৪



বিগত সরকারগুলো যে পরিমান ক্ষয়ক্ষতি করে গেছে, তা পুষিয়ে নিতে ১০টা বছর যোগ্য এবং শিক্ষিত শ্রেনীর হাতে সরকার ব্যবস্থা থাকা খুব জরুরী। গোমূর্খ চাঁদাবাজ আর নারী লিপ্সুদের ভীড়ে জামায়াতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভোট ডাকাতদের বয়কট করুন

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:৫৩


আহা, বাংলাদেশের রাজনীতি যেন একটা অদ্ভুত সার্কাস, যেখানে ক্লাউনরা নিজেদেরকে জান্নাতের টিকিটের এক্সক্লুসিভ ডিলার বলে দাবি করে, কিন্তু পকেট ভরে টাকা নিয়ে ভোটের বাজারে ডাকাতি চালায়। জামায়াতে ইসলামীর মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট : ২০২৬ ইং ।

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৩:০২

জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট : ২০২৬ ইং
(বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে স্হানীয় পর্যবেক্ষণ)




আমরা সবাই অনেক উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা নিয়ে আগত নির্বাচন নিয়ে উন্মুখ হয়ে আছি,
প্রতিটি মর্হুতে বিভিন্ন... ...বাকিটুকু পড়ুন

******মায়ের শ্রেষ্ঠ স্মৃতি******

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৪:১৫


মায়ের স্মৃতি কোনো পুরোনো আলমারির তাকে
ভাঁজ করে রাখা শাড়ির গন্ধ নয়
কোনো বিবর্ণ ছবির ফ্রেমে আটকে থাকা
নিস্তব্ধ হাসিও নয়
সে থাকে নিঃশব্দ এক অনুভবে।

অসুস্থ রাতের জ্বরজ্বালা কপালে
যখন আগুনের ঢেউ খেলে
একটি শীতল... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনগণ এবার কোন দলকে ভোট দিতে পারে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৬


আজ বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। সকাল সাতটা থেকেই মানুষ ভোট দিতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বিএনপি জোট বনাম এগারো দলীয় জোট (এনসিপি ও জামায়াত)। নির্বাচনের পরপরই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×