somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প-মাটিমানব [বাংলাদেশের অতিমানবেরা-২]

০৪ ঠা এপ্রিল, ২০১৪ সন্ধ্যা ৬:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ক্লান্তি, বিষাদ অবসন্নতা।

কোথাও যেনো ছুঁয়ে যাচ্ছে জায়েককে। বাবাকে এমন অবস্থায় পড়তে হবে তার কারণেই এটা যেনো তার বিশ্বাস হচ্ছে না।

কিছুদিন আগের কথা।নীলা বিয়ের চাপ দিচ্ছে। কাছাকাছি সমবয়সী হওয়ায় ঝামেলা। কুমিল্লা নামের এই মফঃস্বলে বিয়েটা মেয়েদের উপর তাড়াতাড়িই চাপে। সেক্ষেত্রে নীলার বয়স যেখানে বাইশের কাছে, ২৪ বছরের জায়েককে অনেক চাপ পোহাতে হচ্ছে। বাবার কাপড়ের দোকান, ইটের ভাটা, নিজের গ্যারেজ, নিজের মুরগীর ফার্ম, মাছের ব্যবসা এবং তার উপর পড়ালেখা।

বয়সের পার্থক্য দুবছরের মানে কুমিল্লা ভার্সিটিতে তারা দু ব্যাচ আগে পেছনে। পরিচয়টা কোচিং এ। কতো মেয়ে চোখের সামনে দিয়ে এলো গেলো। কিন্তু কখনো কোচিং এ পড়াতে গিয়ে এমনতরো ঝামেলায় পড়ে নি জায়েক। বাসা থেকে দু গলি পরে থাকা মেয়েটি যে কোচিং এ এমন চোখ টেপটেপি করবে, বালাই ষাট!

-তুমি বুঝছো মানুষ হবা না।
-ক্যান?
-এত্তো সৎ ক্যান তুমি? কোচিং এ প্রেমে পড়লা ব্যস অমন কইরা পড়ানো ছাইড়া দিতে হবে?
-হ তোমারে এইবার প্রেম শিখামু।
-রাখো তোমার প্রেম। বাসায় বিয়ার চাপ দেয়। আর উনি ডিমের ভিতর কুসুমের ঘনত্ব বের করে।

হতাশা কি চেপে ধরে? মানুষের প্রেম-ভালবাসার আবেগ কি বাস্তবতার কাছে হার মানে। পুরুষদের কখনো হারতে নেই। তাই তারা বাস্তবতায় ফিরে আসে বেঁচে থাকার তাগিদে।

-আব্বা দিনতারিখ ঠিক কইরালাও।
-বেয়াদব! নিজের বিয়ার কথা কেউ নিজে কয়?
-কিন্তু জায়েকের বাপ তোমার পোলারে তো নীলায় তাড়াতাড়ি করতে কইছে।
-আমি টাকার যোগান আনি। তুই নীলার বাপের লগে কথা আগাইয়া ল।

দিন যায় যায় দিন। একটুও বিরাম নেই। সামনে বিয়ের সানাই বাজবে। কিন্তু চোখে ঘুম নেই। ছেলের আকদ করেছেন কিন্তু বিয়ের যে খরচপাতি ওটা? কিছুটা ঘাটতি বাজেটে। শংকার ডংকা বেজে যেনো না যায়। ধার কর্য এ শহরে বিপদজনক। ঠিক সময়ে ফেরত না দিলে দিনে দুপুরে গায়েব হয়ে যেতে হয়।

-আরে রফিক সাব যে।
-জীবনে এইরকম কইরা আওন লাগবো ভাবি নাই।
-আরে সমস্যা নাই। যা লাগে নেন। পরেরটা পরে দিয়েন।

মন্তাজের কাছে থেকে ধার নিয়ে বিয়েটা চুকে দিয়ে ঘরের ছেলের বৌকে তুললেন। কিন্তু এই মন্তাজ যে এতো ঝামেলার লোক জানা ছিলো না।

একটা সময় ফেরত চাইলেও দেয়া যায় না। আজ সেই সময় হাতের পাশে চলে এলেও টাকা ফেরত দেয়া খুব কঠিন।

"পোলার বিয়া সারছেন তো?" গম্ভীর গলায় কে যেনো ঢুকলো রফিক সাহেবের কাপড়ের দোকানে।

-আরে মন্তাজ যে বসো বসো।
-চাচা সময় নাই। আমার থিকা টাকা নিছেন যে ঐগুলা ফেরত দেওন লাগবো।
-আরে হাতে তো টাকা নাই ভাইস্তা। একটু সময় দেও।
-কইলাম সময় নাই। টেকা দেন।
-পরের মাসে দেই বাবা?
-ঐ তরা ভিত্রে ঢুইকা ক্যাশ ভাঙ। বইয়া আসোস ক্যা বাইরে?
-এই মন্তাইজ্যা রফিক চাচার ক্যাশে হাত দিবার সাহস পাইলি কইত্তন?!
-হালায় কয় কি ঐ দোকান ভাঙ হালার মাথা ফাইট্টা ছুরি বসা পেডে।
-অই অই অই

মাথা ফেটে দরদর করে রক্ত বেরুচ্ছে। পেটে ছুরি বসিয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। কিছু ভালোবাসার মানুষ ধরাধরি করে মেডিকেলে নিয়ে গেলো।

জায়েক এসব কিছু জানেনা। বৌকে বাড়িতে রেখে ইট ভাটায় চলেছে। ওখানে ক্যাশে বসতে হবে।

-হেহে কই যাস?
-কিরে নূরা পাগলা আইজ এতো হাসি?
-আল্লাহ দুনিয়াতে ভালো মানুষ পাডায় সেবা করনের জইন্য
-কস কি পাগলা?
-তোর দিন আইতাছে মানুষের জন্য খাটন লাগবো।

দশ বছর ধরে পাগলটা এই বটগাছের নিচে ধ্যানে থাকে। কেউ ঘাঁটায় না। অদ্ভুত কান্ড করে বসে মাঝে মধ্যে। তবে সবাই একে পছন্দ করে।

-তোর লিগা একটা জিনিস রাখছি
-কিরে পাগলা আমার জন্যও জিনিস রাখছোস?

আশে পাশে প্রচুর মাটির ঢেলা। একটা তুলে হাতে দিয়ে দিলো।

-যাহ খায়া ল।
-কি খাইতা... দুসেকেন্ডে হাতে থপ কইরা কি যেনো ভারী ঠেকলো। ওমা আস্ত তাজা আতা ফল।
-ভাটায় বইসা খায়া ল। দেরী করিস না। আর শোন যা হইবো ডরাইছ না। আমি আছি।


বিস্ফোরিত চোখে সে জায়গা থেকে পাগলার দিকে তাকাতে তাকাতে ভাটামুখী হলো। ভাটায় এসে আতা সবটুকু খেয়ে নিলো।

এমন সময়... হুড়মুড় করে কিছু লোক ঢুকলো। এদের একজনকে চিনলো। মন্তাজ।

-তুই জায়েক নি?
-কে আপনি? চিনবার পারলাম না।
-তর বাপেরে ছুরি মারছি। এইবার তরে মাটিত পুঁইতা দিমু। ল তোরা সব ক্যাশ ভাঙ
-এই খবরদার আমার ক্যাশে হাত দিবি না খান*র পোলারা!
-মার শালারে!

বেমক্কা বাড়ি খেয়ে মাথায় জায়েকের দুনিয়া অন্ধকার। মারের ভেতরও এই অদম্য ছেলের দুর্জেয় সাহসিক প্রতিরোধ। কিন্তু মানতে কষ্ট হয়। সত্যরাও হেরে যায় যুদ্ধে। অসত্যের চিল পাখা মেলে ভর করে। ছায়া ঘিরে নেয় চারপাশ।

আস্তে আস্তে মিশে যাচ্ছে জায়েক ইট ভাটার মাটির ভেতর। অনেক ভেতরে।

তিন দিন পর...

ধুম ধুম ধুম। এক দুই তিনবার সেই মাটির ঢিবি থেকে আওয়াজ করে একটা হাত বেরিয়ে এলো ঢিবিটা ধ্বংস করে। একটা মানুষ বেরিয়ে এলো।

-প... পানি খামু
-এই ল। মন ভইরা খা।

মাটির ঢিবি থেকে বেরিয়ে অবিশ্বাস্যের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে পানির জন্য সাহায্যকারীর দিকে।
-আতা কামে দিছে। এইবার যা। মাইনষের কামে যা। সেবা কর।
-হ নূরা পাগলা। আমার বাপ, আমারে মারার প্রতিশোধ এইবার লমু।

রফিক সাহেবের বাড়িতে তিনদিন ধরে শোকের মাতম। সদ্য বিবাহিত নীলার হাতের মেহেদী শুকায় নি কিন্তু এরি মধ্যে তার স্বামীকে পাওয়া যাচ্ছে না। শ্বশুর মেডিকেলে। শ্বাশুড়ি ম্যুহমান শোকে।

-নীলা। আম্মা।

জায়েক! বেঁচে আছে? নীলা দৌড়ে আসে। স্বামী বেঁচে আছে এটা যেনো বিশ্বাসই হয় না। বুকে লুটিয়ে হাউমাউ শুরু করলো।
-জায়েক আব্বারে শেষ কইরা ফেলাইলো।
-কিচ্ছু করতে পারবো না। আমি শেষ কইরা দিমু মন্তাজরে। তুমি আম্মারে দেইখা রাইখো।

আখাউড়া স্টেশনের আগে ট্রেন দখল করেছে ডাকাতরা। সেটা রেসকিউ করতে প্ল্যানে নেমেছে আমাদের এজেন্ট রিশাদ। বগি থেকে নামতেই দু তিন জন তেড়ে এলো। ফাইট ব্যাক দিতে দিতে একজন বিশাশদেহীকে দেখা গেলো। ঘুঁষি বাগিয়ে তেড়ে আসতেই হঠাৎ একটা মাটির প্রাচীরে লেগে বাম্প করলো। ছিটকে পড়লো কয়েক হাত দূরে কিছু মাটির বিশাল টুকরো।
-আপনি ইঞ্জিন বগিতে গিয়ে কিছু বন্দী আছে ওদের উদ্ধার করেন।
-কিন্তু আপনি কে?
-আমি?... মাটিমানব। স্মিত হাসলো জায়েক।
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×