somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বইপাগল : মুখের দিকে দেখি

০৫ ই অক্টোবর, ২০০৬ রাত ১:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলাম, রাত জেগে তাই পড়লাম শহীদুল জহিরের "মুখের দিকে দেখি"।

জহির আমার প্রিয় লেখকদের দলে ঢুকে পড়েছেন একেবারে প্রথম পাঠেই, তাঁর "কোথায় পাবো তারে" গল্পটি যাকে বলে গুরবে কুশতন শব এ আউয়াল, পহেলা রাতেই মার্জার নিধন। খুব আগ্রহ করে বইটা হাতে নিয়ে একটানে পড়ে শেষ করলাম, সেই আনপুটডাউনেবল বইগুলোর একটি এটি। বুক রিভিউ লিখতে বসিনি, বিস্তারিত চুলচেরা বিশ্লেষণের ইচ্ছা বা যোগ্যতা কোনটিই বোধহয় আমার নেই, যা লিখবো সেটি হয়তো র্যানসমনোট হয়ে দাঁড়াবে, মানে কাহিনীর এখান ওখান থেকে কেটে জড়ো করা কিছু, আর বলবো যে জহির অন্য রকম করে আঁকছেন গল্পকে। তাঁর কাহিনীর ভাষা আর ভাষার কাহিনী একে অন্যকে অতিক্রম করে ছুটছে শুধু, চরিত্রগুলোকেও তিনি কাথ ব্লঁশ ধরিয়ে দিয়েছেন হাতে, তারাও ছুটছে সমানে। "মুখের দিকে দেখি" পড়ে মনে হলো, এ এক সন্তর্পণ রেখা অতিক্রমের গল্প। চরিত্রগুলি মাঝে মাঝেই বাস্তবতার রেখা অতিক্রম করে বেড়াতে যায় অবাস্তবের দেশে। বাস্তবতার ভেতরেও তারা রেখা অতিক্রমের খেলায় মেতে থাকে, ক্যাথলিক ফাদার সেলিবেসির কড়ার আর ক্যাসক বিসর্জন দিয়ে রেখা পেরিয়ে প্রোটেস্টান্ট বালিকা প্রেয়সীকে বিয়ে করে, বাঙালি মুসলমান তৃষিত হয়ে ওঠে খ্রিষ্টান প্রেমিকার কণ্ঠলগ্ন যীশুকে চুম্বনের জন্য, মুসলমান যুবতী খ্রিষ্টান প্রেমিককে টেনে আনতে চায় নিজের ধর্মের চৌহদ্দির ভেতরে, মহল্লার সামাজিক বান্দরেরা বিবর্তনের রেখা টপকে স্নেহের টানে ফিরে আসে বান্দরের দুধ খেয়ে বেড়ে ওঠা চানমিঞার কাছে, চানমিঞার মা খৈমন সাধ্যের রেখা ফুঁড়ে ছেলেকে ভর্তি করায় পয়সাওলা পোলামাইয়াদের ইস্কুল সিলভারডেলে, মামুনের মা মামুনকে কাঠের ভুসি আনতে পাঠিয়ে তাকে ঠেলে দেয় স্থানকালের রেখার ওপারে ... তাই মামুন বছরের পর বছর মামুনুল হাই হয়ে একবার জুলি ক্লার্কের টানে নারীশিক্ষা মন্দিরের গলি্লতে হানা দেয়, আবার ওদিকে বছরের পর বছর আব্দুল ওদুদ চৌধুরীর মেয়ের পোষা খরকোস হয়ে চোরাচালানের ট্রলার নিয়ে সীমান্ত রেখা পার হয়ে বার্মা চলে যায় সার আর অক্টেন নিয়ে। সব চরিত্র কখনো এক কখনো অনেক হয়ে ছুটতে থাকে উপন্যাসের সাদাকালো ছকের মধ্যে। নারিন্দার ভূতের গলি্ল থেকে বার্মিংহ্যাম পর্যন্ত জহিরের অক্ষরসন্তানেরা রীতিমতো একটা কান্ড করতে থাকে, কখনো র্যাবের কমান্ডার আর কখনো গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের গল্পনির্যাস এসে ভুলিয়ে দেয় কিভাবে কাদের সিদ্দিকি হয়তো রেসকোর্সের ময়দানে নিয়াজির থোতার নিচে ঘুসি মেরে কাঁদিয়ে দিয়ে বলতে পারতেন শুয়ারের বাচ্চা, চুতমারানির পোলা, তোর মায়রে চুদি, আর অরোরার প্রশ্নের জবাবে বলতে পারতেন আই অ্যাম এ বাঙ্গালি উইথ শক্ত হাড্ডি এন্ড লম্বা বিয়ার্ড, মাই নেম ইজ আব্দুল কাদের, আই কাম ফ্রম টাঙ্গাইল, ডুয়িং গুলি্ল, ফাইটিং ফর মাই কান্ট্রি --- হু আর ইউ? পাঠকের চোখে মহল্লার বান্দরগুলির হোগার লাল আর রবার্ট ক্লার্কের জ্ঞানধন্য কাঁটাওলা শিমুলের ফুলের লালের ঘোর লাগে ... পাঠক তো আর চানমিঞা নয় যে লাল আর সবুজকে ধূসর দেখবে, পাঠক তো বান্দরের দুদ খেয়ে বড় হয় নাই।

আয়রে তবে ভুলের ভবে অসম্ভবের ছন্দেতে ... সুকুমারের ঐ চরণটাকেই তো জীবনের ধ্রুবতারা করি আমরা অনেকে। জহির আমাদের কাঁধে চড়িয়ে যেন চড়ক মেলা দেখানোর লোভ দেখিয়ে অপহরণ করে অসম্ভবের ছন্দে নাচতে নাচতে ঢুকে পড়েন ঐ ভুলের ভবে।

শহীদুল জহির, আপনি আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০০৬ বিকাল ৫:৪২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের শাহেদ জামাল- ৯৬

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৩ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:২৩



আমার নাম শাহেদ। শাহেদ জামাল।
আজ আপনাদের বলবো আমার জেল জীবনের কথা। জেলখানার খাবারের মান ভালো না। ফালতু খাবার। একদম ফালতু। এত ফালতু খাবার হয়তো আপনি জীবনে খান... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য প্লান (ছোট গল্প)

লিখেছেন আবু সিদ, ২৩ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:৫৪

ষাট বছরের মাজেদা গত দুই সপ্তাহ ধরে শুধু প্লান করেছে, সে তার একমাত্র নাতিটাকে দেখতে যাবে। মেয়ে-জামাই বাড়ি বলে কথা! খালি হাতে কি যাওয়া যায়? তার ওপর তার সাত বছরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

-প্রতিদিন একটি করে গল্প তৈরি হয়-৫০

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ২৩ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯



একটি সাইকেলের জন্য কন্যা অনেক দিন ধরে অপেক্ষা করছে। সে মাটির ব্যাংকে টাকা জমিয়েছে।


ক্লাস ওয়ানে উঠলে তাকে বাই সাইকেল কিনে দেবো বলেছিলাম।

তো একদিন গেলাম, দেখলাম কিন্তু কিনলাম না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আখিরাত ঠিক করার পাশাপাশি দুনিয়ার রাজনীতিতেও ঢুকে পড়লেন

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৪ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০৮


জাতীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার দুই মাস পার হয়েছে। দেশের মানুষ একটু দম ফেলছে , চায়ের আড্ডায় যখন ভোটের উত্তাপ ফিকে হয়ে আসছে, ঠিক তখনই খবর এলো সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পৃথিবীর কোথাও কেন রাত নামে না, আবার কোথাও সূর্য ওঠে না

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৪ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১০:০৩

পৃথিবীর কোথাও কেন রাত নামে না, আবার কোথাও সূর্য ওঠে না

ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত।

জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা, ভৌগোলিক প্রভাব এবং আধ্যাত্মিক প্রতিফলন

আমরা প্রতিদিন যে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখি, সেটাকে এতটাই স্বাভাবিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×