somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সুখের রূপকথা

১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ ভোর ৫:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সত্তরের কোঠায় পা দিয়েও বেশ টনকোই আছে বুড়োটা, আমার মুখোমুখি বসে, এই ধোঁয়ায় ঢাকা পানশালায়। তার চুলগুলোতে যেন তুষার জমেছে, আর চোখগুলো ঝকঝক করছে বরফ ঝেঁটিয়ে পরিষ্কার করা পথের মতো।

'ওহ, লোকগুলো আহাম্মক বটে!' বললো সে মাথা ঝাঁকিয়ে, আর আমার মনে হলো, এই বুঝি তার চুল থেকে তুষারকণা ঝরে পড়বে। 'সুখ তো কোন যাদুসসেজ নয়, যে রোজ ওর থেকে লোকে এক এক টুকরো কেটে নেবে!'

'ঠিক!' বলি আমি। 'সুখ অত সস্তা মাল না। যদিও .. ..।'

'যদিও?'

'.. .. যদিও এখন আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, ঘরে আগুনের ওপর আপনার কয়েক চিলতে সুখ শুকোতে দেয়া আছে?'

'আমার কথা আলাদা,' বললো বুড়ো, আর এক ঢোঁক গিলেও নিলো, 'আমি আলাদাই। আমি হচ্ছি সেই লোক, যার একটা ইচ্ছে এখনও পূরণের জন্যে পড়ে আছে!'

আমার মুখটা আগে খুঁটিয়ে দেখে নিলো বুড়ো। 'অনেক আগের কথা,' নিজের দু'হাতে মাথাটাকে সঁপে দিয়ে শুরু করলো সে, 'অনেক আগের। চলি্লশ বছর। তখন আরো চ্যাংড়া ছিলাম, আর ভুগছিলাম জীবনটাকে নিয়ে, যেভাবে লোকে ফোলা গাল নিয়ে ভোগে। বসে ছিলাম সেদিন, এক দুপুরে, তিতিবিরক্ত হয়ে একটা পার্কের বেঞ্চে বসে ছিলাম, এমন সময় পাশে বসে থাকা বুড়োটা বললো, যেন ওর সাথে আমার অনেকক্ষণের আলাপ, [ইটালিক] তা বেশ তো, আমরাও ব্যাপারটা ভেবে দেখেছি। তোর তিনটে ইচ্ছে পূরণ করা হবে[/ইটালিক]। আমি আমার খবরের কাগজের দিকেই চেয়ে রইলাম, যেন কিছুই শুনিনি। কিন্তু বুড়োটা বকে চললো, [ইটালিক] ভেবে নে, কী চাই তোর। সবচে' সুন্দরী মেয়েটা, নাকি সবচে' বেশি টাকা, নাকি সবচে' বড় গোঁপ .. .. যা তোর খুশি। কিন্তু শেষতক খুশি হওয়া চাই, বুঝলি? তোর এই ভাল্লাগেনা-ভাব আমাদের আর ভাল্লাগে না[/ইটালিক]। বুড়োটাকে দেখে মনে হচ্ছিলো, সাদা পোশাকে সান্তা ক্লজ বুঝি। একমুখ সাদা দাড়ি, আপেলের মতো টুকটুকে দু'টো গাল, শিমুলতুলোর মতো ভুরু। পাগলছাগল নয়। বোধহয় বেশ খানিকটা খোশমেজাজি। ব্যাটাকে আগাপাস্তলা খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে আমি আবারও আমার কাগজে মন দিলাম। বুড়োটা বললো, [ইটালিক] তোর তিনটে খায়েশ নিয়ে তুই কী করবি, তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নেই। তবে যদি এ ব্যাপারে আগে থেকে একটু ভেবে রাখিস, তাহলেও কোন ভুল হবে না। দেখিস, তিনটে ইচ্ছে কিন্তু চারটা বা পাঁচটা নয়, ঠিক তিনটে। আর এর পরও যদি তুই অমন ব্যাজার হয়ে থাকিস আর হিংসুটেপনা করিস, তাহলে কিন্তু আমরা তোকে আর সাহায্য করতে পারবো না বাপ[/ইটালিক]। আমি জানি না, আপনি নিজেকে আমার জায়গায় কল্পনা করতে পারছেন কি না। ভাবুন একবার, আমি একটা বেঞ্চে বসে, এই দুনিয়া আর খোদাতালার ওপর চরম বিরক্ত .. .. দূরে ট্রাম যাচ্ছে টিং টিং করে, প্যারেডের পোলাপান হাত পা ছুঁড়ছে আর ট্রাম্পেট ফুঁকছে, আর আমার পাশে বসে বাকোয়াজ করে যাচ্ছে কেবল ঐ ব্যাটা হতচ্ছাড়া!'

'আপনি চটে গেলেন খুব?' বলি আমি।

'চটলাম। আমার মনে হচ্ছিলো, আমি একটা ফাটো ফাটো বয়লার। আর যখন বুড়োটা তার অমন তুলোটে দাদু দাদু মুখটা খুললো, নতুন কিছু বকবার জন্যে, আমি গর্জে উঠলাম, রীতিমতো কাঁপছিলাম রাগে, [ইটালিক] বেশ তবে, আমি আমার একমাত্র ইচ্ছা, আমার অন্তরের অন্তস্থলের ইচ্ছাটি মুখে বলছি, যাতে করে আপনি, ব্যাটা বুড়ো গাধা, আমাকে আর তুইতোকারি করতে না পারেন .. .. আপনি জাহান্নামে যান[/ইটালিক]! জানি, ওভাবে বলাটা ভদ্র বা মার্জিত নয়, কিন্তু আমি একেবারেই নিরুপায় ছিলাম, ওভাবে না বললে আমি ঠিক রাগে কাবু হয়ে পড়তাম।'

'তারপর?'

'কী তারপর?'

'সে চলে গেলো?'

'ওহ্! .. .. গেলো তো বটেই! উধাও হয়ে গেলো যেন। তখনই। বাতাসে মিলিয়ে গেলো যেন। আমি এমনকি বেঞ্চের নিচেও উঁকি মেরে দেখলাম। সেখানেও ছিলো না ব্যাটা। আর আমি ভ্ভীষণ ভয় পেলাম। এই ইচ্ছে পূরণের ব্যাপারটা তাহলে সত্যি! আর প্রথম ইচ্ছেটা পূরণ করা হয়ে গেছে! বাপ রে! আর যদি সত্যিই ইচ্ছেটা পূরণ করা হয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই সেই শান্ত, শিষ্ট, ভদ্র দাদুটা, যার দাদুই হওয়ার কথা, এখন কেবল চলেই যায়নি, কেবল আমার বেঞ্চ থেকেই উধাও হয়ে যায়নি, গেছে তো গেছে, একেবারে জাহান্নামে! খোদ শয়তানের কাছে! আমি নিজেকে বোঝালাম, গাধামি করো না। জাহান্নাম বলে কিছু নেই, আর শয়তান বলেও নেই অমন কিছু। কিন্তু, এই তিনটে ইচ্ছে কি তবে পূরণের জন্যে রয়েছে? আর, সেই বুড়োটা তো উবে গেছে, যদিও ওভাবে যাক, তেমনটা আমি চাই নি .. .. আমার কালঘাম ছুটে গেলো। হাঁটু কাঁপতে লাগলো আমার ঠকঠকিয়ে। কী করা উচিত আমার? সেই বুড়োটাকে এখুনি আবার এখানে ফিরতে হবে, চাই জাহান্নাম থাকুক আর না থাকুক। আমারই দোষে সে এখন উধাও। এখন আমাকে আমার দ্বিতীয় ইচ্ছে কাজে লাগাতে হবে, তিনটের মধ্যে দু' নম্বরটা, হায় রে, এমনই বলদ আমি! নাকি ব্যাটা যেখানে আছে, সেখানেই থাকবে, সেখানেই তাকে রয়ে যেতে দেবো, সেই টুকটুকে আপেলের মতো গাল দুটো নিয়ে? আপেলের কাবাব, ভাবলাম আমি, আর কেঁপে উঠলাম। আমার আর কোন গতি ছিলো না। আমি চোখ বন্ধ করলাম, আর ভয়ে ভয়ে ফিসফিসিয়ে বললাম, [ইটালিক] আমার ইচ্ছে, সেই বুড়োটা আবার আমার পাশে এসে বসুক[/ইটালিক]! ভাবতে পারেন, আমি বছরের পর বছর ধরে, এমনকি এখনো মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যে নিজেকে গালমন্দ করি, কেন ওভাবে আমার দ্বিতীয় ইচ্ছেটাকে নষ্ট করলাম, তবে তখন আমি অন্য কোন উপায় দেখিনি, আসলে অন্য কোন উপায় ছিলোও না .. ..।'

'তারপর?'

'কী তারপর?'

'বুড়ো ফিরে এলো?'

'ওহ্! .. .. এলো তো বটেই! তৎক্ষণাৎ। সে আবারও আমার পাশে বসলো, যেন সে অমনই বসে ছিলো। তবে তাকে দেখে বোঝা গেলো, যে সে এমন কোথাও ছিলো, যেখানে কি না খুব ভুগেছে বেচারা, মানে .. .. খুব গরম কোনও জায়গায়। হ্যাঁ, ঠিক তাই। তার সেই ঝোপালো সাদা ভুরু দুটো একটু ঝলসে গেছে, দাড়িটাও কুঁকড়ে আছে একটু, কিনারার দিকে বিশেষ করে। আর তার গা থেকেও সেঁকা হাঁসের মতো গন্ধ বেরোচ্ছিলো। আমার দিকে কটমটিয়ে তাকিয়ে ছিলো বেচারা। তারপর বুকপকেট থেকে একটা চিরুনি বার করে নিজের দাড়ি আর ভুরু আঁচড়ালো সে, আর খোনা গলায় বললো, [ইটালিক] শুনুন ভাই, কাজটা কিন্তু আপনি ভালো করলেন না[/ইটালিক]। আমি আমতা আমতা করে মাপ চাইলাম, বললাম যে তিনটে ইচ্ছের কথা আমি মোটেও ভেবে দেখিনি, আর নিজের ভুল বুঝতে পেরে তো যথাসম্ভব ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করেছি। তা অবশ্য ঠিক, বললো বুড়ো। এতো অমায়িক মুচকি হাসলো সে, যে আমার চোখে পানি চলে আসার জোগাড়। [ইটালিক] তবে হয়েছে কি, এখন আপনার কেবল একটি মাত্র ইচ্ছে বাকি[/ইটালিক], বললো সে, [ইটালিক] তৃতীয়টা। আশা করি এটার ব্যাপারে আপনি আরেকটু সাবধানে থাকবেন। আমায় কথা দিন, সাবধানে থাকবেন[/ইটালিক]? আমি ঢোঁক গিলে মাথা নাড়লাম, [ইটালিক]নিশ্চয়ই, কিন্তু আপনি আমাকে তুমি তুমি করে বলুন[/ইটালিক]। এবার বুড়ো হেসে ফেললো। [ইটালিক]বেশ তো, বাছা, আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো সে, ভালো থাকো। মনমরা হয়ে থেকো না। আর তোমার শেষ ইচ্ছের ব্যাপারে সতর্ক থেকো[/ইটালিক]। আমি এবার খুশি হয়ে বললাম, [ইটালিক] আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি[/ইটালিক]। আর এরপর বুড়ো চলে গেলো, যেন হাওয়ায় মিশে গেলো একেবারে।'

'তারপর?'

'কী তারপর?'

'সেদিন থেকেই আপনি সুখী?'

'ওহ্! .. .. সুখী?'

আমার পাশর্্ববতর্ী উঠে দাঁড়ালো, হুক থেকে নিজের টুপি আর কোট খুলে নিলো, ঝকঝকে চোখে আমাকে তাকিয়ে দেখলো কিছুক্ষণ, তারপর বললো, 'আমার শেষ ইচ্ছেটাকে আমি গত চলি্লশ বছরে আর ঘাঁটাইনি। মাঝে মাঝে অবশ্য মনে হয়েছে, চাই কিছু একটা। কিন্তু না। ইচ্ছেগুলো ততক্ষণই সুন্দর, যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের কিছু একটা চাইবার রয়ে যায়। ভালো থাকবেন।'

আমি জানালা দিয়ে চেয়ে দেখলাম, রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছে সে। তাকে ঘিরে চারপাশে তুষারকণাগুলো যেন নাচছে। আর আমাকে বলতে একদম ভুলে গেছে সে, বাস্তবিক সে একটু হলেও সুখী কি না। নাকি সে ইচ্ছে করেই আমাকে উত্তরটা দিলো না? স্বাভাবিক, অমনও তো হতে পারে।


(মূল জার্মান, এরিখ কেস্টনারের [গাঢ়]ডাস মেয়ারশেন ফম গ্লুয়ক[/গাঢ়] থেকে অনূদিত। প্রকাশকাল সেপ্টেম্বর 26, 2004।)
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে আগস্ট, ২০০৬ বিকাল ৪:১৬
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিপদ

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫


বিপদ নাকি একা আসে না—দলবল নিয়ে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। প্রবাদটির বাস্তব এবং কদর্যরূপ যেন এখন মৃণালের জীবনেই ফুটে উঠেছে। মাত্র মাসখানেক আগে বাবাহারা হলো। পিতৃশোক কাটার আগেই আবার নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

লক্ষ্য অর্জনে অপরিহার্য - অটল মনোযোগ

লিখেছেন ঢাকার লোক, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৫

মানুষের জীবনে লক্ষ্য একটি দিকনির্দেশনার মতো কাজ করে। লক্ষ্যহীন জীবন অনেকটা দিকচ্যুত নৌকার মতো, যা স্রোতের টানে ভেসে বেড়ায় কিন্তু কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। তাই জীবনে সফল হতে হলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নগর দর্পন

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৯:৫১



১. মিরপুর ডিওএইচএস থেকে কুড়িল বিশ্বরোড যাওয়ার পথে ফ্লাইওভারের ওপর এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য। এক ভদ্রলোকের প্রায় ৪৮ লাখ টাকার ঝকঝকে সেডান হাইব্রিড গাড়ির পেছনে এক বাইক রাইডার ধাক্কা দিয়ে স্ক্র্যাচ... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোলামি চুক্তির কারণে বোয়িং কিনতে বাধ্য হলো সরকার?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০১ লা মে, ২০২৬ রাত ১২:৫৭


বাসই চলে না , কিন্তু আকাশে ওড়ার বিলাসিতা থেমে নেই। কালের কণ্ঠের এই শিরোনামটা পড়ে মুহূর্তের জন্য থমকে যেতে হয়। কথাটায় একটা তিক্ততা আছে, একটা ক্ষোভ আছে, যেটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিয়া আচরণে অতিষ্ট হয়ে হযরত আলী (রা.) ও তাঁর শিয়ার বিপক্ষের সত্য প্রকাশ করতে হয়

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০১ লা মে, ২০২৬ ভোর ৬:৩১



সূরাঃ ৮ আনফাল, ৬৭ থেকে ৬৯ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৭।দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবির উচিত নয়। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর। আল্লাহ চান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×