প্রেমেন্দ্র মিত্রকে আমি আবিষ্কার করি, কিংবা তিনিই আমাকে আবিষ্কার করেন, যখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি, সিলেটের কেন্দ্রীয় মুসলিম লাইব্রেরিতে (নামটা এমনই ছিলো কি না এখন মনে পড়ছে না), লাইব্রেরি ভর্তি বিষন্ন করে দেয়া সব পুরনো মাজাভাঙা ধূলোয় ভরা বই, লোকজন ওখানে কাগজ পড়তে আসে, লাইব্রেরিতে একবার ঢুকে পেছন ফিরে তাকালেই মন খারাপ হয়ে যেতো, পুরনো গেট আর তার ওপর মুখকালো করে আকাশ, শন শন বাতাসে দূরে কিছু গাছ নড়ছে, ইনক্যানডেসেন্ট ল্যাম্প জ্বলে উঠেছে ঠুস করে এই ভর বিকেলেই, আর চীনা কমিকের বাংলা অনুবাদ পড়ে বিরক্ত হয়ে আমি অনেক খোঁজাখুঁিজ করে একটা সরু কোমরের তন্বী বই বার করেছি, সেটি ছিলো এক ছোটগল্প সংকলন, আর সেটি ঘনাদার গল্পের। সেই আবছায়ার মধ্যেই ঘনাদার মশা গল্পটা পড়ি, লাইব্রেরির পাঠকাল ফুরিয়ে যাবার পর লাইব্রেরিয়ান আমাকে একরকম জোর করেই বার করে দেয়। কিন্তু বেতালের মতো তখন ঘনাদা, আর প্রেমেন মিত্তির আমাকে পেয়ে বসেছে।
এর বহু পরে, আমার কৈশোর হারিয়ে ফুরিয়ে ইতিহাস হয়ে গেছে তখন, প্রবল ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আমি লেপ্টে আছি বিছানার সাথে, ষোল কেজি ওজন কমে গেছে, কিছু খেতে পারি না, বিছানা ছেড়ে উঠতে পারি না, আমার বড় ভাই ঘনাদা সমগ্র তিন খন্ড কিনে এনে দিলেন। আর কিছু করার নেই, আমি একটা একটা গল্প পড়ি আর ঝিম মেরে পড়ে থাকি। সেই দুর্বলতার ঘোরের মধ্যেই বাকি গল্পগুলো এক এক করে পড়লাম। সূর্য কাঁদলে সোনা আমার খুব প্রিয় একটি উপন্যাস, বাংলা সাহিত্যে এমন মৌলিক থ্রিলার খুব বেশি নেই বোধহয়। প্রেমেন্দ্র মিত্র ঘনাদাকে অনেক ভালোবেসে এঁকেছেন, বছরের পর বছর, চলি্লশ বছর বা তারও কিছু বেশি সময় ধরে।
ঘনাদার বাইরেও প্রেমেন্দ্র কিছু কল্পবিজ্ঞানের গল্প লিখেছেন, কিছু থ্রিলার, যেগুলোর নায়ক মামাবাবু নামের এক চরিত্র, আর শিশুদের জন্য কিছু অসাধারণ রূপকথা, যেগুলো ক্লাসিকের অন্তভর্ূত হয়ে থাকতে পারে। "কালরাক্ষস কোথায় থাকে" গল্পটি স্কুলের শিশুদের পাঠ্য হবার যোগ্যতা রাখে।
তাঁর কবিতাগুলোর বেশিরভাগই আমার পড়া হয়নি। হয়তো আরো বুড়িয়ে গিয়ে পড়বো। প্রায়ান্ধকার কোন লাইব্রেরিতে, নয়তো রোগশয্যায়, নয়তো কারো বাড়িয়ে ধরা বইতে, প্রেমেন্দ্র মিত্র বার বার করেই ফিরে আসেন দেখেছি।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



