সব ভাবনা এলোমেলো আজ
ম্রিয়মান বেদনাবিধুর
বিষাদের বিহবল সুর......
এ পর্যান্ত লিখে কবি কলম দাঁতে কেটে নিশ্চিত হতে চান তিনি এ কথাটাই বলতে চাইছেন তো, আসলে এটাকে যে কবিতা হতেই হবে এমন দিব্যি কেউ দেয় নি তাকে,এই ধারনাটাই অর্থহীন, আর এই অর্থহীনতার গভীরে ডুবে যেতে যেতে কবি ভাবছেন , এ কবিতার শুরু হতে পারে যেকোনো ছোটো চায়ের দোকানে নালা নরদমা ডাস্টবীনে, যেকোনো স্থানেই তো এ কবিতার শুরু হতে পারে, তাৎক্ষনিক গতি বা ছন্দের মাত্রার হিসেব এসব জটিলতায় না গিয়ে বরং শক্ত হাতের মোচড়ে ঘুরিয়ে দেওয়া যায় কি না কবিতার স্রোত.
কবিতার কথা কোথায় লুকানো কবি নিশ্চিত নন, অবশ্য এই কথাগুলোই যে কবিতা এমনও না, কিংবা আমি বললাম তাই কথার ও প্রাণ চাই, কথারও প্রতিবাদ চাই, কথার কলরব হট্টগোল কোথাও সার নেই এমন নির্জিব লেখা যেমন চৈতমাসের রাস্তা শুয়ে আছে তো আছেই-
অবশ্য কবিতা মখমলের বিছানা থেকে পা নামিয়ে মাথায় পালকের বালিশ চোখের কোনে গতরাতের অবশিষ্ঠ স্বপ্ন, এলোমেলো চুল থেকে সোনালী রূপালী ইচ্ছা ঝড়ছে মসলিনের সচ্ছতা ত্বকে কাঁচা হলুদ স্বর্ণরেণু এই মাত্র মার্বেল পাথর স্পর্শ করে
এ ভাবেও কোনো প্রাসাদবালিকার দুর্বল প্রনয়োপখ্যান, তার কারূকার্যময় জানালা গলে চুরি করে আসা ভোরের টাটকা েেরাদ,মাথায় জীয়ন কাঠি মরন কাঠি রাজপুত্তুর সোনার কাঠি রূপার কাঠি বদলে ঘুমন্ত রাজকন্যাকে বললে- এমন দিদি মার রূপকথাও হতে পারে কবিতা।
কবিতা ডাস্টবীনে দুর্বল হাতের দক্ষ বাছাই ভাক্ষনযোগ্য যেকোনো উচ্ছিষ্টের জন্য তীব্র লড়াই লিকলিকে হাড়জিরজিরে শিশুর নিঃশ্বাসের আলাদা ছন্দে তার খিস্তি,তার চাহিদা আকাংক্ষা আর তার বেড়ে উঠার কঠোর পরিবেশ হতে পারে, হতে পারে কোনো স্কুলফেরতাশিশু, রাস্তা থেকে ভাঙা কাঁচের রঙ্গিন টুকরো কুড়িয়ে ব্যাগে তুলে রাখা, ফেলে দেওয়া ম্যাচবাস্ক,সিগারেটের প্যাকেট রাংতা কাগজ, দু একদিন হাতে তৈরি বায়োস্কোপে কাগজের টাকায় দেখানো কমিকস্ট্রিপ,তার দাড়িয়াবান্ধা ডাংগুলিটিলো এক্সপ্রেস খেলা অন্ধকার সন্ধ্যা, তার রাতের টেবিলের কূপি হ্যারিকেনের মৃদু আলোতে বাবা মা'র ভাবখুনসুটি,বিকেলের ঝগড়াবিবাদভরা মাথার ভাবনা, তার স্কুলের মাঠ, আবার পরদিন মার্বেল, ভাঙাকাঁচ,রাংতা রেললাইন ধরে একটানা হাঁটা মালগাড়ীর দীর্ঘ সারি ধাবন্ত ট্রেনে ঢিল ছোড়ার সহিংস নির্দোষ উল্লাস, তার ঘুম তার জেগে উঠা,
কবিতা ফিরে যেতে পারে জন্মভূমিতে প্রবাসীর ভাবনায় মুগ্ধ স্বদেশে কবিতা হোস্টেলফেরত কিশোরের মুক্তির উল্লাস হতে পারে বন্ধুদের জন্য মন কেমন করা দুপুর, ছোটো বোনের আদুরে একটা চুমুর প্রত্যাশা, তার ট্রেনে বসে থাকা অপেক্ষার প্রহর, মায়ের হাতের ভালোবাসামাখানো নাড়কোল নাড়ু,মিস্টি চড়, ছুটি শেষে মায়ের কান্না,আদরভরা হাতের আশীর্বাদ
" বাবা, ভালোমতো যাস, ঠিক মতও খাস, আর শরীরের যত্ন নিস, চিঠি দিবি, আমিও দিব,তোর বাবাকে দেখছি না কোথায় যে গেলো লোকটা, এই সময় কি এমন রাজকার্য পড়লো তোমার,যাও ছেলেটাকে পৌছে দাও স্টেশনে" ভালো থাকিস বাবা, শরীরের যত্ন নিস বলে , আল্লাহ তুমি দেখে রাখো বলে আঁচলে মুখ লুকিয়ে, তার ঘরের জানালা, ঘরের জানালা থেকে ঝাপসা চোখে দেখা ছেলে হোস্টেল যাচ্ছে, বাবার পাশের হেঁটে যাচ্ছে, তার ছেলে, ছেলে বড় হচ্ছে তার।
লক্ষ লক্ষ এলোমেলো উৎসবের মতো দিন, বন্ধুর উত্তাল আড্ডা, রাজনীতির ঢেউ, এই জানিস না আজ জনসভা পলটন ময়দানে-
সারি সারি মাথার উপরে তর্জনি উচিয়ে নেতার তর্জন গর্জন
মৃদু লাঠি চার্জ খন্ড খন্ড সংঘর্ষবোমাবাজি, গুলি
পটকা ফটাস,পরিত্যাক্ত জনসভার বাদামের ঠোঙা,লিফলেট রক্ত, বাদামের খোসা, একটা চশমা লাঠি,পেপার, ছড়ানো কফ-থুতু,পানের পিক
সিগারেট ফিলটার, আর দুরে ঐ মাঠের এক কোনে একটা লাশ--
ছেলে ফিরে আসছে,মানুষের কাঁধে চড়ে, ফিরে আসছে ছেলে, ছোটো বোনের সন্ধানী চোখ,বাবার পাথর শোক,মায়ের বোবা কান্না
ছেলে ফিরে এসেছে, আর ফিরে যাবে না ছেলে, ছেলে ঘুমিয়েছে তার মায়ের আঁচলে।
মায়ের ভাবনায় ছেলে এখনও দরজা খুলে সামনে দাঁড়িয়ে বলছে " মা একটা টাকা দাও না, বাইরে আইসক্রীমওলা, আইসক্রিম খাবো-
ফুল বাবু সেজে মাথা আঁচড়ে ছেলের বায়না " মা 5 টাকা দাও না বাবার সাথে সাকরাইনে যাবো, মাটির ঘোড়া খেলনা বাঁশী নৌকা কিনবো, মা দাও না মা"
যা ঘ্যান ঘ্যান করিস না সারাক্ষন খালি টাকা আর টাকা, অত পাবো কোথায়, যা হবে না--
ছেলে ম্লানমুখে চলে যাচ্ছে, মা ডাকলেন, আয় এই নে , যা মেলায় একদম দুষ্টামি করবি না, বাবার আঙুল দঃরে যাবি-আর এই শোনো ভাজা পোড়া খাওয়াবে একদম ওর শরীরটা ভালো নেই---
খোকলা দাঁতে হেসে ঘাড় কাত করে ছেলে বাবার আঙুল ধরে যাচ্ছে,
বাবার আঙুল ধরে হাঁটতে হাঁটতে ছেলে এখন 21এ থমকে আছে, মা দুপুরে শুয়ে ভাবছেন,সেই তো গেলো বার যখন দাঙ্গা হলোতখনই তো, সেই যে শেখ সাহেব এলেন একবার,সেই যে গন্ডগোলের মাঝে প্রাণভয়ে ছুটতে ছুটতে,ভেতরে জীবন্ত প্রাণ,সেইতো গেলোবার েভোটে যখন ব্যালটবাক্স ছিনতাই হলো ছেলের আঙ্গুল ধরে ওখানে দাঁড়ানো
সে কি যে ভয়ংকর সময় না গেলো, তখনও তুতুল হয় নি, এই তো সেদিনের কথা, ছেলে তার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো, মা যাই মাঠে ফুটবল খেলা দেখি, ওপাড়ার সাথে খেলা টুটুল ভাই যাচ্ছে, যাই--
এই তোসেদিন দুলে দুলে হাট্টিমাটিম টিম আমপাতা জোড়াজোড়া ছেলে কূপির আলোতে পড়ছে, কিছুই তো অসম্পূর্ন নয়,
ঐ উঠানের কোনে আমগাছ, ঝড়ে ছেলের কি ছোটাছুটি, আম কুড়ানো,শিল কুড়ানো খেলা,
এই তো সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর জ্বরের প্রলাপ, বাবু না এমন করিস না গুলতিটা দে, দ্যাখ না ঘুঘুটা ক্যামোন ডাকছে, মারিস না, না মারিস না- মা মা ও মা পানি দাও
এই তো সেদিন গাছ থেকে পরে ---
দুপুরে ভাবনা এলোমেলো, কাক ডাকছে, তুতুল পুতুল খেলছে একমনে বুবুব দোলনায়
গেলোবার ছেলে এসে বায়না ধরেছিলো, মা একটু নাড়ু করে দাও হোস্টেলে বন্ধুরা আছে---
সব ভাবনা এলোমেলো
দুপুর গড়াচ্ছে বিকেলে
রোদ মরে এলো
মা বিছানা ছেড়ে উঠানে
তুতুল যা তো জলদি কলপাড় থেকে পানি নিয়ে আয়, বুবুন কাঁদছে ওকে কোল দে
ধুমসি মেয়ে এখনও পুূল খেলা গেলো না,গলায় রক্ত উঠিয়ে ডাকছি মেয়ের যদি সাড়া থাকে সারাদিন পুতুল আর পুতুল, দাড়া মুখপুড়ি তোর পুতুল খেলা বার করছি, ও তুতুল, তুতুল---
বাইরে সন্ধ্যার শেষ আলো বাবা ফিরছেন
আজ বকুলের জন্ম দিন
বাবা মা আজকের জন্য কিছুটা কান্না জমিয়ে রেখেছেন
শেষ রাতে যখন চাঁদ ডুবে যাবে
যখন তক্ষক তীক্ষ স্বরে প্রহর জানাবে
শুরু হবে বকুলের গল্প
বকুল ঘুমিয়ে আছে
কবরের ঢিবিতে দূব্বাঘাস
দু একটা শিশির ঝড়বে আজ
বাবা মা'র কান্নার মতো দু একটা শিশির
বকুল তুমি ঘুমাও
তুতুল বুবুন সোনা ঘুমাও
বাবা মা আজ সারারাতের জন্য কান্না জমিয়ে রেখেছেন
বকুল তুমি শুনতে পারছো?
ছোট্ট চায়ের দোকান
ঠাকুমার রূপকথা ঝুলি ভরে নাও এই রূপকথা
আমাদের বকুলের গল্প
রাস্তার রঙ্গিন কাঁচ, মার্বেল তোমরাও শোনো
বকুলকে জানিও আমি এই সভ্যতার বিপক্ষে কিছুই করতে পারি নি,
এই এলোমেলো লেখায় আমি যতটা বলেছি তা বকুলের গল্প নয়, বকুলের গল্প বকুল বলতো
ছোট্ট মাথা দুলিয়ে চমৎকার বলতো
বুঝলে ভাইয়া,এ্যাই তুমি শুনছও না, তারপর ডালিম কুমার...... না আর বলবো না বকুল রাগ করে উঠে যেতো
এখন বকুল নেই
আমি বকুলের গল্প বলতে চাই নি, আমি শুধু কবিতা লিখতে চেয়েছি,তবুও এমন দিন
সব ভাবনা এলোমেলো আজ
ম্রিয়মান বেদনা বিধুর
বিষাদের বিহবল সূর
আজ বকুলের জন্মদিন
কবি অস্পষ্ট শরীরটা তুলে ফিরে যাচ্ছেন, ঘরের বাতি নিভিয়ে
বকুল ও তার গল্প কবিতার খাতায় মুড়ে রেখে
কবি যেতে যেতে ভাবছেন
আসলে কবিতার শুরুটা.........
*******
অনেক আগের লেখা, তখন সস্তা রোমান্টিকতায় ভরপুর ছিলো মন, রাজনৈতিক যেকোনো মৃতু্যই বিমর্ষ করে ফেলতো, এখন অনেকটা পথ পেড়িয়ে মনে হয় সেসব ভাবুলতার কোনো অর্থই হয় না ******
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০০৬ বিকাল ৩:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



