সাজ্জাদ আসলো সাথে সেই দিনের ট্রেস কপি, অবশ্য এখন কম্পিউটার হওয়ার সুবিধা হয়েছে আগে থেকেই পেজ সেটাপ করা যায়, আগের মতো সাবধানী না হলেও চলে। সেই কম্পিউটার কপিতে আলতো চোখ বুলাচ্ছে আন্দালিফ, আজকের লিড নিউজ কি হবে এটা নিয়ে মত ভেদ নেই কারো, দুই পীরের মুরিদদের মারামারি সেকেন্ড লীড নিউজ হবে না নীচের দিকে যাবে এ বিষয়টা নিয়ে মতামত চলতেই পারে, পীরের মুরিদের ভেতরে মারামারি এমন নগুরুত্বপূর্ন ইসু্য না যে ওটাকে সেকেন্ড লিড করা যায়, এর পরও বড় ফন্টে সেকেন্ড লিড হিসাবে যাচ্ছে এই খবরটা, রিপোর্ট লিখছে শাহরিয়ার পিন্টু, ছেলেটা একটু বামঘেঁষা, তবে ভালো, ভাষাটা সামান্য কড়া হয়েছে, আমাদের পাঠক এমন ভাষায় অভ্যস্ত নয়, আরও একটু মোলায়েম ভাবে বলতে পারো কথাগুলো, সামান্য সংশোধন করতে হবে, তুমি চলে আসো, আন্দালিফ পিন্টুকে মোবাইলে নির্দেশ দিয়ে প্রবালের হাত থেকে ছবির প্যাকেট নিয়ে ছবি বাছাই করতে চেষ্টা করে।
একদল মানুষ যাদের মাথায় গ্রামীন চেকের গামছা বাঁধা, একদলের মাথায় গামছা সাদা সবুজ অন্য দলের লাল সাদা, এই পার্থক্য দেখেই ঠিক করতে হচ্ছে কে কোন পীরের মুরিদ, বাংলাদেশ আশ্চর্য এক দেশ, যেখানে ধর্মগ্রন্থের সহযোগী হিসাবে আছে পীর মোল্লারা, ট্রাফিক লাইটের নীচে দাড়িয়ে থাকা ট্রাফিক পুলিশ আছে, কেউ নিয়ম মানতে চায় না, তাদের লাইনে আনার জন্য একটা রাখাল লাগে, ধর্মের রাখাল পীর মোল্লা আর সব গরু ছাগল মুরিদের দল গুতাগুতি করছে , এটা কোন ধর্মে সমর্থন করে? কোন ধর্ম স্বজাতির রক্ত চায়, সবাইতো মানুষকে ভালোবাসার কথা বলে, সবাই তো মানুষকে ভালো ভাবে চলার নির্দেশ দেয়, বলে অন্যায় না করতে, এই রাখাল সাহেবেরাও গ্রন্থমোতাবেক এমন নির্দেশ দেওয়ার কথা, তাহলে কেনো এই সংঘাত?
একদল বুনো মানুষ যাদের পরনে পাঞ্জাবি, বেশ দাড়ি আছে, আর মাথায় পাগরি, সেই পাগরির পেছনে ল্যাজও আছে, তারা গজারির লাঠি নিয়ে একে অন্যের উপরে ঝাপিয়ে পড়ছে, বাংলাদেশের রাজপথে, দেশের প্রধান মসজিদের সামনে, ধর্ম অন্ধ, ধর্ম মানুষ চিনে না অনুসারি চিনে, মানুষ ধর্মকে উপাসনালয়ে বন্দি করার সাথে সাথে ধর্মের সার্বজনীন রূপটা হত্যা করা হয়েছে।
একটা মানুষ রক্তাক্ত পড়ে আছে মাটিতে, তার উপরে আরও একটা মানুষ চোখে জান্তব ঘৃনা গজারির লাঠিটা উদ্যত, যেকোনো মুহুর্তে নেমে আসবে, মাটিতে পড়ে থাকা লোকটার চোখে ভয়, চোখ বড় বড় হয়ে আছে, ঘামে ভেজা চুল লেপ্টে আছে কপালে, দাড়ি ভেজা ঘামে, রক্ত জমে আছে, শাদা পাঞ্জাবির জায়গায় জায়গায় লাল, একটা ভয়ংকর ভবিষ্যতবানী লুকানো এই ছবিটায়, মানুষের অসহিষ্ণুতা আর নির্মমতার জান্তব দলিল এই ছবি। যেকোনো মানুষ ঘুম ভেঙে উঠে এই ছবি দেখলে আঁতকে উঠবে, এ ছবি প্রকাশ করা অনুচিত হবে, তার চেয়ে অন্য ছবিগুলো যেগুলোতে এমন রক্তাক্ত সহিংসতা স্পষ্ট নয় তা বাছাই করে দেওয়া যায়। ছবিগুলো দেখছে আর নিজের ভেতরে শিউরে উঠছে আন্দালিফ, মানুষের ভেতরে এই পশু বাস করে, যার নিয়ন্ত্রন মানুষ করতে পারে না। মানুষকে পরাস্ত করে গনমানুষের নির্মমতার পাশবিকতা প্রতিদিন সামনে আসছে।ক'দিন আগে মতিঝিলে 3 ছিনতাইকারিকে ধরে মানুষ পেট্রল জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারলো। নবাবপুরে ব্যাবসায়ীরা মিলে একজন চাঁদাবাজকে পিটিয়ে মেরে ফেললো- এমন অস্থির সময় যাচ্ছে কেনো ইদানিং, ধর্ম যখন মানুষের ভেতরের সৌম ভাবটা কেড়ে নিয়ে যায়, মানুষের ভেতরের কোমল অনুভূতিকে হত্যা করে তখন সেই ধর্মের চেয়ে ভয়ানক অন্য কিছু নেই, ওটা ব্রেকহীন ট্রেনের মতো কোনো এক অনিশ্চিতের দিকে যাচ্ছে,
বীভৎসতার দৃশ্যগুলো নউরনের গেঁথে থাকে, সুন্দর দৃশ্যগুলোর জমিন দখল করছে সব কদর্য নির্মম দৃশ্যেরা, স্মৃতির ভেতরেও দুঃস্বপ্নের আগ্রাসন চলে দিবানিশি।
সম্পাদকীয় লিখতে বসে আন্দালিফ, মনের ভেতরের কথাগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার একটা সুযোগ পেয়ে উগড়ে দেয় অসুন্দরের বিরুদ্ধে সবটুকু দ্্বেষ তার।
সাজ্জাদকে পেজ মেকাপ দেখিয়ে আন্দালিফ চায়ের কাপ হাতে পিন্টুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। ঘড়িতে 9টা 20।
অবসর নেই মলিন দিন ছুটে যায় অনন্তে আজ ঘুম থেকে আবার ঘুমের সমস্ত পথ জাগতিক দুঃস্বপ্নের তাড়া খেতে খেতে আমি কোথায় গিয়ে আশ্রয় নিবো, কোথাও ঝর্ণা নেই, রক্তগঙ্গা বয়ে চলে 56 হাজার বর্গমাইল জুড়ে, আমার স্বপ্নের মৃতু্য হয়ে যাওয়ার পরও দুঃস্বপ্নের তাড়া খেয়ে আজ সারা দিন, সারাটা দিন....
কোথায় আশ্রয় নিবে দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীর লেখাটা ভীষনভাবে ভাবায় তাকে। মায়ের সাথে কথা হয়েছিলো কবে, আজ সকালে? না আজ সকালে হয় নি, গতকাল, গত পরশু? মনে করতে পারে না এই মুহূর্তে, পাশাপাশি ঘরে থেকেও আসলে মায়ের উপস্থিতিটাই সান্তনা, মা আছে, নিজের মতোই, বাবার মৃতু্যর পর থেকেই একা, নিজের ভেতরে ডুব দেওয়া একজন মানুষ, বিচ্ছেদের শোক সামলে উঠেছেন তবে আন্দালিফের সাথে সেই কথা না বলা অভিমানটা কাটিয়ে উঠতে পারেন নি হয়তো, বাবার মৃতু্যর দিন আন্দালিফ পিরোজপুরের সরকারি দপ্তরের উপর রিপোর্ট করতে সেখানেই ছিলো, পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য অনেক জায়গায়ই তো যেতে হয়, তবে ভাবতেও পারে নি এমন ভাবে বাবার মৃতু্য হবে, সকালে ঘুম থকে উঠে বুক ব্যাথ্যা, বাথরুম থেকে বের হয়ে বিছানায় পড়লেন, এম্বুলেন্স ডেকে এনে সলিমুল্লাহতে নিয়ে যেতে যেতে সব শেষ, একটা মানুষ অতীত হয়ে গেলেন। বাবার অভাবটা এখনও অনুভুত হয়, রাশভারি ব্যাক্তি ছিলেন তবে তেমন শাসন করেন নি কোনো দিন, তার স্টাডির দেয়ালে টাঙানো বাবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে আন্দালিফ মাঝে মাঝে এখনও বাবার সাথে কথা বলে।বাবার হাতের সাক্ষর আছে যেসব বইতে সেসব নিয়ে মাঝে মাঝে গন্ধ নেয়, মনে হয় বাবার গন্ধ ,বাবার স্নেহের গন্ধ লেগে আছে, আসলে মানুষ বড় হয়েও বাবার অনুকরন করে যায় অবচেতনে, সবাই ছেলেই বাবা হয়ে উঠতে চায়, বাবার জায়গাটা ছোঁয়া যায় না, বাবা দিন দিন আরও দুরাগম্য একটা তীর্থের মতো হয়ে যান, আন্দালিফ অবশ্য ইদানিং নিজের ভেতরের পরিবর্তনটা উপভোগ করছে, ছেলে থেকে বাবাতে রূপান্তরিত হওয়ার সবকটা দিন নিজেকে প্রস্তুত করার চেষ্টা, তার সন্তান আসছে, সামনের নভেম্বর।
সাইদ দরজাটা বন্ধ করে দিও, পিন্টু আসে নি এখনও, আর অপেক্ষা করা চেল না, ঘড়িতে 9টা বেজে 40, আর একটু দেরী হলে শাহবাগের দোকানগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। যদি প্রেম দিলে না প্রাণে.... গুনগুন করতে করতে সিঁড়ি ভাঙে আন্দালিফ। নীলার জন্য ফুল নিতে হবে, এক গোছা বেলী ফুলের মালা, কিংবা অন্য কোনো তোড়া, যা প্রথম দেখায় ভালো লাগবে।
শাহবাগ মোড় যাবে? দরদাম না করেই রিকশায় উঠে বসলো আন্দালিফ।
মালঞ্চে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘড়িতে বাজে 9টা 55, ঝাঁপ লাগিয়ে দেওয়ার সময় কর্মচারিকে ঠেলে আন্দালিফ মালঞ্চতে ঢুকে সামনের সোকেসে রাখা তোড়াটা দিতে বললো। চমৎকার কম্বিনেশন, ফিকে হলুদ আর কোমল গোলাপী বর্ডারের মাঝে নীল অপরাজিতা উজ্জল ফুটে আছে। সারাদিনের সব যুদ্ধের স্মৃতি নিমেষে মন থেকে মুছে যায়, সুখী মানুষের মতো রাস্তায় নামে আন্দালিফ। ঘরে ফিরছে সে, নীলার কাছে, মায়ের কাছাকাছি ফিরে যাচ্ছে সে।
আজিজের সামনে আবছা অন্ধকারে একজন ইঞ্জেকশন নিচ্ছে, তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে আরও কয়েকজন, কে হতে পারে, পরিচিত কোনো লেখক, লিটল ম্যাগাজিনের কবি, অথবা যেকোনো কেউ, ইদানিং কবিদের নেশার স্বভাবটা পাকাপোক্ত হয়েছে, কারণ বারি কিংবা গাঁজা কিংবা কোনো একটা নেশা না থাকলে না কি কাব্য দেবী ইদানিং নৌকা ভেড়াচ্ছেন না কোথাও, তার প্রসাদ লাগে, উঠতি কবিরা কবিতার অনুষঙ্গ হিসেবে নেশা করে, আর বিখ্যাত কিছু হতে হতে একেবারে আডিক্টেড হয়ে যায়। না কি সবারই ভেতরে কিছু ইনহিবিশন কাজ করে, জড়তা, নেশার সাহায্যে সেই জড়তাটা অতিক্রমের চেষ্টা, ভেতরের ক্ষোভকে প্রকাশ করে দেওয়া, ভেতরের চেপে রাখা ক্ষতগুলোকে উন্মুক্ত করা, সামাজিক জড়তার বিরুদ্ধে একমাত্র উদ্দিপক হয়তো। সচেতন নির্মান বলা যায় না, অনেক কবিতাই ঠিক কবিতা হয়ে উঠছে না, তবে এই অনুষঙ্গটাকেই প্রধান মেনে নিয়ে জীবন যাপন করছে কেউ কেউ, নেশারও উপলক্ষ্য লাগে, কোনো শৈল্পিক আবরনে জড়ালে হয়তো অশৈল্পিক জীবনযাপেেনর যন্ত্রনাটা সহনীয় হয়ে উঠে, আন্দালিফের রাস্তা ভালোবাসায় মোড়া, সামনে বামে থামাও, চেয়ে দেখলো রিকশাওয়ালার বয়েস 50 এর কাছাকাছি, অবশ্য অবলীলায় রিকশাওয়ালাদের তুমি বলা চলে, শ্রেনী বৈষম্যের স্পষ্ট প্রকাশ, আমি তোমার পেটে অন্ন জোগাই, আমি তোমাকে নাম ধরে ডাকতে পারি অনায়াসে।
না ফেরত দিতে হবে না ভাঙতি, রাখেন আপনি, নিজের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে চায় এই বাড়তি 3টাকা দিয়ে, তার সন্তান এসব ক্ষুদ্্রতা শিখে বড় হবে না, মানুষকে মানুষ হিসেবে স্ব ীকৃতি দিতে শিখবে। এমন উচ্চাশা নিয়ে কলিংবেলে হাত রাখলো আন্দালিফ।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


