মুখোমুখি বসে থাকে তিনজন রমনি, তাদের বিষাদগ্রস্থ স্বর কিংবা স্থবিরতা নু্যজ্ব করে ফেলে আমাকে, বহুদিনের পুরোনো এলব্যাম খুলে ছবি দেখলে যেমন লাগে, হলদে হয়ে আসা কাগজের মতো বিষন্ন গোধুলির আলোতে তাদের ভেতরের হাহাকার আমার ভেতরে প্রবেশ করে, পেছনের নিস্ফলা জমিন যেভাবে তাদের উর্বরতার অতীতকে প্রকাশ করে তেমন স্পষ্ট আর কিছুই হতে পারতো না।
ছবিটা তুলেছিলাম গেলোবার গোবিন্দপুরের মেলায় যাওয়ার পথে, মেঠো পথে হাটছিলাম, হালকা শীত ছিলো, পুল ওভারটা ঠিকমতো জড়িয়ে নিচে নেমে আসা ব্লান সূর্যটাকে দেখছিলাম, তখনই পশ্চিমে তাকিয়ে দেখলাম তিনজন বিগতাযৌবনা বসে আছে, কাঁধের ব্যাগ থেকে ক্যামেরাটা নিয়েই ছবি তোলা শুরু করলাম অনুমতির অপেক্ষা না করেই, হালকা কুয়াশা ছিলো, তাই বিকেলের ফিকে হলুদ আস্তরনটা ঠিকই জমে গেলো ছবির গায়ে, আর সেই রমনীদের চোখে কোনো উজ্জ্বলতা ছিলো না, ঝিকিমিকি চোখ, যেমনটা থাকে সদ্যকৌশোরের সে ঝিলিক ছিলো না, বরং পোড় খাওয়া স্বপ্নহীন চোখ, যাপিত জীবনের সবটুকু পড়ে নেওয়া যায় এক লহমায়।
ছবিটার ভেতরের বিষন্নতা আমাকে বিবর্ন করে ফেললো।
নিহত স্বপ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যখন অতীতচারি মানুষ হিসেব মেলায় তখন শুধু ভুলগুল প্রধান হয়ে ধরা দেয় চোখে। মনে পড়ে শুচিতার কথা, তারা বোবা দৃষ্টি এখনও আমাকে অপরাধি করে তোলে। আমি সে সময়টাতে বোধ হয় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে নি, এমনটাই মনে হয় আমার। আরও একটু পরিস্কার করে বললে ভালো হতো, যে স্বপ্নটা আমাকে নিয়ে দেখেছিলো সে তা পূরণের সামর্থ্য আমার ছিলো না এমন নয় তবে সেই আগ্রহ ছিলো না। আমার কখনই সেভাবে শুচিতাকে নিজের বলে মনে হয় নি, সে আমার ঠিক প্রেমিকা ছিলো না, পরিচিতা,কাছের বান্ধবি বলা যেতো, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ঘনিষ্ঠতার মতো, যার কোনো পরিনতি নেই, কিংবা সেটা বয়সোচিত উচ্ছলতা, ঠিক প্রেম নয়,
তাই শুচিতা যখন এসে বললো তার বিয়ে আমি যেনো কিছু একটা করি, কি করনীয় আমার ভেবে পাই নি, আসন্ন বিবাহিত জীবনের শুভ কামনা, ভালো থাকো, সুখি হও জাতিয় ক্লিশে শব্দগুলো এবং তাদের উপযুক্ত ব্যাবহার বিধি নিয়ে চিন্তিত আমি ফ্যাকাশেশাসি দিয়ে বলেছিলাম, খুব ভালো লাগলো। কবে? কার সাথে? পাত্র কি করে?
শুচিতার চোখের কোণের মিনতিকে অগ্রাহ্য করেই হাসি মুখে বললাম কংগ্রাচুলেশন, খালাম্মা নিশ্চই খুব খুশী।কাকে কাকে দাওয়াত দিবি ঠিক করেছিস?
আমার এই আকস্মিক সম্বোধন বদলের পরও তার চোখে কোনো প্রশ্ন ভেসে উঠে নি, বরং চোখের জোত্যি যেনো মরে গেলো এক মুহূর্তে। ঠিক সেরকমই ভবলেশহীন চোখগুলো দেখে আবার আমার শুচিতার কথা মনে পড়লো, মনে পড়লো আমার বিগত জীবনের পাপগুলো।
নীলা সুন্দর করে সেজেছে আজকে। ডাক্তারের ওখানে গেলাম, আলট্রাসনো করে বললো ভালোই আছে সন্তান, আপন সন্তানের গর্বে নীলা আরও একটু ভরাট সুন্দরি হয়ে গেলো। খুব সুন্দর লাগছিলো ওকে আজ। আসলে শুচিতাকে দেখলাম আজ রিকশায় ফেরার পথে,হাইকোর্টের সামনে থেকে কি যেনো কিনছিলো। হয়তো ওর ছেলে শিশু একাডেমিতে কিছু করতে এসেছে, সেই অবসরে শুচিতা একটু ঘুরে দেখছিলো ঘর সাজানোর উপকরন, আমার অপরাধ বোধ এবং ক্ষীন গর্ব এবং করুনাবোধ একটা দৃশ্য তৈরি করেছে, সেখানে শুচিতার সুন্দর সংসার, হাস্যোজ্জল সন্তান, পরিপাটি গৃহকোণ আর শুচিতা একটু মুটিয়ে গেছে সুখী মানুষের যেমন সামান্য মেদ জমে এ মেদ সুখে মেদ।
আমার ভিষন ইর্ষা হতো এই কল্পনায়, মনে হতো, সেই মানুষটা আমিও হতে পারতাম, শুধু যদি হ্যাঁ বলতে পারতাম একবার। তবে আজ শুচিতাকে দেখে সেই কল্পনাও ভেঙে গেলো। তার হাঁটার ভেতরে সেই সজীবতা নেই, সেই 8 বছর আগের শুচিতাকে খুঁজে পাওয়া গেলো না, হাসির দু্যতি ছড়িয়ে যে শুচিতা বলতো চলো আজকে সবাই মিলে কোথাও যাই, কোনো এক জায়গায় এই একই রকম রাস্তা দেখে, একই রকম মানুষ দেখে তোমাদের কি একটুও বিরক্ত লাগে না-
ওর স্বভাবই ছিলো এমন, কাউকেই তুই বলতো না, সবার সাথেই একটা দুরত্ব রেখে দিতো, অলংঘনীয় সেই দুরত্ব অতিক্রম করে কেউ ওকে কখনই তুই বলে নি, সবার সাথেই তার তুমি তুমি সম্পর্ক ছিলো। বজলুল ওকে ভালোবাসতো, খুব ভালোবাসতো তবে কখনও প্রকাশ করে নি সরাসরি। বিজের দীনতা নিয়ে আড্ডার এক কোনে বসে থাকতো, আর তার এই দীনতার সুযোগে সবাই বিভিন্ন ফরমায়েশ করতো ওকে। এই চায়ের কথা বলে আয়, এই সিগারেট নিয়ে না দোস্ত। আমরা সচেতন ভাবেই এই সামাজিক স্তরবিন্যাসগুলো মেনে নিয়েই সম্পর্কের সম্বোধনগুলো নির্দিষ্ট করে রাখি।
বজলুল অবশ্য হাসি-খুশী ছিলো, অন্য সবার মাঝে তার উপরেই টুকিটাকি ফরমায়েশের পরিমানটা বেশী এটা বুঝতেও পারতো না হয়তো। কিংবা হয়তো এটাকেই স্বাভাবিক মেনে নিয়েছিলো। যেকোনো কারনেই হোক বজলুল শুচিতাকে প্রস্তাব দেওয়ার সাহসটা করে উঠতে পারে নি।
আজ শুচিতাকে দেখে তার বিষন্নতা দেখে একটু শান্তি পেলাম, এত দিনের অপরাধবোধের সাথে এই শান্তিবোধটা যায় না, মানুষের মন বিচিত্র, নিজের কতৃত্ব চায়, তাই যদি শুচিতাকে সুখী দেখতাম ভেতরে ভেতরে ইর্ষায় পুড়তাম। তা হলো না, বরং শুচিতা একটু কষ্টে আছে এই বিষয়টা আমাকে আনন্দিত করে তুলে। মনে মনে কল্পনার জাল বুনি, যদি কখনও শুচিতার সাথে দেখা হয়ে যায় তাহলে তার সাথে কি ভাবে কথা হবে, কি কি কথাভবে তাও ভাবলাম।
ছবিটা টাঙানো আছে ড্রইং রুমের দেয়ালে। পুরস্কার পেয়েছিলো দৃকের প্রদর্শনীতে, সাদা কালো টোন আনতে চেয়েছিলো ছবিটাতে পরে অবশ্য আর কিছু বদল করে নি, সেই বিষন্ন হলুদ রংয়ের সাথে খুব সুন্দর ছিলে পেছনে মেটে রং জমিন,
নাম দিয়েছিলো "অস্তমিত আলোকে তারা জীবনের গল্প বলে যায়।"
মা দাঁড়িয়ে ছিলেন দরজার কাছে, উদ্্বিগ্ন মুখে, বললেন কি রে সব ঠিকঠাক আছে।
বললাম ডাক্তার বলছে সব ঠিকঠাক আছে।
শুনে মায়ের মুখটা উজ্জল হয়ে গেলো, তিনি নীলার হাত ধরে বললেন, বলেছিলামতো সব ঠিক আছে, এখন বিশ্বাস হলো তো আমার কথা। বোকা মেয়ে,
আমার দিকে ফিরে বললেন যা হাত মুখ ধুয়ে নে, টেবিলে নাস্তা দিচ্ছি। হঠাৎ করেই মনে হলো ঘটনা 10 বছর পিছিয়ে গিয়েছে কোনো এক যাদুমন্ত্রে, যা হাত মুখ ধুয়ে টেবিলে বস নাস্তা দিচ্ছি এমন কথা বোধ হয় সেই সময়েই বলতো মা।
আজ অনেক দিন পর মায়ের কথা শুনে মনে হলো কিছু কিছু সম্পর্ক কখনই পুরোনো হয়ে যায় না, কোনো মলিনতা আসে না। নীলা বললো ও কিছু খাবে না, ওর ভালো লাগছে না,
আমি ঠিকই বসে থাকলাম টেবিলে, মা ওকে ধরে নিয়ে গেলেন বাথরুমে, তার পর ওকে শোবার ঘরে রেখে মুখোমুখি বসলেন আমার-
আমার ভেতরটা ক্যামোন করছিলো তা বলে বোঝানো যাবে না। আমি নিজেও বেশ উদ্্বিগ্ন ছিলাম, আজ ডাক্তারের কথায় প্রাণ ফিরে পেয়েছি বলা যায়।আর কয়দিন পর নাকি স্পষ্ট মুখ দেখা যাবে। অবশ্য আমার এত কিছুর ইচ্ছা নেই, ঠিক মতো সুস্থ থাকলেই আমি খুশী।
অনেক দিন ছুটি পাওনা আছে, ভাবছি এই সপ্তাহ ছুটি নিয়ে বাসায় থাকবো। কোনো যোগাযোগ নেই কারো সাথে।নিললাকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে গেলেও হয়, অবশ্য নীলার সায় পাওয়া যাবে এমনটা মনে হয় না।
তুই কি কোনো নাম ঠিক করেছিস?
মায়ের প্রশ্নটা শুনে মনে হলো আসলেই নাম কি হবে তা এখনও ভাবি নি, কি নাম দেওয়া যায়, একটা যেনোতেনো নাম দিয়ে দিলে হবে না, নাম নিয়ে আসলেই ভাবা দরকার। রবিন্দ্রনাথ থাকলে কোনো সমস্যাই ছিলো না, গিয়ে বলতাম কবিগুরু একটা নাম দিয়ে দেন, তিনি সুন্দর একটা কবিতা লিখে দিতেন নাম সহ সেই কবিতা দিয়ে আকিকা করে ফেলতাম। এর পর সেই কবিতা বাঁধিয়ে রাখতাম ড্রইং রুমের দেয়ালে। অবশ্য হাফিজকে বলা যায়, ওর ছেলে মেয়ের নামগুলো খুব সুন্দর রেখেছে, একটা সুন্দর নামের জন্য হাফিজকে বলতেই হবে।
কি রে উত্তর দিচ্ছিস না ক্যানো? তোর স্বভাব বদলাবে না, বাপ হচ্ছিস একটু চটপটে হ, আর কতদিন বাচ্চা থাকবি?
মায়ের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয় নাই, কি সর্বনাশ? বললাম ঠিক করে ফেলবো, এখনও সময় আছে।
যা ভালো বুঝিস কর, আর সামনের শুক্রবার বাসায় থাকবি, মনে আছে তো?
আমি আসলে বুঝি নি ক্যানো আগামি শুক্রবার আমাকে বাসায় থাকতে হবে, বললান হ্যাঁ মনে আছে, থাকবো।
মায়ের সন্দেহ যায় নাই তা পরবর্তি প্রশ্নেই বুঝলাম, কি মনে আছে, খবর দিছিস এতিমখানায়?
ও সামনে15ই মে, বাবার মৃতু্য দিবস, একটা বছর চলে গেলো দেখতে দেখতে। ও দিন শুক্রবার নাকি, মনেই ছিলো না, ভাগ্যিস মা মনে করিয়ে দিলো।
নাহ কালকে সকালে দিবো, একটু আসি মা,
শোবার ঘরের বিছানায় নীলা শুয়ে আছে, তার চোখের নীচে সামান্য কালচে দাগটা মুখের উজ্জলতা বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুন, এখন নীলাকে দেখলে সুখি, পরিতৃপ্ত মনে হয়।ডাক্তার ঠিক মতো খেতে বলেছে, ওজন নিতে বলেছে, প্রতি মাসে অন্তত 2 পাউন্ড করে না বাড়লে বুঝতে হবে শরীরে পুষ্টির অভাব, নিয়ম করে খেতে হবে, তার একটা ফর্দ দিয়েছে, আবার দেখাতে যেতে হবে 2 মাস পর।
একটা জীবনের কত আয়োজন, অথচ কত মানুষ কোনো রকম আয়োজন ছাড়াই আসে, এখানে কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে, খোয়া ভাঙে একদল মানুষ, তাদের ভেতরে একজন গর্ভবতি মহিলাও আছে, তার ক্লান্ত শরীর আর ফুলে ওঠা পেট, তার শীর্ন শরীর, মাকে শোষন করে বেড়ে উঠছে সন্তান। অথচ তাদের জন্য পুষ্ঠির ব্যাবস্থা করা উচিত ছিলো না রাষ্ট্রের? আমরা নিজেরাই বা কি করছি? কতটুকু করছি। এই করুনাবোধটুকুই আমাদের সান্তনা, একটা সহমর্মিতার মুখোশ ঝুলিয়ে আমরা রাস্তা হাঁটি, রাষ্টার দুপাশের অমানবিকতা দেখে করুন রস তৈরি হয় ভেতরে, আর দৃশ্যপট বদলের সাথে সাথে আমাদের ভাবনা বদলায়, এই প্রজন্মকে কে যেনো বলেছিলো ওদের ভাবনা আর রুচি বদলায় ঘনঘন। এটাই ফাস্টফুড কালচার, আজ যা হাল ফ্যাশানের আগামি কাল তা বাতিল। আমাদের ভাবনাও ইদানিং ফাস্টফুড কালচারের গ্রহনে নষ্ট বলা যায়। খোয়া ভাঙা মাহিলাকে দেখে যা ভাবনাটা জন্মায় ভেতরে তা বদলে যায় রাস্তার মোড় ঘুরলেই, তখন এই গরম যেতে না চাওয়া রিকশা ওয়ালাকে জাতশত্রু মনে হয়, আর রিকশা চেপে জ্যামে আটকালে মনে হয় সব বাস দেশের শত্রু, আর সেই সব এড়িয়ে যখনই উঁচু উঁচু বাড়ীর সারির পাশ দিয়ে যাই মনে হয় কোন দিন ঢাকা ডুবে যাবে অট্টালিকার চাপে। সমস্ত শহরটাই একদিন হুড়মুড় ভেঙে ডুবে মাটির গভীরে।
আমরা ভাবনা নিয়ন্ত্রন করতে শিখি নি। ইদানিং ভালো সব কিছুর ভেতরেই হতাশা আর বিষন্নতা খুঁঝে পাচ্ছি, এটা কি বয়েসের দোষ?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


