তাকে মেরে ফেলানোই বাস্তবসম্মত তবে প্রতিবাদী এই তামাটে মানুষটাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিতে আন্দালিফ হাসনাইনের বেশ কয়েকদিন সময় নিতে হলো। যদিও এই রাষ্ট্রিয় হত্যাকান্ডে আন্দালিফের কোনো সমর্থন নেই তারপরও এই তামাটে মানুষটার অনিবার্য হত্যায় রাষ্ট্রের সহযোগীতা করাটাই নৈতিক এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে গত সপ্তাহ থেকেই তার মনটা বিষন্ন। তিনি নিরাসক্ত ভাবে ভেবে দেখেছেন, জয়নালের চেতনা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর একটা উপাদান, রাষ্ট্রকাঠামোর ভিতরের গলদ এবং এই গলদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠা যেকোনো মানুষকেই রাষ্ট্র নির্মূল করতে বদ্ধপরিকর, এই চেতনাটা জয়নালের থাকলেও জয়নাল ইচ্ছা করেই এই পথ বেছে নিয়েছে, সে অর্থে জয়নাল অনেক আগেই মৃত, শুধু এই আনুষ্ঠানিকতার জন্য তাকে প্রয়োজন,
তাকে গিয়ে খবরটা দিতে হবে যে রাষ্ট্রবিরোধীতার কারনে তাকে মৃতু্যদন্ড দেওয়া হয়েছে, এবং এই মৃতু্যর সবটা তদারকের দায়িত্ব তার উপরে ন্যাস্ত করেছেন সমাজগুরুরা।
রাষ্ট্র এই অর্থে ভীষন প্রতিশোধপরায়ন একটা সত্ত্বা, যেকোনো বিরুদ্ধমতকে শক্ত হাতে দমন করে, ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চায়, যেনো গর্ভের শিশুও ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে, ভুলেও প্রতিবাদের চিন্তা না করে, এমন ভাবেই রাষ্ট্র প্রচার চালায় তার নৃশংস রূপটাই যে আসল নয়, তারও যে একটা কোমল অনুভূতিশীল মন বিদ্যমান এটা বুঝানোর জন্য রাষ্ট্র প্রতিদিন বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করে, সরকারী প্রেসনোটের উপর জনগনের ভক্তিশ্রদ্ধা আগের মতো না থাকলেও এই রাষ্ট্রের সুবিধাবাদি সব গুলো মানুষই মন্ত্রমুগ্ধের মতো এইসব বানোয়াট কল্পকথায় বিশ্বাস করে। জয়নাল এই বিষয়টা মেনে নিতে অস্ব ীকৃতি জানিয়েছিলো, বরং আরও একটু সৎ এবং সহানুভুতিশীল নেতৃত্ব, আরও একটু জনমূখী রাষ্ট্র চেয়েছিলো সে। চেয়েছিলো জবাবদিহিতা, চেয়েছিলো দায়বদ্ধতা রাষ্ট্রের কাছে, রাষ্ট্র তার নাগরিকের সাথে কি রকম আচরন করবে এই বিষয়ে তার স্পষ্ট এবং বলিষ্ঠ একটা মতামত ছিলো, এবং তার মতের সমর্থনে বেশ কিছু নিবন্ধও লেখা হয়েছিলো দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয়তে, এই জনমত গঠনের প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের প্রশাসন যথারীতি উৎকণ্ঠিত, যেমন শামুক যেকোনো প্রতিকূলতায় নিজের খোলসে নিজেকে আলাদা করে রাখে, তেমন ভাবেই এই রাষ্ট্র এবং এর সহায়ক যন্ত্রগুলো নিজেকে জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলছে , এই খোলসটা ভেঙে ফেলা দরকার এখনই, যেকোনো সচেতন মানুষের এতে অংশগ্রহন করা প্রয়োজন, এটাই মানুষের নৈতিক দায়িত্ব, এসব ছেদোঁ কথা রূপকথা শুনে জনগন রাষ্ট্রবিরোধী হয়ে যেতে পারে, এমন আশংকাও করেছিলো কেউ কেউ। তাই সরকার সমর্থক সব দৈনিকের সম্পাদকেরা এই অর্বাচীনতার বিরুদ্ধের সরব ছিলেন, এমন অপচেষ্টার পিছনে বিরুদ্ধ শক্তির যোগসাযেশ খুঁজে বেশ কিছু রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছিলো,এবং প্রশাসনের ভেতর থেকেও কেউ কেউ এই মতের সপক্ষে মৃদু গুঞ্জন তুলেছিলেন, বস্তুত এই জবাবদিহিতার দাবিটাতে বেশ কিছু সরকারি কর্মকর্তারও সমর্থন ছিলো। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের মনে হলো এটা রাষ্ট্রবিরোধি অপচেষ্টায় রূপান্তরিত হচ্ছে ক্রমাগত। রাষ্ট্র পয়সা দিয়ে প্রতিবাদি মানুষ পোষে, জয়নাল এই বিষয়টার বিপক্ষে বলেছিলো কিছু কথা, বলেছিলো এমন সোহাগের মতো, বেশ্যার নারীর ছলাকলার মতো সরকারের মৃদু সমালোচনা করা পক্ষান্তরে রাষ্ট্রকে দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি দেয়, প্রয়োজন শক্ত সমালোচনা, প্রয়োজন একেবারে রাষ্ট্রের সব নোংরামি প্রকাশ করে দেওয়া, রাষ্ট্র কবে কোথায় কিভাবে নাগরিকের অধিকার নষ্ট করছে, কিভাবে রাষ্ট্র এই সব অপকর্ম করেও একটা সাধু, কোমল রূপ প্রকাশ করছে নিজের এই মুখোশটা খুলে ফেলানো প্রয়োজন, আর সরকারের পয়সার লালিত পালিত কোনোবুদ্ধিজীবিই এই কাজটা করতে ইচ্ছুক নয়,তারা যেকোনো সরকারী দুর্ন ীতির প্রতিবাদে শোভন ভাষায় যা লিখেন তা কখনই সমস্যার মূলে আঘাত করে না, বরং রাষ্ট্রের শৃঙ্গারে উচ্চারিত শীৎকারে বুদ্ধিজীবিদের কলম থেকে প্রতিবাদের বীর্যস্খলন হয়।এইমতের জনপ্রিয়তা, জয়নালের ভাবনা চিন্তা রাষ্ট্রের কাঠামোকে দূর্বল করছে এমন মত সকল রাষ্ট্রের প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য সহযোগিতা পাওয়া সকল মানুষের।
এবং রাষ্ট্র একটা পর্যায়ে সকল প্রতিবাদকে রাষ্ট্রবিরোধী রূপ দেয়, এবং এই প্রতিবাদের অনাবশ্যকতা এবং কিভাবে এই প্রতিবাদ রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে, কেনো এই প্রচেষ্টাকে নির্মূল করা প্রয়োজন এই বিষয়ে রাষ্ট্রের শত শত বানী এবং লিখিত ও অলিখিত সংবিধান রয়েছে। রাষ্ট্র প্রয়োজনে আইনকে দুমড়ে মুচরে ফেলতে পারে, রাষ্ট্র প্রয়োজনের খাতিরে অনেক নির্মম সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে- আপাতত এটাই আন্দালিফের সান্তনা এবং সপক্ষ যুক্তির প্রধান শেকড়,
তামটে মানুষটার মুখ মনে করে আন্দালিফের কোনো করূনা জাগছে না এখন, বরং তার মৃতু্যই তার জন্য অধিক সম্মানের এমনটাই বোধ হচ্ছে তার, এই জয়নালের সাথে গত 6 মাসের অধিকাংশ সময় কেটেছে তার, তিনি তন্ন তনণ করে খুজে দেখেছেন তার এই জয়নাল হয়ে উঠার পেছনের রহস্যকে। যেটুকু সহানুভূতি ছিলো জয়নালের উপর তা শুধুমাত্র একই পটভুমিতে বেড়ে উঠা এই মানুষটার সাথে তার অতীতের ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য বিদ্যমান এইটুকু চিন্তা করে। তারা একই সামাজিক পটভুমি থেকে উঠে এসেছেন, যদিও তাদের বর্তমান ভিন্ন কিন্তু আদতে জয়নালের সাথে অনেক বিষয়েই তার মানসিক মিল বিদ্যমান,
তিনি অবশেষে মোহমুক্ত হন, এখন যেহেতু কোনো করূনা অবশিষ্ঠ নেই জয়নালের প্রতি, এবং যেহেতু সময়টা নিকষ অন্ধকারে ঢাকা রাত ,এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তার বিন্দুমাত্র দ্্বিধা নেই এখন।
বরং এই 6 মাস তিনি তার নিজের পরিবারকে সময় না দিয়ে সারাদিন এই জয়নালকে নিয়ে মেতেছিলেন, কাল সকাল থেকেই এই মত্ততা কেটে যাবে, তিনিও জয়নালের গ্রহন থেকে মুক্ত হয়ে নতুন জীবন খুঁজে নিবেন এমনটা ভাবতেই খানিকটা উল্লাসের কাঁপন অনুভব করেন নিজের ভিতরে।
তিনি দ্্রুত খসরা করতে থাকেন মৃতু্য দৃশ্যটা ঠিক কোন মঞ্চে অভীনিত হবে এটা ভাবেন খানিক ক্ষন, অবশেষে তার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠে,
তিনি খসখস করে উপন্যাসের শেষ পাতাটা লিখে ফেলেন----
খবরে প্রকাশ হয়, গত কাল রাত্রে জয়নালকে নিয়ে অস্ত্রের সন্ধানে বের হয় র্যাবের বিশেষ একটা দল, জয়নালের গোপন আস্তানায় পৌছালে সেখানে ওঁত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা র্যাব কে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে উভয়ের মধ্যে বন্দুক যুদ্ধ হয় এবং ক্রস ফায়ারে পড়ে জয়নালের মৃতু্য হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটা পিস্তল এবং কয়েকটা গুলির খোসা উদ্ধার করেছে।
শোমচৌ, তীরন্দাজ, যদিও জানি এই লেখাটা পড়বে খুব কম মানুষ কিন্তু এই লেখাটা আপনাদের উৎসর্গ করা হলো।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



