আজকের দিনে দান্তের প্রাসঙ্গিকতা.....
"তোমার আর বিয়াত্রিসের মাঝে জ্বলছে ওই আগুনের লেলিহান শিখা। তুমি ঐ আগুন পার করলেই পাবে বিয়াত্রিসের সান্নিধ্য।"- বললেন পূর্বসূরি কবি ভার্জিল। দান্তের শরীর মন থেকে ধুয়ে গেলো সব ক্লান্তি, নরকের বিভীষিকাময় অনুভূতি। পেরিয়ে গেলেন তিনি সেই লেলিহান অগ্নি কুণ্ড যার ওপারে দাড়িয়ে তার কল্পনার নারী "বিয়াত্রিস"।
"Divine Comedy"
দান্তের সৃষ্টি এক অনন্য এক নৈসর্গিক প্রেমের উপখ্যান। "বিয়াত্রিস" ছিল দান্তের স্বপ্নের নারী। যাকে একটি বার খালি দেখেছিলেন উনি। তখন দান্তে "ন" বছরের শেষ দিকে আর "বিয়াত্রিস" "ন" বছরের শুরুতে। ওই একবার চাক্ষুষ দেখেই সারাজীবনের জন্যে প্রেমে পড়েছিলেন দান্তে। তার একটি কথায় বোঝা যায় তার সেই প্রেমের অনুভূতি। যৌবনে তিনি বলেছিলেন, "বিয়াত্রিস" কে নিয়ে তিনি সৃষ্টি করবেন অমর প্রেম কাহিনী যা কোনো রমণীকে নিয়ে কেউ কোনদিন লিখেনি। "কমেডিয়া" বা "ডিভাইন কমেডি" সেই প্রেমের মহাকাব্য।
দান্তে কবি হিসেবে ছিলেন সুক্ষ্ম ও নরম অনুভূতির মানুষ। কিন্তু বাস্তবিক ভাবে তিনি ছিলেন এক দৃঢ় চরিত্র, রাজনৈতিক ভাবে একরোখা ও আপোষ হীন এক ব্যক্তিত্ব। তার রাজনৈতিক বিশ্বাস ছিল "পৃথিবী যদি এক শাসকের শাসনাধীন থাকে তবেই পৃথিবীর শান্তি ও উন্নতি অব্যাহত থাকবে।" তিনি ধর্মপরায়ণ হলেও ছিলেন চরম ভাবে পোপ বিরোধী। কারণ, তিনি দেখেছিলেন পোপের অধীনস্থ সম্রাটরা আসলে পোপের ভৃত্য এবং যার মধ্যে দিয়ে পোপের আরোপিত ধর্ম ও সংস্কারই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রবল পোপ বিরোধিতা, পোপের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অংশ গ্রহণ তাকে তৎকালীন "গেলফ" বা "পোপ পন্থী" দের প্রবল বিরোধিতার মুখোমুখি করেদেয়।
দান্তে ছিলেন "ঘিবেলিন" দলের। সেই সময় ফ্রান্সের রাজনীতিতে ঘিবেলিন ও গেলফ এই দুই দলের মধ্যে লেগে থাকতো রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। গেলফ - রা ছিল পোপ পন্থী আর ঘিবেলিন রা পোপ বিরোধী।
তিনি "কম্পালাদনো" যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এই পোপ বিরোধিতা থেকেই এবং তারই মাঝে তার জীবনের সবচে মর্মান্তিক ও নৈরাশ্যজনক সংবাদ আসে। আর সেটা হল "বিয়াত্রিসের" মৃত্যু। মাত্র পঁচিশ বছর বয়েসে এই ফরাসি সুন্দরী ও অভিজাত রমণীর মৃত্যু হয়।
যুদ্ধের বীভৎসতা, রক্ত, শরীরের ক্ষত তাকে যে আঘাত দিতে পারেনি সেই আঘাত বহন করে আনে বিয়াত্রিসের মৃত্যু সংবাদ। এই আঘাতে শোকের মেঘলা আকাশে তিনি দেখেন "বিয়াত্রিস" কে। তার থেকেই তিনি রচনা করেন তার অমর গীতি কবিতা গুচ্ছ " ভিটা নোভা" ( নবজীবন) যা ডিভাইন কমেডির প্রথম ধাপ। এক অপূর্ব প্রেমাখ্যান - তার ও তার কল্পনার নারীর।
কিন্তু অদ্ভুত ভাবে দান্তে ছিলেন কঠোর বাস্তব বাদী। তার কল্পনার প্রেম কখনো তার বাস্তবের বৈবাহিক জীবনের মধ্যে থাবা বসায় নি। "বিয়াত্রিসের" সাথে তার প্রেম তার জীবনে এক কল্পনার নৈসর্গিক দৃশ্য হলেও তার স্ত্রী "গিম্মা ভোনাতি" ছিলেন তার পাঁচ সন্তানের জননী। এবং তিনি মনে করতেন বিয়াত্রিসের ঐশ্বরিক প্রেমের ক্ষতের মলম তার স্ত্রী। তিনি কখনো বিয়াত্রিসকে তার প্রাত্যহিক জীবনে কামনা করেননি। তার বাস্তব জীবনে তার প্রেম ছিলেন গিম্মা ভোনাতি। আর এই ঐশ্বরিক ও বাস্তবিক প্রেমের কাব্য কথাই হল "ভিটা নোভা"।
প্রবল পোপ বিরোধিতার ফলে জীবনের প্রায় কুড়ি বছর তাকে পালিয়ে কাটাতে হয় ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে। সেই সময় বহু প্রস্তাব আসে তার কাছে মাথা নত করার, পোপের সামনে কিন্তু তিনি ছিলেন অবিচল।
সেই পলাতক অবস্থার মধ্যেই তিনি সৃষ্টি করেন এই বিখ্যাত " কমিডিয়া" কাব্য কথা। যার মধ্যে যেমন "বিয়াত্রিস" লুকিয়ে আছে তেমনি আছে তৎকালীন রাজনীতি, সাহিত্য ও নাগরিকের পরাধীনতা, সামাজিক অরাজকতার কথা - বিভিন্ন রূপকে।
১৩২৪ খ্রিস্টাব্দে অসামান্য ব্যক্তিত্ব দান্তে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মৃত্যুর বহু বছর পরে তাকে সম্মানিত করে ফ্লোরেন্স। তার সম্পর্কে বক্তৃতা করার জন্যে নিযুক্ত করা হয় ইতালির গদ্য সাহিত্যের জনক "বোকাচ্চিয়" কে। তিনিই কমেডিয়া'র নামকরণ করেন "ডিভাইন কমেডি" - দান্তের স্বপ্নের সৃষ্টির সম্মানার্থে।
আজ এই দুর্দিনে কেন আমি দান্তের কথা লিখছি? কারণ, সেই ১৩০০ শতাব্দীতেই তিনি উপ্লব্ধি করেছিলেন কবি ও সাহিত্যিকদের কোনো অশুভ শক্তির কাছে মাথা নত না করে সত্যকে তুলে ধরা কর্তব্য।
তিনি ছিলেন আপোষ হীন। অন্তত তিনবার তার অনুপস্থিতিতে বিচার হয় পোপের শাসনে। একবার তার প্রতি রায় ঘোষণা করা হয় তাকে জরিমানা দিতে হবে এবং নতজানু হয়ে পোপের ক্ষমতা মেনে নিতে হবে। দান্তে দৃপ্ত ভাবে জানিয়ে ছিলেন-
"নিজের জন্ম ভূমিতে আমি সসম্মানে প্রবেশ করতে চাই। নচেৎ প্রয়োজন নেই। পৃথিবীর যেকোন অংশ থেকে আমি সূর্য এবং নক্ষত্র মন্ডলীর দিকে দৃষ্টিপাত করতে পারবো, দর্শনের মধুরতম দিক ও সত্য গুলো হৃদয়ে ধারণ করতে পারবো।"
আজ এই দুর্দিনে আমাদের দেশের ৯৮% কবি সাহিত্যিক, লেখক, বুদ্ধিজীবীদের ক্ষমতাসীনদের পদলেহন দেখে করুণা হয়...
তাই স্মরণ করি দান্তের কবি সত্ত্বাকে, তার বিশ্বাসের প্রতি অনমনীয়তাকে, তার প্রেম এবং বাস্তব বোধের প্রজ্ঞাকে।
( তথ্যঃ দান্তে উইকিপিডিয়া এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর "পায়ের তলায় সর্ষে" গ্রন্থ)
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ সকাল ৭:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



