somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্মাইল প্লিজ, স্মাইল....

১৫ ই অক্টোবর, ২০২১ সকাল ৯:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

স্মাইল প্লিজ, স্মাইল....

একদা ক্যামেরা ম্যানের কমন ডায়লগ ছিলো 'স্মাইল প্লিজ'! সেটা আমার ছেলে বেলার কথা। আমাদের বৃহত্তর যৌথ পরিবারে বেশ কয়েকটি ক্যামেরা ছিলো। সব থেকে পুরনো ক্যামেরাটার মালিক ছিলেন বড়ো চাচা। বড়ো চাচা ১৯৩৬ সনের গ্রাজুয়েট। ইন্ডিয়ান রেলওয়ের মাঝারি মানের কর্মকর্তা ছিলেন। সেই চাকরি ছেড়ে শিক্ষকতাকেই ব্রত করে সুনামধন্য হয়েছিলেন। একজন সৌখিন ফটোগ্রাফার ছিলেন।

বড়ো চাচার বেশ কয়েকটি ক্যামেরা ছিলো। তবে বিশেষ ধরনের একটা ক্যামেরা ছিলো, যেটা ছোট সাইজের একটা আলমারির মতো। ওটা কালো মোটা কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকতো। যাদের ছবি তোলা হতো তাদের বাক্সটার সামনে বেঞ্চিতে বসিয়ে কালো কাপড়ে ঢেকে দিয়ে চাচা বাক্সের পেছনের নিজেও কালো কাপড়ের ভিতর অর্ধেকটা ঢুকিয়ে কীসব করে ছবি তুলতেন।

তখনকারদিনে ছবি তোলা(তখন বলা হতো ফটো তোলা) মানেই বিরাট এক এন্তেজাম! ঘরের মধ‍্যেই বা বাড়ির সামনের বাগানে সেট সাজানো হতো। বড়ো চাচা হেকে বলতেন, "হিমু, জামাটা বদলে এসো/কল্পনা, চুল- বেণি ঠিক করো/ রানু, শাড়ির আঁচলটা টেনে দাও/ মুখে হালকা পাউডার লাগাও/ বাঁদিকে সরো/ তোমরা একটু চেপে বসো/ ঘাড় উঁচু করো/ স্মাইল প্লিজ"- এসব করতে করতে বেশ কিছু সময় পর বড়ো চাচা শাটার টিপতেন। খ্যাটাশ করে একটা শব্দ হতো....
বড়ো চাচা খুব গোপনে ওখান থেকে কিছু একটা বের করে নিয়ে দৌড়ে বাথরুমে ঢুকতেন ইলেক্ট্রিক লাইট বন্ধ করে। আগে থেকে জ্বালিয়ে রাখা হারিকেন নিয়ে কিসব করে ১৫/২০ মিনিট পর চাচা ভেজা পেপারে ছবি নিয়ে বেরিয়ে সেগুলো রোদে শুকানোর পর সবার সামনে নিয়ে আসতেন। ছবি দেখে থ! আমি ছিলাম লাল জামা, বেণি বাধা বুবু নীল ফ্রক, রানু আপা প্রিন্ট শাড়ী... কিন্তু ছবিতে সবাই সাদা-কালো!

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের পরিবার অনেকটাই যাযাবরের মতো ছিলো। আমরা ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যাই। সংসারের অনেক জিনিসপত্রের সাথে সেই আলমারির মতো ক্যামেরাটাও কোথায় হারিয়ে গেছে জানিনা।

আমার বাবা চাচারা ছিলেন চার ভাই। ভাইদের মধ্যে বাবা মেঝ। বড়ো চাচা ছাড়া অন্য দুই জনের একজনকে ডাকতাম চাচাজী আর ছোট জনকে ছোট কাকু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স-মাস্টার্স করেও তার নির্দিষ্ট রোজগারের কোনো পেশা ছিলো না। কিন্তু চাচাজী ছিলেন বিলাসী জীবন যাপনে অভ্যস্ত।উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বেশুমার খরচ করতেন। যখন যা মনে চাইতো তাই করতেন। যাত্রা দলের মালিক হয়ে কয়েক বছর যাত্রা নিয়ে মেতেছিলেন, সিনেমা প্রোযোজনা করতেন আর দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়াতেন। বরিশাল শহরে দীপালি (পরবর্তীতে নাম বদলে হয় অভিরুচি) সিনেমা হল কিনে কয়েক বছর চালিয়ে ব্যপক লোকসান দিয়ে বিক্রি করে দেন। তার অনেকগুলো ক্যামেরা ছিলো। স্বাধীনতার আগেই তার মালিকানায় প্রথম মুভি ক্যামেরা হাতে নিয়ে দেখি। 'ক্যামেরার ভিতরে কি আছে' তা দেখার জন্য আমি গোপনে তাঁর একটা দামী ক্যামেরা খুলে সিকেডি করে নষ্ট করায় আমাকে তার ক্যামেরার ধারেকাছেও ঘেষতে দিতেন না। ক্যামেরার প্রতি আমার আকর্ষণ দেখে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আব্বা আমার জন্য একটা ক্যামেরা কিনে নিয়ে আসেন ১৯৬৯ সনে। সেই ক্যামেরার নাম ছিলো Kodak.

ছবি তোলা এতো সোজা, আগে জানা ছিল না-Kodak ক্যামেরার মালিক হবার আগে! রিল ভরো, দাঁড়াও, সাটার টিপে দাও, রিল নিয়ে স্টুডিওতে যাও, ওয়াশ করে ঘরে নাও। ছবি রেডি। তবে রঙ?
তখনও সাদা-কালোর যুগ। হোক সাদা-কালো, মনের রঙই ছবির রঙ। জীবনের রঙ। সাদা-কালো, তাই-ই ভালো।

দিন বদলালো। বাজারে নানান ক‍্যামেরা এলো। ইতোমধ্যে ফুফু, মামা এবং খালাদের বদৌলতে আমার মালিকানায় একাধিক ক্যামেরা এবং ফটোগ্রাফির উপর অনেক গুলো বই! ১৯৭৬ সনে ছোট কাকু জাপান থেকে আমার জন্য একটা ক্যামেরা নিয়ে এলেন। এটা Instant Polaroid Camera. ক্লিক করার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে রংগীন ছবি বেরিয়ে আসে! লাল জামা তো লাল জামা, নীল শাড়ি তো নীল শাড়ি‌। মনের রঙ আর শাড়ির রঙ, ফুলের রঙ হুবহু এক। আলটিমেটলি ছবিতে প্রীতি আর স্মৃতির অপূর্ব মিলন। কিন্তু এই ক্যামেরায় ছবি তোলা অত্যন্ত এক্সপেন্সিভ! ক্যামেরার প্রতি আমার এহেন আকর্ষণ দেখে চাচাজী তাঁর সংগ্রহ থেকে একটা ক্যামেরা দিলেন। নাম Zenit. Made in USSR. ক্যামেরাটা হাতে নেওয়ার আগে আমি জিজ্ঞেস করে নিলাম, "চাচাজী, এটা আমাকে এক্কেবারেই দিয়েছেন, না কি আবার ফেরত নিয়ে নিবেন?"
তিনি আমার কানের পাশের চিপস টেনে দিয়ে বললেন, "এক্কেবারেই দিয়েছি- যা ভাগ"! মাত্র ৪০ বছর বয়সে চাচাজী মস্তিষ্কে রক্তক্ষরনে ইন্তেকাল করেন।

ক্যামেরা আর ফটোগ্রাফি নিয়ে অনেক কিছু বলার আছে কিন্তু লিখতে ইচ্ছে করে না। লিখে কি হবে!
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

" হিজি ;) বিজি " - ২ - আমি এবং আমার বই পড়া ও কিছু লেখার চেষ্টা।

লিখেছেন মোহামমদ কামরুজজামান, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ বিকাল ৫:৫০


ছবি - odhikar.news

" আমাদের সমাজে চলার পথে একেক মানুষের একেক রকম নেশা থাকে । কেউ টাকা ভালবাসে, কেউ ভালবাসে ক্ষমতা, কেউ ভালবাসে আড্ডা আবার কেউ ভালবাসে গান... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি আর ব্লগে আসবো না।

লিখেছেন ইমরোজ৭৫, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:০৭



আমি অনিদিষ্ট কালের জন্য ব্লগে আসতেছি না। কারন আমার মন খারাপ। আর গ্রামীনফোন দিয়ে সামহোয়্যারইন ব্লগে ঢুকা যাচ্ছে না। আরবা ভিপিএন এ দিয়ে তখন আবার ঠিকই প্রবেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

হেফজখানা জীবনের এক শীতের রাতের কথা

লিখেছেন আহমাদ মাগফুর, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সন্ধ্যা ৭:২৫



তখন হেফজখানায় পড়ি। সাত - আট সিপারা মুখস্থ করেছি মাত্র। সিপারার সাথে বয়সের তফাৎটাও খুব বেশি না। তো একদিন রাতের কথা। শীতের রাত। সবাই ঘুমিয়ে গেছে। আমার ঘুম আসছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেঘের কাছে রোদ্দুরের চিঠি-০৭

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২১ রাত ১০:২৩


#মেঘের_কাছে_রোদ্দুরের_চিঠি_৭

#একটু_ভাল্লাগা_দিবে?
হ্যালো মেঘ,
আছো কেমন, আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। বাসায় মেহমান ছিল তাই চিঠি লেখা হয়ে উঠে নাই। মন খারাপ বা অভিমান হয়নি তো! আর মোবাইলে লিখতে লিখতে মে থাক গেয়ি। পিসি... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাবু খাইছো? - বাবা খাইছো?

লিখেছেন ঋণাত্মক শূণ্য, ০৬ ই ডিসেম্বর, ২০২১ রাত ৩:৫০

গত কিছুদিন থেকে আমি পরিবারের সাথে থাকছি না। তারা দেশে বেড়াতে গেছে। আর আমি একলা পুরা বাসা নিজের রাজত‍্য প্রতিষ্ঠা করে বসে আছি।



রাজত‍্য প্রতিষ্ঠার মূল ধাপ শুরু হয়েছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×