আমি ও আমার পৃথিবী......
আজও খুব ভোরে উঠেছি প্রতিদিনের মতো। আকাশে তখনও আলগোছে লেগে রয়েছে রাত্রির মিহি প্রলেপ। আমার চেনা পাখিরা জেগে ওঠেনি তখনও। মনটা কেমন যেন একটু বিস্বাদে ভরে আছে। মনে পড়লো, গত কয়েক দিনের ঘটনাক্রম......
জীবনকে ভাবতে হয় মৃত্যুর কাছে গিয়ে। মৃত্যুর কাছে গেলেই জীবনের মানে উন্মোচিত হয়। আমরা বুঝতে পারি; আমরা কী করছি আর কী করা উচিত।
মৃত্যুর কাছাকাছি না গিয়ে জীবনকে উপলব্ধি করে ওঠাটাই হলো শিল্প আর বাকিটা অনুভব। শিল্প আর জীবন দুটোর মাঝে একটা ফারাক থাকে। একটাতে কল্পনা বাস্তবের মিশ্রণ থাকে, অপরটাতে শুধুই গবেষণা ভিত্তিক আবিষ্কার।
এই পৃথিবীতে জন্ম নিয়ন্ত্রিত হলেও মৃত্যু এখনও নয়। প্রতিটি জীবের কোষের প্রতিদিন জন্ম-মৃত্যু হতে হতে একদিন সবটাই অকেজো হয়ে পড়ে। ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। জ্ঞানেন্দ্রিয়ের চলন শক্তি হারিয়ে যায়। আমরা বলি- ইস্, মানুষটা বড় ভালো ছিল।
এর ব্যতিক্রম হলেই মনে ধাক্কা লাগে। প্রাণে বেজে ওঠে নিবিড় ব্যাথার সুর। সে আমার কাজের মানুষ হোক বা নামকরা কেউ। নামী মানুষের ক্ষেত্রে মূহুর্তে সবাই জেনে যান। শোকের প্রাবল্য উথলে ওঠে। ক্ষুদ্র পরিসরে কেউ মারা গেলেও তাই হয়। সারাদিনের একটা মন খারাপ সঙ্গী হয়। কিন্তু মানুষ সময়ের আগে নিজের জীবনের বিরতি ঘটায় কেন!
এখন প্রশ্ন হলো, সময়টা কখন। একটা আট বছরের ছেলে পছন্দের মোবাইল না পাওয়ায় তার কি ঐ সময় উপস্থিত হয়েছিলো! একজন সত্তরোর্ধ্ব মানুষের একাকীত্বের নিবৃত্তিতে সময় উপস্থিত হয়েছিলো। নাকি ৩৪ বছরেই জীবনকে টেনে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব বোধ হয়েছিলো! কে বলবেন, কে এর ব্যাখ্যা দেবেন? এর ইউনিফর্ম ব্যাখ্যা হয় বলে, আমি বিশ্বাস করি না।
অনেক সময় জীবনে শূণ্যতা সৃষ্টি হয়। এরপরে কি ভাবে এগিয়ে যাবো, ঠিক বোধগম্য হয় না। পরের দিনের ভোর দেখতে মন চায় না। আমারই দু বার হয়েছিলো। একবার হঠাৎ বাবার মৃত্যুতে। বুঝতে পারছিলাম না, এরপর থেকে আমার ভূমিকা কি হবে। কি ভাবে থাকবো নিঃসঙ্গ পৃথিবীতে! আর একবার নিশ্চিত মৃত্যুর কিনারা থেকে ফিরে এসেছিলাম, সে অন্য গল্প।
এখন তো মন খারাপ হওয়ার কত আয়োজন। প্রিয় জনদের মৃত্যু দেখে অনেকে অবসাদে ভোগেন। কোনো সান্ত্বনাই মনে জোর আনতে পারেনি সে সময়। এমনি করেই প্রিয় গাছটির মৃত্যু হলে, প্রিয় পোষা পাখি মারা গেলে, প্রেম অবসৃত হলে, চাকরি চলে গেলে, দীর্ঘ চেষ্টা করে চাকরি না পেলে, এরকমই হাজারো কারণে মানুষ অবসাদে চলে যায়। ব্যক্তিগত জীবনে এ সবেরই সাক্ষী আমি। তখন যাই বলা হোক না কেন, অবসাদ দূর হয় না। এ অসুখ অতো সহজে সারে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজের থেকে সেরে যায়- তাই রক্ষে।
আমার কলেজ বেলায় আমারই এক প্রাণবন্ত ছাত্র একদিন বিকেলে মাঠ থেকে খেলে ফিরে ওর বাবার লাইসেন্স করা পিস্তল ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেছিলো। অথচ ছেলেটা সব কিছু আমায় বলতো। সব কিছু। ওর নিজের মা, বাবার আবার বিয়ে করা দ্বিতীয় মা - সব কিছু। খুব কষ্ট হয়েছিল। অনেক দিন মরমে মরে গিয়েছিলাম, আমি একটুও বুঝতে পারি নি, রাজীব এ রকম করতে পারে। ভিতরের ক্ষয় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ধরা পড়ে না কোনো আধুনিক যন্ত্রেই।
শত কষ্টেও মানুষ ঠিক বেঁচে থাকে, থাকতে চায়। কালকে কি খাবে, তার বন্দোবস্ত নেই। তবুও মানুষ বেঁচে থাকে। আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে থাকে! অথচ কয়েক শো কোটির মালিক শিল্পপতির পুত্র আত্মহননের পথ বেছে নেয়।
বেঁচে আছি, মন ঠিক আছে বলেই আছি। যেদিন মন বিগড়ে যাবে, দুমরে মুচড়ে যাবে, রিপেয়ারিং এর বাইরে চলে যাবে সেদিন থেকে আর ফেসবুকের স্ক্রীণে আর কোনো পোস্ট থাকবে না। মৃত নক্ষত্রের মতো ভেসে বেড়াবো সীমাহীন মানসপটে।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৪ বিকাল ৩:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




