
ছেলেবেলায় স্কুলে বাংলা রচনায় কোনও কিছুর আত্মকথা লিখতে খুব ভাল লাগত। ডাক-হরকরা, নদী, রাজপথ, বটগাছ ইত্যাদি ইত্যাদি। গল্পের বীজটি আমার মন ও মননে বোধহয় তখনই রোপিত হয়েছিলো- একটি বট গাছের আত্মকাহিনী পড়ে এবং লিখতে গিয়েই গাছের প্রতি আমার আকর্ষণ। গাছ লাগানো, পরিচর্যা করতে ভালো লাগে। ছাদ বাগানে কত রকম চারা লাগাই- কখনও বাঁচে, কখনও বা শুশ্রূষার অভাবে শুকিয়ে যায়।
তেত্রিশ বছর বয়স হয়ে গেল ছবির বনসাইটির। ছোট্ট এত্তটুকুন একটি চারা কুড়িয়ে এনেছিলাম বরিশাল থেকে আমাদের ভেঙে-ফেলা বাড়ির দেওয়াল থেকে। সেই থেকে কখনো বারান্দায়, কখনও ড্রইংরুমে আবার ছাদের উপরে আপনমনে ঝুরি, শাখাপ্রশাখা মেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে রোদ্দুর, ঝড়, বজ্রবিদ্যুৎ, মুসলধারা বর্ষণ সয়ে। অনেক বছর অনেক সময় ও শ্রম দিয়েছি বনসাই করতে.....। এখন আর যত্নয়াত্তি নেই না তারপরও বেঁচে আছে, আরও বহু বহুদিন বেঁচে থাকবে। ছাদে থেকে কত কী দেখেছে সে! উল্কার ঝরে পড়া, নীল চাঁদ, সূর্য-চন্দ্রগ্রহণ, হেলীর ধুমকেতু...আমি ঝরে যাব, তবু জীবন অগাধ তোমারে রাখিবে ধরে সেইদিন পৃথিবীর পরে...
আগেকার দিনে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বট ও অশ্বত্থের বিয়ে দেওয়া হত ধুমধাম করে! মানুষেরও নাকি বিয়ে হত গাছের সঙ্গে! এক চিরমৌনের সঙ্গে আরেক সতত মুখর প্রাণের সংলাপ বিনিময় হত কোন ভাষায়? অনড় স্থবির বৃক্ষের সঙ্গে আরেকটি নিশ্চল বৃক্ষজীবন কীভাবে সংযুক্ত হত? দু'জনের পাতার মর্মর কি সেই ভাষা?
আমার এক বন্ধু লিখেছিলেন, 'একটি পুরুষের সঙ্গে একটি নারীর বিয়ে হয়। এ তো সাধারণ মামুলি ঘটনা। কিন্তু হৃদয়ের কি বিয়ে হয়?' হৃদয়কে কি আচার, নিয়ম, সংস্কার দিয়ে বন্দী করা যায়!--কথাটা মনে আছে! স্পষ্ট, অকপট উত্তর নেই কোথাও, তা-ও বুঝি।
বট ও অশ্বত্থের এমন একটি বিবাহিত বেশ কয়েকটি যুগল আমি দেখেছি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়। এই ঢাকা শহরেও আছে রমনা পার্কে, হাজারীবাগ এবং আরও কয়েক যায়গায়। কত যুগ আগে তাদের বিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কারও মনে নেই! বরিশাল কালিবাড়ি রোডের পশ্চিম প্রান্তে যেখানে বগুড়া রোডের সাথে যুক্ত হয়েছে সেখানেও তেমন একটা যুগল ছিলো ৪০/৫০ বছর আগে -এখন আছে কি-না জানিনা। তাদের গায়ে হাজার হাজার ঢিল, সূতো, লাল-হলুদ কাপড়ের টুকরো জড়ানো থাকতো! কত ব্যর্থ-পূরিত মনস্কামের কথা জড়িয়ে আছে ওর সঙ্গে, তখন বুঝতাম না! যার বাসনা পূর্ণ হল, সে হয়তো আবার ফিরে এল নৈবেদ্য নিয়ে। কিন্তু যার মনস্কাম অপূর্ণ রয়ে গেল, সে কি আর ফিরে এসেছিল?
...এই চিরমৌনের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে মনে হয়, তোমরা কি সত্যিই বাঞ্ছাকল্পতরু?
পুনশ্চঃ আমি লক্ষ্য করে দেখেছি- প্রাকৃতিক ভাবে যেখানেই বট গাছ আছে তার পাশে না হলেও কাছাকাছি অশ্বত্থ গাছ আছে। এটা কাকতালীয় কিম্বা বৈজ্ঞানিক সূত্র আমি জানিনা। কেউ জানলে ব্যাখ্যা দিয়ে বাধিত করবেন।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০২৪ দুপুর ২:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



