নেশা মানেই খারাপ না....
'নেশা' শব্দটা বড় ভয়ানক! শুনলেই খারাপ কিছু মাথায় আসে। বিড়ি, সিগারেট, জুয়া, মদ, ভাঙ, চরস ইয়াবা, ফেনসিডিল এসব আর কি। আরো কিছু আছে- সবতো লেখা যায়না। শ্লীল, অশ্লীলের প্রশ্ন উঠবে। তাই ওসব থাক।
তবে নেশা মানেই খারাপ না। এই যেমন- বেড়ানোর নেশা, বইয়ের নেশা, সেবার নেশা, সৃষ্টির নেশা এসব তো ভালোই। বেশ সফিস্টিকেটেড আর গ্ৰহনযোগ্যও। আমারটাও তাই অ্যকসেপ্টেড। বলাই যায়।
আমার নেশাটা হলো খবরের কাগজ পড়া। সেই ছেলে বেলা, জানলা দিয়ে বাড়িতে যখন দুটো খবরের কাগজ ফেলতো তখন যৌথ পরিবারের সব ভাইবোন ওটার দিকে তাক করে একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। খবরের কাগজের জন্য ওরকম ভাবে একসাথে ঝাঁপানোটা অদ্ভুৎ হলেও সেটাই হতো আমাদের বাড়িতে। জানলা দিয়ে যে খবর গুলো ঢুকতো ওগুলোকে প্রায় মুখস্ত করে ফেলতাম। নেশাটা আমার রয়েই গেছে। এখনো দেশ বিদেশের অনেক ম্যাগাজিন পড়ি। বিনোদনের জন্য টিভি, নেট সহ অনেক কিছুই আছে। তবে ছাপা অক্ষর পড়ার নেশাটা আমার রয়েই গেছে।
ওটা বেঁচে থাক।
এখন অন্য কথা বলি। 'ভয়েস অব খোরশেদ'। আমাদের বাড়িরই অবসরপ্রাপ্ত কেয়ার টেকার খোরশেদ হাওলাদার। আমরা ভাই বোনরা তার নাম দিয়েছিলাম 'ভয়েস অব খোরশেদ'। সেই 'ভয়েস অব খোরশেদ' চাচা যে খবর গুলো দিতো সেগুলো কাগজে থাকতো না। সেগুলো খোরশেদ চাচাই আগে পেতো। এই যেমন কার বাড়িতে বাচ্চা হয়েছে, কোন বাচ্চা ইঁচড়ে পাকা, কার মেয়ে কোথায় ভেগেছে আর কার বাড়িতে ছিঁচকে ঢুকে সব শাড়ি আর হাঁড়ি নিয়ে পালিয়েছে। সে সবও তো খবর। এছাড়াও খোরশেদ চাচা আর একটা কাজ করতো- আমাদের বাড়ি থেকে পুরোনো কাগজ, পুরনো বই খাতা নিয়ে যেতো এবং পড়ার পর ঠোংগা বানিয়ে বিক্রি করতো।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের পরিবার যখন গ্রামে আশ্রয় নেয় তখনও খোরশেদ চাচা আমাদের বাড়ি ছেড়ে যাননি। কার্ফিউর মধ্যেও গোটা এলাকায় চষে বেড়িয়েছেন আর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা বাহিনীর অদ্ভুত সব সাফল্যের সংবাদ সংগ্রহ করে অনেকটা স্বাধীন বাংলা বেতারের চরম পত্রের অনুকরণে মুখস্থ বলতেন -যার প্রায় সবই ছিলো কল্পিত কিম্বা যৎসামান্য সত্যের অতিরঞ্জন।
পেশাগত ডিউটির বাইরে খোরশেদ চাচা ছিলেন ভয়ানক গানপাগল। কোনো সন্তানাদি ছিলো না। শুনেছি, ওনার স্ত্রী অন্য একজনের সাথে চলে যায়.... আর বিয়ে-শাদি করেনি। ১৯৭৫ সনে ৭০ বছর বয়সে মারা যান।
সেই খোরশেদ চাচা একদিন আক্ষেপ করে বলেছিলেন,
"আমি সবার খবর নিতাম তাই তোমরা আমাকে কিসব টাইটেল দিয়েছো, অথচ আমি আমার ঘরের মানুষের মনের খবর রাখিনি। অনেক বড়ো ভুল হয়ে গেছে। অন্যের সব খবর ঘাঁটতে গিয়ে নিজের ঘরের দিকে তাকানো হয়নি...আমার স্ত্রী চলে যেয়ে ঠিক কাজটিই করেছে, যার প্রায়শ্চিত্ত করছি..."।
আসলেই তাই, আমরা অন্যের খবরের পিছু নেই অথচ ক'বার নিজের মনের খবর নিই। সেই ছেলেবেলা থেকে খবরের কাগজে কতো খবর, কতো উত্তেজনার আঁচ পোহানোতে মেতেছি, সেখানেও কখনো কখনো কতো সত্যর প্রলেপে মিথ্যের বেসাতির বিশ্লেষণ পড়েছি, কিন্তু নিজের মনের খবরের বিশ্লেষণ হয়নি।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০২৪ দুপুর ২:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



