
মির্জা গালিব। আসল নাম মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ।
উর্দু ভাষার সর্বাধিক জনপ্রিয় কবি মির্যা গালিবের জন্মদিন আজ।
তিনি ১৭৯৭ সালের ২৭শে ডিসেম্বর জন্ম গ্রহন করেছিলেন। গালিবের জন্ম আগ্রায় হলেও তার পূর্ব পুরুষ ভারতীয় ছিলেন না। তার দাদা মির্যা কাকান বেগ খান সমরখন্দ থেকে এসেছিলেন সামরিক উচ্চাভিলাষিতার কারনে। তিনি মোগল সম্রাট শাহ আলমের অধীনে সামরিক দায়িত্ব পালন করেন। তার দুই পূত্র আবদুল্লাহ বেগ খান ও নসরুল্লাহ বেগ খান তাদের বাবারই পদাঙ্ক অনুসরন করে বিভিন্ন শাষকদের অধীনে সৈনিকের পেশা গ্রহন করেন। গালিবের চার বছর বয়সে তার বাবা মারা যান। তার বাবা দিল্লির এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। সৈনিকের পেশায় বিভিন্ন অনিশ্চয়তা থাকার কারনে গালিবের বাবা তার মাকে তার নানার বাড়িতেই অবস্হানের অনুমতি দিয়েছিলেন। তাই গালিব তার নানার বাড়িতেই আরামদায়ক শৈশব কাটান। যদিও অহংকারী গালিবের নানা বাড়িতে অবস্হানের প্রভাব নেতিবাচক ছিলো।
আগ্রার খ্যাতিমান পন্ডিত শেখ মোয়াজ্জেম তার শিক্ষক ছিলেন। তাছাডা তিনি মীর আযম আলী পরিচালিত একটি মাদ্রাসায়ও যেতেন। তিনি যুক্তিবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিত্সাশাস্ত্র ও অধিবিদ্যা ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে পড়াশুনা করেন৷ কিন্তু তার ঝোঁক ছিল ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি, এবং বিশেষত ফার্সি ভাষার প্রতি৷ এসময়ে আরবি ও ফার্সি ভাষায় দক্ষ আবদুস সামাদ নামে এক জ্ঞানী ব্যক্তি আগ্রা সফর করেন৷ গালিব তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন৷ আবদুস সামাদ গালিবের মামার বাড়িতে দুই বছর অতিবাহিত করেন৷ গালিব কখনো কাউকে তার 'উস্তাদ' বলে স্বীকার না করলেও পরবর্তীকালে আবদুস সামাদের উল্লেখ করেছেন অত্যন্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার সাথে৷
নয় বছর বয়সেই গালিব ফার্সিতে কবিতা লিখতে শুরু করেন৷ পুরো জীবন ধরে তিনি ফার্সিকে তার প্রথম প্রেম বলে বর্ণনা করেছেন৷ কিন্তু তিনি যে শৈশবেই উর্দুতে কবিতা লিখতেন তারও দৃষ্টান্ত রয়েছে৷ কবি আলতাফ হোসেন হালীর বর্ণনা অনুসারে কানাইয়া লাল নামে এক লোক গালিবের একটি মসনবী সংরক্ষণ করেছিলেন যা গালিবের আট বা নয় বছর বয়সে লিখা৷ এটির অস্তিত্ব গালিব বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু পরে যখন তাকে এটি দেখানো হয় তখন তিনি অত্যন্ত ব্যগ্রতার সাথে সেটি পাঠ করেন৷
১৮১০ সালের ৮ আগস্ট তের বছরের কম বয়সে গালিব নওয়াব ইলাহী বখশ খানের কন্যা ওমরাও বেগমকে বিয়ে করেন এবং বিয়ের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আগ্রা থেকে দিল্লিতে চলে আসেন৷ সম্ভবত তা ১৮১১ সালে এবং পরবর্তী একান্ন বছর ধরে তিনি দিল্লিতেই বসবাস করেছেন৷ অবশ্য সাত বছর বয়স থেকেই তিনি দিল্লিতে আসতেন বলে নগরীটি তার কাছে নতুন ছিল না। দিল্লিতে আগমণের পর গালিব চাঁদনী চকের কাছে একটি প্রাসাদ ভাড়া নেন৷ শ্বশুরের প্রভাবের কারণে দিল্লির অভিজাত মহলের সাথে পরিচিত হতে তাকে বেগ পেতে হয়নি৷ গালিব নিজেকে দিল্লির অভিজাতদের মধ্যে গণ্য করতেন এবং সেভাবে চলতে ফিরতে ও আচার আচরণে অভ্যস্ত ছিলেন৷ কবি আলতাফ হোসেন হালী লিখেছেন যে, গালিব কখনো পালকি ছাড়া কোথায়ও যেতেন না এবং যারা তার সাথে সাক্ষাতের জন্যে আসতেন, তিনিও শুধু তাদের কাছেই যেতেন৷
গালিব মদ্য পান করতেন এবং ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে তার নিষ্ঠা ছিল না৷ অতএব, সেজন্যেও তাকে তীব্রভাবে সমালোচিত হতে হয়েছে৷ তার কবিতায় ধর্মীয় শব্দাবলী উঠে এসেছে প্রতীকি অর্থে, যা অনিবার্যভাবে ধর্মের প্রতি তার বিরূপতা নাও হতে পারে৷ গালিবের আরেকটি দুর্বলতা ছিল জুয়া খেলার প্রতি৷ এ ব্যাপারে তার কোন রাখঢাক ছিল না৷ গ্রীষ্মের একদিন এবং তখন রমজান মাসও ছিল, গালিবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিশিষ্ট কবি ও ইসলামী আইনে বিশেষজ্ঞ মুফতি সদরুদ্দিন আজুর্দা গালিবের সাথে সাক্ষাত্ করতে গিয়ে দেখতে পান যে তিনি জুয়া খেলছেন৷ ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি মন্তব্য করেন যে এখন তার সন্দেহ হচ্ছে যে, পবিত্র গ্রন্থাদিতে যে বলা হয়েছে রমজান মাসে শয়তান কারারুদ্ধ থাকে, তা সত্য৷ গালিব তাকে স্বাগত জানিয়ে উত্তর দেন, গ্রন্থের বক্তব্য যথার্থ, শয়তান যথার্থই কারারুদ্ধ এবং তা এই কক্ষেই৷ গালিব কখনো রোজা রাখেননি এবং তিনি তা স্বীকার করেছেন৷ অন্যান্য দোষও তিনি স্বীকার করতেন এবং ধর্মের বাণী প্রচারকারীদের বিদ্রূপ করতেন৷ আর্থিক অনটন গালিবের জীবনকে বেপরোয়া করে তুলেছিল এবং নিজ বাড়িতে বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানাতেন জুয়া খেলতে৷ জুয়া খেলাকে নৈতিকভাবে অপরাধ মনে করতেন না তিনি৷ তখনকার ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছিল এবং জুয়া খেলাকে 'দেশীয়'দের বদভ্যাস বলে বিবেচনা করতো৷ জুয়াখেলার কারণে ১৮৪১ সালে গালিবকে সতর্ক করে দেয়া হয় এবং ১০০ রুপি জরিমানাও করা হয়৷ কিন্তু পরবর্তীতে দিল্লির কোতোয়াল ফৈয়াজ হাসান খান গালিবের বাড়িতে হানা দিয়ে জুয়া খেলারত অবস্থায় তাকে পাকড়াও করেন এবং বিচারে তাকে ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও দু'শ রুপি জরিমানা করা হয়৷ জরিমানা দেয়া না হলে কারা মেয়াদ বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত ৫০ রুপি দেয়া হলে সশ্রম কারাদন্ড বিনাশ্রম হওয়ার শর্ত ছিল৷ এই রায়ের বিরুদ্ধে প্রবল আপত্তি উঠে৷ তখনকার সংবাদপত্রগুলো প্রতিবাদে সোচ্চার হয়৷ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার পরও সরকার অনড় ছিল৷ সম্রাটকে জানানো হয় যে বিচারাধীন বিষয়ে তার হস্তক্ষেপ না করাই ভালো৷ গালিবকে অবশ্য পুরো মেয়াদ কারাবাস করতে হয়নি৷ তিন মাস পরই তাকে মুক্তি দেয়া হয়৷ কারাগারে তাকে কোন শ্রম দিতে হয়নি৷ বাড়ি থেকে পাঠানো খাবার খেতে দেয়া হয়েছে। তবে সামাজিক ভাবে তিনি অনেক হেয় হয়েছিলেন। তার এক বন্ধু পত্রিকায় ঘোষনা দিয়ে তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেন। তার বিপদে তার অনেক বন্ধুরা তাকে ত্যাগ করেছিলেন।
মির্জা গালিব কখনো তার জীবিকার জন্য কোনও কাজ করেননি। সারা জীবনই তিনি হয় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অথবা ধার কর্য করে নতুবা কোনো বন্ধুর উদারতায় জীবন যাপন করেন। মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর ও অযোধ্যার নবাব ওয়াজেদ আলীর কাছ থেকে গালিব অনেক অর্থনৈতিক সাহায্য পেতেন। সিপাহি বিদ্রোহের পর এবং অযোধ্যা বৃটিশদের দখলে যাবার পর গালিব চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন। ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়লে ১৮৩৫ সালে মহাজনরা এক সঙ্গে তার বিরুদ্ধে চার-চারটি মামলা আদালতে দায়ের করে দেয়। ঘর থেকে বের হওয়াই তার জন্য মুশকিল হয়ে পড়ে। দীর্ঘ চার মাস পর্যন্ত কবি প্রায় নিজের ঘরে বন্দী হয়েই থাকেন । এক সময় মহাজনরা কবিকে আদালত পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায় । কবি তার ঋণের কথা স্বীকার করে বিচারকের সামনে নিম্নলিখিত দুই পংতি কবিতা আবৃত্তি করেন:
“ঋণ করে করে নেশা করি আমি
জানতাম একদিন,
রঙীন সুরার রঙনে আমার
দুনিয়া রঙীন হবে।”
এই আবৃত্তি শুনে বিচারক মৃদু হেসে কবির বিরুদ্ধেই রায় দেন কিন্তু প্রতিভার সম্মান রক্ষার্থে বিচারক নিজের গাঁট থেকেই ঋণ পরিশোধ করে কবিকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
১৮৬৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি মহান কবি গালিব মৃত্যুবরণ করেন এবং তাকে দিল্লীর নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারের কাছে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়৷ বর্তমানে গালিবের সমাধিক্ষেত্রটি চরম অবহেলায় পর্যবসিত।
তিনি তার নিজের সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, 'আমি বেঁচে থাকতে আমার গুণকে কেউ স্বীকৃতি না দিলেও, পরবর্তী প্রজন্ম আমাকে স্বীকৃতি দিবে'।
ইতিহাস এর সত্যতা প্রমাণ করেছে।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০২৪ দুপুর ২:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



