‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের স্বাধীন নির্জোট কূটনীতি’ শীর্ষক আলোচনা সভাঃ কিছু অনুভূতি....
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে পিআইবি অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হলো ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের স্বাধীন নির্জোট কূটনীতি’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি), তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।
পিআইবির মহাপরিচালক Faruk Wasif এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সভাপতিত্ব করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
মূল বক্তা ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এ এন এম মুনিরুজ্জামান, সভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অর্থনীতিবিদ ড. মুশতাক খান। আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ডিফেন্স জার্নালের সম্পাদক আবু রুশদ এবং ব্রেইনের নির্বাহী পরিচালক ড. সফিকুর রহমান।
মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান (ঝিনেদা ক্যাডেট কলেজের প্রথম ব্যাচ ক্যাডেট) স্যার তাঁর লিখিত বক্তব্যে জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা এবং জাতীয় সংস্কৃতির স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করেন। পাশাপাশি সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর পেশাগত জীবনের কিছু স্মৃতি তুলে ধরেন, যা উপস্থিত অনেকের কাছেই ছিল অজানা ও আগ্রহোদ্দীপক।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা, সামরিক বিশ্লেষক এবং ডিফেন্স জার্নালের সম্পাদক Abu Rushd A R M Shahidul Islam (রংপুর ক্যাডেট কলেজের প্রথম ব্যাচ ক্যাডেট) তাঁর বক্তব্যে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ভয়াবহ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সংকটের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে জিয়াউর রহমান বহুমাত্রিক সংকটে জর্জরিত একটি রাষ্ট্রকে উন্নয়ন ও আত্মবিশ্বাসের পথে এগিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্যে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা, জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু রাজনৈতিক নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক ও গণমাধ্যমভিত্তিক কৌশলগত শক্তিও গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বিগত সময়ে জেল-জুলুম, গুম ও নির্যাতনের শিকার রাজনৈতিক কর্মীদের দুর্দশার কথাও তুলে ধরেন।
ড. Shafiqur Rahman (রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের অষ্টম ব্যাচ ক্যাডেট) তাঁর বক্তব্যে জিয়াউর রহমানের শিল্পায়ন, আত্মমর্যাদাবোধ এবং স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রচিন্তার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান প্রচলিত অভিজাত গণ্ডির বাইরে থেকে মেধাবী ও যোগ্য মানুষকে রাষ্ট্রগঠনের কাজে সম্পৃক্ত করেছিলেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন।
বিশেষ অতিথি ড. মুশতাক খান(মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের ১৩তম ব্যাচের ক্যাডেট) তাঁর বক্তব্যে অর্থনীতির চেয়ে সমাজতত্ত্ব, রাষ্ট্রচিন্তা এবং উপমহাদেশের ঐতিহাসিক ও জাতিগত বাস্তবতা নিয়ে বেশি আলোচনা করেন। ব্রিটিশ-পরবর্তী ভারতীয় উপমহাদেশের বিভাজন, বৈষম্য এবং আঞ্চলিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক তিনি তুলে ধরেন। পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের যৌক্তিকতা সম্পর্কেও তাঁর মতামত ব্যক্ত করেন।
সভাপতির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী Zahir Uddin Swapon ‘নির্জোট কূটনীতি’র ধারণা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিজেই এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। চীন ও ভারতের ওপর আমদানি নির্ভরতা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে রপ্তানি বাজার, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক রেমিট্যান্স ও জ্বালানি সম্পর্ক এবং রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক জ্বালানি সহযোগিতা- সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। তিনি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত সার্ককে আরও কার্যকর করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধান অতিথি Mirza Fakhrul Islam Alamgir স্যার তাঁর স্বভাবসুলভ সাবলীল ও প্রাঞ্জল বক্তব্যে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করেন। তিনি কোনো অতিরঞ্জন বা আবেগনির্ভর বক্তব্য না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাঁর ভূমিকা এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি কোনো বৃহৎ শক্তির সাথে জোটবদ্ধ না হবার সুস্পষ্ট ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তিনি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ধারণাকে বাস্তবায়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে এটি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও চিন্তাশীল একটি সেমিনার। দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও রাষ্ট্রভাবনার নানা দিক কাছ থেকে শোনার সুযোগ হয়েছে। তাদের বক্তব্যের গভীরতা ও ব্যাপ্তি পুরোপুরি ধারণ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তারপরও একজন সাধারণ শ্রোতা হিসেবে আমার উপলব্ধিগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
তবে এত সুন্দর ও সুশৃঙ্খল অনুষ্ঠানে একটি বিষয় অত্যন্ত বিরক্তিকর ছিল- উপস্থিত কিছু মিডিয়াকর্মী বক্তাদের বক্তব্য চলাকালে নিজেদের মধ্যে উচ্চস্বরে কথোপকথনে ব্যস্ত ছিলেন। এটি যেমন দৃষ্টিকটু ছিল, তেমনি শ্রুতিকটুও। বক্তাদের প্রতি এবং অনুষ্ঠানের প্রতি ন্যূনতম সম্মানবোধ থেকেও এমন আচরণ পরিহার করা উচিত ছিল বলে আমি মনে করি।
দিনের শেষে মনে হয়েছে, জিয়াউর রহমানকে নিয়ে আলোচনা মানে কেবল একজন রাষ্ট্রপতি বা রাজনৈতিক নেতাকে স্মরণ করা নয়; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং আত্মমর্যাদাবোধের প্রশ্নগুলোকে নতুন করে পর্যালোচনা করা।
বক্তাদের বক্তব্যে মতপার্থক্য ছিল, বিশ্লেষণের ভিন্নতা ছিল, কিন্তু একটি বিষয়ে সবাই একমত- বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে জাতীয় স্বার্থকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’- এই দর্শন কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি নীতি হয়ে উঠতে পারলেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের প্রকৃত মূল্যায়ন সম্ভব হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



