চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....
বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগের সঙ্গে যুক্ত চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা তাই নিছক একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধির প্রশ্ন।
বিশ্ববাণিজ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। একজন বিদেশি ক্রেতা শুধু পণ্যের দাম ও মান বিবেচনা করেন না; পণ্য সময়মতো সরবরাহ করা যাবে কি না, বন্দরে কনটেইনার কত দিন আটকে থাকবে এবং পরিবহনব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য- এসব বিষয়ও তাঁর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। বন্দরের অদক্ষতার কারণে রপ্তানিকারককে অর্ডার হারাতে হলে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় পুরো অর্থনীতিকে।
আমাদের বন্দরের প্রধান সমস্যা কোথায়?
চট্টগ্রাম বন্দরের সেবার মান, জাহাজের অপেক্ষাকাল, কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি এবং যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম গড়ে আড়াই দিন, যেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক কার্যক্রমে গড় সময় ২৪ ঘণ্টা। আমাদের বন্দরে প্রতি ঘণ্টায় ক্রেন দিয়ে গড়ে ২২টি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের বিপরীতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক গড় ৩৫টির বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একইভাবে, ২০০৭ সালে নির্মিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা বা ইকুইপমেন্ট অ্যাভেইলেবিলিটি প্রায় ৭০ শতাংশ- যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে ৯৩ শতাংশের কথা বলা হচ্ছে।
এই ব্যবধান কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এর অর্থ হলো সময়, অর্থ ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার অপচয়।
তাহলে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দায়িত্ব দেওয়া কেন?
ডিপি ওয়ার্ল্ড সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক বন্দর ও লজিস্টিকস অপারেটর। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে তাদের কার্যক্রম রয়েছে।
একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সক্ষমতা কাজে লাগানো গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিদেশি প্রতিষ্ঠান বলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে দক্ষ বা জনস্বার্থের রক্ষক হয়ে যায় না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং রাষ্ট্রের কার্যকর তদারকির ওপর।
চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোঃ
(১). মেয়াদঃ চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছর। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ এবং উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ থাকবে। পারস্পরিক সমঝোতা না হলে মেয়াদ বাড়ানো বাধ্যতামূলক নয়।
(২). অগ্রিম অর্থঃ চুক্তির শুরুতেই ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রায় ৬০০ কোটি টাকা আপফ্রন্ট ফি দেবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
(৩). বিনিয়োগঃ টার্মিনাল আধুনিকায়নে ১,০০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
(৪). রাজস্ব সুরক্ষাঃ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য ন্যূনতম ভলিউম গ্যারান্টি, প্রতি টিইইউ অনুযায়ী রাজস্বের অংশ এবং বার্ষিক নির্ধারিত ফি প্রদানের ব্যবস্থা থাকার কথা বলা হয়েছে।
(৫). কর্মদক্ষতার বাধ্যবাধকতাঃ ট্রাকের অবস্থানকাল, ক্রেনের উৎপাদনশীলতা এবং অন্যান্য কার্যকরী সূচকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। টানা তিন মাস লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
(৬). কর্মচারীদের সুরক্ষাঃ বন্দরের কর্মচারীদের চাকরি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সুরক্ষার জন্য নির্দিষ্ট ধারা রাখা হয়েছে।
(৭). তদারকি ও জবাবদিহিঃ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালনাগত তদারকি অব্যাহত থাকবে। সিসিটিভি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সাপ্তাহিক ও মাসিক পরিচালনাগত তথ্য এবং রাজস্বের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে।
এসব শর্ত বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়, সেটিই হবে চুক্তির সফলতা নির্ধারণের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি।
আমি মনে করি, সরকার ব্যবসা করার জন্য বন্দর পরিচালনা করে না। বন্দরের উদ্দেশ্য শুধু নিজস্ব আয় বাড়ানো নয়; বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। বন্দরের কার্যকারিতা বাড়লে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় কমতে পারে, রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি হতে পারে এবং দেশের শিল্প ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
অতএব, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির মূল্যায়ন শুধু সরকার কত টাকা পাবে কিংবা বিদেশি প্রতিষ্ঠান কত লাভ করবে- এই সংকীর্ণ হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। দেখতে হবে, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি কতটা লাভবান হচ্ছে। তবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরিঃ
★চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, আর্থিক কাঠামো ও দায়বদ্ধতা যথাসম্ভব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা।
★বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ও কর্মদক্ষতার লক্ষ্যমাত্রা নিয়মিত যাচাই করা।
★বন্দরের কর্মচারীদের আইনগত অধিকার ও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা রক্ষা করা।
★রাষ্ট্রের তদারকি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা।
★নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে চুক্তি অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
★চুক্তির মেয়াদ শেষে বা চুক্তি বাতিলের পরিস্থিতিতে বন্দরের কার্যক্রম যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা রাখা।
উপসংহারঃ
চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন কোনো দলীয় বিতর্কের বিষয় হওয়া উচিত নয়। এটি জাতীয় অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থের প্রশ্ন।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া মানেই জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন নয়; আবার বিদেশি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিয়েছে বলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে- এমন নিশ্চয়তাও নেই।
প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছ চুক্তি, কঠোর জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের কার্যকর তদারকি।
আমরা চাই, চট্টগ্রাম বন্দর শুধু বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক বন্দর হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হোক।
কারণ বন্দরের সাফল্য মানে শুধু বন্দরের সাফল্য নয়- এটা বাংলাদেশের অর্থনীতির সাফল্য।
(গত ৭ মাসে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে এটা আমার দ্বিতীয় পোস্ট)
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



