কি হচ্ছে এগুলো! গর্ভ থেকে শুরু করে নিজের ঘরে, বাইরে কোথাও মানুষের জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই আজ।গর্ভের শিশু গুলিবিদ্ধ হচ্ছে, বাক-স্বাধীনতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে চাপাতি দিয়ে কোপানো হচ্ছে মুক্তমনাদের, একের পর এক নারী ও শিশু ধর্ষণ, নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে শিশুদের। হযবরল অবস্থা সমাজের।
একদল মৌলবাদী নাস্তিক-মুক্তমনা-ব্লগার হত্যার ঈমানী দায়িত্ব নিয়েছে। আল্লাহু আকবর, নারায়ে তাকবির বলে কুপিয়ে মারছে সমাজের কিছু অগ্রগামী খোলামনের মানুষকে। ৬ মাসে চারজন ব্লগার ধর্মের নামে খুন হলো। আরো স্পষ্টকরে বলা যায় ধর্ম রক্ষার জন্য। কি জানি হয়তো ধর্মের ভিত মজবুত করার জন্য প্রয়োজন নাস্তিকের অপবিত্র রক্ত। এদের দোষ কি জানেন? এরা চেয়েছিল একটু অন্যরকম, হিংসা-বিদ্বেষহীন, অসাম্প্রদায়িক সমাজ, চেয়েছিল বাক-স্বাধীনতা, চেয়েছিল নিজের মতামত প্রকাশের অধীকার। হ্যা! তথাকথিত ধর্মব্যবসায়ী, রাজনীতিক আর ক্ষমতাধরদের জন্য এরা কিন্তু চরম হুমকি।
লালসালু উপন্যাসটা তো অনেকেরই পড়া আছে। লেখক উপন্যাসটিতে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন আধ্যাত্মিক জগত কত সহজে আমাদের মনে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, আর মানুষের এই দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে মজিদের মত একশ্রেনীর মানুষ কিভাবে তাদের স্বার্থসিদ্ধি করে। টগবগে যুবক আক্কাসকে এগিয়ে এসেছিল গ্রামের মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য। চেয়েছিল একটা স্কুল স্থাপন করতে। কিন্তু পারে নি। মজিদ স্কুল বানাতেই দেয়নি। কারণ স্কুল চালু হলে গ্রামের বাচ্চারা শিক্ষিত হয়ে উঠবে আর গ্রামের মানুষ শিক্ষিত হলে তারা আস্তে আস্তে সচেতন হয়ে উঠবে। মজিদ ভালভাবেই জানে সচেতন মানুষকে ও ধর্মের নামে ঠকাতে পারবে না। এই জন্য ধমকিয়ে নিভিয়ে দিয়েছিল আক্কাসকে।
লালসালু প্রথম পড়েছিলাম ক্লাস ফাইভে। বাবার পুরোনো ট্রাঙ্কের মধ্যে পেয়েছিলাম বইটা। ক্লাস ফোর-ফাইভ থেকে এইট পর্যন্ত একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করতাম। তারপর থেকে পুরোই নাস্তিক। একেশ্বরবাদে যখন বিশ্বাস করতাম তখনও কোনো একদিনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম পালনে চিন্তা করিনি। ক্লাস নাইনে উঠে ইচ্ছা হলো লালসালুর একটা প্রাক্টিক্যাল করে ফেলি। শুরু করলাম ব্লাক ম্যাজিক নিয়ে পড়াশোনা। এরপর বন্ধুদের বললাম আমি ব্লাক ম্যাজিক পারি; ব্লাক ম্যাজিক দিয়ে সবার সব সমস্যা সমাধান করে দিব। ব্যাস! অনেকেই বিনা বাক্যে বিশ্বাস করলো। অনেকেই হেল্প চাইতো। আসলে কিছু সিম্পল সাইকোলজী দিয়ে খুব সহজেই কাউকে বোকা বানানো যায়। ট্রিকগুলো ইউস করা শুরু করলাম। অনেকে রীতিমত মুরিদ হয়ে গেল। অনেকেই শিখতে চাইলো আমার কাছে। এভাবে চলল সাড়ে তিন বছর। আমার এক্সপেরিমেন্ট সফল।
ধর্মগুরুরা রীতিমত বোকা বানাচ্ছে সাধারণ মানুষদের। প্ররোচিত করছে বিভিন্ন অমানবিক কাজ। কারণ এতেই এই ভন্ডগুলোর লাভ।
ধর্মের দোহাই দিয়ে হত্যা করছে মুক্তমনা ব্লগারদের। এই মৌলবাদীরা জানে সংখ্যালঘু এই সম্প্রদায়ই পারে এই কুসংস্কার-অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে কথা বলতে, সচেতনতা জাগাতে। কিন্তু ভন্ডগোষ্ঠিও জানে মানুষ সচেতন হলে আর অন্ধবিশ্বাসে ভুলবে না।
জাতি আজ ধর্মের বেড়াজালে বন্দি। কিছু মুক্তমনা বেড়াজাল ছিন্ন করার চেস্টা করলে উগ্রবাদী দলগুলো তাদের দেহ ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।অভিনব কায়দায় বুদ্ধিজীবী নিধন চলছে। যাকে খুন করা হবে প্রথমে তাকে নাস্তিক বলে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এরপর খুন করা হচ্ছে তাকে। নাস্তিক মরছে বলে কারোর কিছু আসছে যাচ্ছে না। সবাই বলছে ওই ব্যাটা তো নাস্তিক ছিল। এক-দুইটা নাস্তিক মরলে সমাজের কি আসে যায়!
যাদের ব্লগিং করার অভিযোগে মারা হয়েছে, যারা মারছে তারা অজুহাত দেখাচ্ছে ওরা ধর্ম অবমাননাকারী ছিল। ব্যাস! এতেই প্রশাসন, সমাজ সব চুপ। প্রশাসন বলছে সীমা লঙ্ঘন না করতে! নিজের চিন্তাতেও সীমা! মুক্তচিন্তায় সীমা!
বাংলাদেশে যদি এখন আবার মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন হয় তাহলে হয়তো যুদ্ধ করতে আসবে শুধু অভিজিতরাই। কারণ দেশ আজ ধর্মের ইস্যুতে বিভক্ত।
বেছে বেছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের, প্রগতিশীল, মুক্তমনাদেরই খুব করা হচ্ছে। খুনিদের লক্ষ্য তো এখন আমাদের কাছে পরিষ্কার। ওরা দেশকে চেতনা শূণ্য করতে চাচ্ছে। ওরা চায় না দেশে কোনো প্রগতিশীল মানুষ বেচে থাকুক। কোনো প্রগতিশীল মানুষ থাকলে ওদের মগের মুল্লুক প্রতিষ্ঠায় বাধা পড়বে এটাই ওদের ভয়।
সমাজের গোড়া ঘূনে ধরেছে; ধর্মের ঘূন, বিবেকহীনতার ঘূন।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার অন্যতম প্রধাণ কারণ বলতে গেলে যুদ্ধপরাধীদের বিচার।
যুদ্ধপরাধীদের বিচারের ইস্যুতে সরকার সবথেকে বেশি সাপোর্ট পেয়েছে এই নাস্তিক-ব্লগার গোষ্ঠীর কাছ থেকে। কিন্তু ব্লগারদের এই দুসময়ে সরকার,প্রশাসন কেউ তাদের পাশে নেই।
খুব জানতে ইচ্ছা করে একজন ব্যক্তি কেন ধর্মের সমালোচনা করতে পারবে না? কেন? ধর্মকে কেন সকল সমালোচনার উর্ধে রাখা হবে। পৃথিবীতে বর্তমানে প্রচলিত ধর্মের সংখ্যা প্রায় ৪২০০। সব ধর্মের মানুষ শুধু নিজের ধর্মকেই সঠিক মনে করে। প্রতিটা ধর্মের মধ্যে আছে আবার বিভিন্ন মতাদর্শ। এক মতাদর্শের মানুষ অন্য মতাদর্শকে মানে না। অসংখ্য ধর্ম হয়তো বিলীন হয়ে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু বিলীন হয়নি ধর্মের আস্ফালন। সব ধর্মের মানুষ দাবি করে তার ধর্ম ঈশ্বর প্রদত্ত।
কারোর ঈশ্বর গরু খেলে কিছু বলে না, আরেকজনের ঈশ্বরের কাছে আবার গরু খাওয়া চরম পাপ। এক ঈশ্বর শুকর খেলে কিছু বলে না কিন্তু আরেক ঈশ্বর শুকরকে করেছে নিষিদ্ধ। জানিনা এই শুকর, গরুর উপর ঈশ্বরের কিসের এত আক্রোশ।
এই ব্লগার গোষ্ঠির অন্যায় ছিল এরা যুক্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে ধর্মের ত্রুটিগুলো আলোয় এনেছিল।
যুদ্ধ আসন্ন। কিন্তু এবারের যুদ্ধে বাঙালি জিতবে না। যুদ্ধ করার মানুষ খুব কম। হয়তো তাও থাকবে না। রাখবে না ওরা। কিন্তু সত্য চিরঞ্জিব।
'সত্যমেব জয়তে'

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


