সমাজে দুষ্ট নেতৃত্ব সৃষ্টি হওয়ার
জন্য ইমাম-আল্লামারাই দায়ী
কাউসার ইকবাল
হযরত মোহাম্মদ (সা.) তার সমাজে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন এ কারণেই যে, তিনি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে চেষ্টা করেছিলেন এবং নামাজ পড়ানোর বিনিময়ে অর্থ রোজগারের কোন চিন্তা করেননি। তার অনুসরণকারী ইমামরাও যদি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে চেষ্টা করতেন ব্যবসা বা অন্য কোন পেশা বেছে নিয়ে, তাহলে তারা সমাজের সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারতেন। কিন্তু তারা সে বিষয়ে সচেষ্ট না হওয়ায় সমাজের নেতৃত্ব স্রষ্টার অনুগামীদের মধ্যে না থেকে শয়তানের অনুগামীদের মধ্যে চলে গেছে। আর সেই সুযোগে সমাজের ভণ্ডরাই এখন ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব যার যার সমাজে।
এ বিষয়টাও লক্ষণীয় যে, ইমাম পদবীধারীরা সমাজের নেতৃত্ব দিতে অপারগ হলেও মোহাম্মদ (স.) এর প্রতি তাদের রয়েছে অগাধ প্রেম। তাঁর ওফাত দিবসে বিশাল বিশাল জসনে জুলুস বের করে নবীপ্রেম দেখাতে তাদের সেকি প্রাণান্ত চেষ্টা! নবীর বিষয়ে তাদের ধর্মীয় অনুভূতিও প্রবল। নবীর বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তার কল্লা কেটে নিতেও তারা একমুহূর্ত ভাবার অবকাশ নেয় না। কিন্তু ‘মোহাম্মদ’ নাম আজকাল চোর-ডাকাত-ব্যভিচারী-খুনি-দুর্নীতিবাজ-ভণ্ড-প্রতারক অনেকেই ব্যবহার করছেন। এতে করে চোর-ডাকাত-ব্যভিচারী-খুনি-দুর্নীতিবাজ-ভণ্ড-প্রতারকসহ নানা অপরাধে অপরাধীরা যে ‘মোহাম্মদ’ নামের বলাৎকার করছেন, এ বিষয়ে তাদের কোন ধর্মীয় অনুভূতি জাগে না। ‘মোহাম্মদ’ নাম ব্যবহার করলে তার যে পাপ করার কোন অধিকারই নেই, এ বিষয়ে কাউকে কোনপ্রকার জ্ঞান দিতে পর্যন্ত দেখা যায় না। যে কারণে থানায় অপরাধীর নাম রেকর্ডে কিংবা পত্রিকার পাতায় ছাপানোর সময় বিভিন্ন অপরাধে অপরাধীর নামের সঙ্গে ‘মোহাম্মদ’ নাম ছাপা হচ্ছে। এতে যে কার্যত মোহাম্মদকে ভীষণভাবে অপমানিত করা হচ্ছে, তা বোঝার জ্ঞান ‘আল্লামা’ খেতাবধারীদেরও কেন যে হলো না, তা সত্যিই বিস্ময়কর। আল্লামাদের নবীপ্রেম নিয়ে তাই সন্দেহ পোষণ করা যায়। আল্লামারা ঢাকার বায়তুল মোকাররমের সামনে অনেক সময়ই বিক্ষোভ মিছিল বা সমাবেশ করেছে। কিন্তু বায়তুল মোকাররমের এক মাইলের মধ্যেই চারপাশে শত রকমের অপরাধ ঘটলেও সেসব অপরাধ বন্ধে বা অপরাধীদের শাস্তি দিতে কোনপ্রকার ভূমিকা দেখা যায়নি। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে যে শঠতা-ভণ্ডামি, তা প্রতিরোধেও তাদের কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি। আর ‘মোহাম্মদ’ নাম ধারণকারী অনেক রাজনীতিবিদের মুখ দিয়ে সমাজে অশান্তি ছড়ানোর সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা চলছে। কিন্তু এ ধরনের ব্যক্তিদেরও যে ‘মোহাম্মদ’ নাম ব্যবহারের অধিকার নেই, সে বিষয়েও আল্লামাদের কিংবা নবীপ্রেমিক দাবিদারদের কখনো সোচ্চার হতে দেখা যায়নি। কাজেই সমাজে অশান্তি ও পাপ দিনের পর দিন বেড়েছে। সেইসঙ্গে কলুষিত হয়েছে ‘মোহাম্মদ’ নামটিও।
স্কুলের শিক্ষার্থীদের ক্লাসে হাজির থেকে মূল পাঠ গ্রহণের জন্য যথাসময়ে পিটি ক্লাসে উপস্থিত হবার কড়াকড়ি আরোপ করেন প্রধান শিক্ষক বা পিটি’র শিক্ষক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, পিটি ক্লাসে যে নিয়মিত হাজির থাকে, সে-ই বিদ্যালয়ের মূল পাঠে ভালো বা মেধাবী ছাত্র। ধর্মগুলোতেও ধর্মের মূল পাঠ শেখানোর জন্য ‘পিটি ক্লাস’র ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু ‘পিটি ক্লাস’ এ নিয়মিত হাজির থাকা ব্যক্তিই যে উত্তম ধার্মিক হবেন, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। উত্তম ধার্মিক সে-ই, যে ধর্মের মূল পাঠ গ্রহণ করে মনুষ্যত্ববাদী হয়েছে ও পাপমুক্ত থেকে জীবনযাপন করতে পারছে। এ কথাটা যেমন ‘ধর্মজ্ঞানী’ বলে দাবিদাররা অনেকেই ঠিকমতো বোঝেনি, তেমনি তারা ধর্মগ্রন্থের উপমাগত অনেক কথাও বুঝতে অক্ষম হয়েছে। আবার ‘আমল’ ও ‘ইবাদত’ শব্দের অর্থও ঘুলিয়ে ফেলেছে। ‘আমল’ শব্দের অর্থ হচ্ছে কাজ। ‘নেক আমল’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘ভালো কাজ’। স্রষ্টার প্রতি নির্ধারিত সময় ইবাদত বা প্রার্থনার পর নেক আমল বা ভালো কাজে নিজেদের নিয়োজিত করার কথাই বলা হয়েছে ধর্মে। কিন্তু ভিন্ন কথা বুঝিয়ে মুসলিমদের কর্মবিমুখ করে রেখেছে ইমাম বা ‘আল্লামা’রা, যাতে তাদের ধর্মবাণিজ্যে লাভ হয়। মসজিদের দানবাক্সে যেন বেশি করে অর্থ জমা পড়ে, আর তারা যাতে অধিক অর্থ আয় করতে পারে। এ কারণে সমাজব্যবস্থায় প্রকারান্তরে কর্মবিমুখ শ্রেণী সৃষ্টি হবার পাশাপাশি সমাজে অপরাধপ্রবণতাও বেড়েছে। কোরআন-বাইবেলে প্রথম মানব আদম (আ.) ও প্রথম মানবী ইভ বা হাওয়া (রা.)-র যে কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে, তাতে স্রষ্টা মূলত মানুষকে এটা বোঝানোর চেষ্টাই করেছেন যে, মানুষের জীবনব্যবস্থা তিনি এমনভাবে সাজিয়েছেন যাতে জন্মলাভের পর মানুষ একটা সময় পর্যন্ত নগ্নতা সম্বন্ধে জ্ঞান রাখবে না; সেই সময়টা পর্যন্ত তার জীবনটা স্বর্গীয়। এরপর যখন তার নগ্নতা সম্বন্ধে বোঝার জ্ঞান হবে, তখন তাকে কাজ শুরু করতে হবে। সে সেই সময়টায় কাজের মাধ্যমে নিজেকে যেভাবে গড়ে তুলবে তার ওপরই নির্ভর করবে তার পরবর্তী জীবনের সুখ-দুঃখ। সেইসঙ্গে এ কাহিনীতে মানুষের জন্য এ নির্দেশনাও রয়েছে যে, তোমরা যখন স্বামী-স্ত্রীতে সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করবে, তখন তৃতীয় কোন ব্যক্তি স্বর্পের ন্যায় বিষ নিয়ে কিংবা ইবলিসের ন্যায় তোমাদের প্রলুব্ধ করে তোমাদের সংসার ভাঙতে বা অন্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সচেষ্ট হবে। তার ক্ষতি থেকে তোমরা সতর্ক থেকো এবং তোমাদের যে অবস্থায় রাখা হয়েছে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা কোরো। তাহলে তোমরা দুষ্টদের বন্ধু সেজে ক্ষতি করা থেকে রক্ষা পাবে। অর্থাৎ, কোরআন-বাইবেলের কাহিনীতেও মানুষকে কাজের ওপর জোর দেয়ার শিক্ষা দেয়া হয়েছে। কিন্তু ধর্মের ভুল শিক্ষা দিয়ে নিজেরা লাভবান হওয়ার চেষ্টায় ইমাম বা আল্লামা শ্রেণী সমাজকে দুষ্ট নেতৃত্বের কাছে যেমন সঁপে দেয়ার জন্য দায়ী, তেমনি মানুষের স্বাভাবিক সুখ-শান্তিলাভেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী।
মোদ্দাকথায়, এখনকার ইমাম বা আল্লামা দাবিদার শ্রেণী তাদের ওপর অর্পিত ধর্মীয় দায়িত্ব অনুধাবনে ও পালনে ব্যর্থ। তাই তাদের উচিত, স্ব স্ব পেশাগত অবস্থান ত্যাগ করে নতুন পেশা গ্রহণে সচেষ্ট হওয়া। যাতে সমাজকে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল করার দায়িত্ব সৎ-স্বাবলম্বী ও নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা গ্রহণ করতে পারে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





