somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

কাওসার চৌধুরী
জন্মসূত্রে মানব গোত্রভূক্ত; এজন্য প্রতিনিয়ত 'মানুষ' হওয়ার প্রচেষ্টা। 'কাকতাড়ুয়ার ভাস্কর্য', 'বায়স্কোপ', 'পুতুলনাচ' এবং অনুবাদ গল্পের 'নেকলেস' বইয়ের কারিগর।

বক্তৃতা বা গলাবাজি, একটি জাতীয় ঐতিহ্য (ফিচার)

০৫ ই মে, ২০১৮ রাত ২:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ছোটবেলায় একটি নাটকে দেখেছিলাম একজন লোক খাওয়া-দাওয়া, গোসল-টয়লেট ও ঘুমের পর সার্বক্ষণিক সময়ে শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে বেড়ায়। সামান্য উঁচু কোন স্থাপনা, মাটির ঠিলা, উচু ব্রিজের রেলিং এমনকি সিড়ি ওয়ালা বারান্দা দেখলেও রাজনৈতিক মঞ্চ মনে করে শুরু করতো বক্তৃতা। এতে সামনে দর্শক থাকুক বা না থাকুক তার কিছুই যায় আসে না। বাঙালিদের অনেকগুলো ট্রেডমার্ক গুণাবলীর মধ্যে এই 'বক্তৃতা' করার নেশাটা কিন্তু বেশ! এজন্য গলাবাজ বক্তাদের কদর এ বঙ্গে আগেও ছিল, আর এখন তো তা গাণিতিক হারে বাড়ছে।

ফলশ্রুতিতে, দেশের মোবাইল কোম্পানিগুলোর ব্যবসা দিন দিন হু হু করে বাড়ছে। আর মাইকের সামনে যেতে পারলে তো কোন কথাই নেই। বার বার নোট দিয়ে, পেছন থেকে টানাটানি করেও বক্তাকে ক্ষান্ত করা যায় না। কতশত কথা যে বুকের মধ্যখানে জমিয়ে রেখেছেন! কথার পংক্তিমালা মিষ্টি মুরির মতো ফট ফট করে ফুটতে থাকে।

কিছুদিন আগে আমার পরিচিত একজন ভদ্রলোকের আমন্ত্রণে মঞ্চ নাটক উপভোগ করতে একটি উপজেলা শহরে গিয়েছিলাম। এই এলাকায় আগে কোনদিন যাওয়া হয়নি, এজন্য আগ্রহ নিয়ে সময় করে যাই। এছাড়া, ভাল মানের মঞ্চ নাটকের প্রতি আমার একটা আলাদা টান আছে। এসব নাটকে বাংলার মাটি, মানুষ ও জনপদের একটি বাস্তব দৃশ্য থাকে, আত্মার খোরাক থাকে। সবচেয়ে বড় কথা বাঙালির হাজারো বছরের কৃষ্টি-কালচার ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের অংশ হল মঞ্চ নাটক।

নাটকটি আয়োজন করেছে স্থানীয় একটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী। মঞ্চ, লাইটিং ও গ্যালারী সবকিছু বেশ পরিপাটি মনে হল। নাটকটি মঞ্চায়ন হওয়ার কথা সন্ধ্যা সাতটায়। এজন্য তাড়াহুড়ো করে বাসা থেকে যাত্রা করি যাতে সময়ের আগে পৌছা যায়। অনুষ্ঠান শুরু হলো সাতটা বাজার পনের বিশ মিনিট পর। কিন্তু নাটক নয় বক্তৃতা দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হল! আরো স্পষ্ট করে বল্লে রাজনৈতিক বক্তৃতা!!


যদিও দর্শকদের কারো এসব বক্তৃতা শুনার আগ্রহ ছিল না। মঞ্চায়ন করা হল প্রায় ত্রিশ-পয়ত্রিশ জন নেতাকে। উপজেলা, পৌরসভা, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতারা পর্যন্ত আছেন তাতে। বেশিরভাগ নেতাই বয়সে তরুণ। প্রধান অতিথি আগামী সংসদ নির্বাচনে এলাকার সম্ভাব্য সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী। যেহেতু এই এলাকায় আগে কোনদিন যাইনি এজন্য মঞ্চে আসীন কোন নেতা আমার পরিচিত ছিলেন না।

দর্শকের আসনে বসে একে একে বক্তৃতা শুনতে লাগলাম। রাজনীতি করি না বলে রাজনৈতিক সভা সমাবেশের বক্তব্যগুলো কেমন হয় শুনার সুযোগ হয় না। যদিও নাটকটি উপভোগ করা মূল উদ্দেশ্য ছিল তারপরও নেতাদের বক্তৃতা শুনতে ভালই লাগছিল। মঞ্চে আসীন সব নেতা ছাড়াও বাইরে থেকে বেশ কয়েকজন নেতাও বক্তৃতা করেন। সময় যত গড়াচ্ছিল মানুষের ধৈর্যের সীমা তত ল্যুজ হচ্ছিল। একজন নেতাকে দেখলাম মাত্র দু'টি কথা বলতে গিয়ে পাক্কা বাইশ মিনিট নন স্টপ বক্তৃতা করলেন!

অবাক করা বিষয়, বক্তারা মঞ্চে উপস্থিত সিনিয়র নেতাদের পরিচয় ও তোয়াজ করতেই বেশি সময় ব্যয় করলেন। বেশির ভাগ বক্তার মুখ থেকে একজন অতিথিকে নিয়ে বেশ সুনাম করতে শুনলাম। যেহেতু এই নেতাকে আমি চিনি না তাই স্থানীয় একজন দর্শকের কাছে তার সম্বন্ধে জানতে চাইলাম। লোকটি বল্লে, উনি একজন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান। উপজেলা পর্যায়ের একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা। উপজেলা ও পৌর এলাকার রাজনীতি তার ইশারায় চলে। এই নাটকটি মঞ্চায়নে সহযোগিতা করতে তিনি এক লক্ষ টাকা অনুদান হিসাবে দিয়েছেন। এতক্ষণ পরে বুঝলাম এই নেতাকে এত তোষণের আসল হেতু!

প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা পর বক্তৃতার পালা শেষ হল। আমাকে আমন্ত্রণকারী ভদ্রলোকও বেশ বিরক্ত ছিলেন অপ্রয়োজনীয় এসব বক্তব্যের জন্য। অবাকের বিষয় হলো, যে উদ্দেশ্যে অতিথিরা মঞ্চে উপবিষ্ট হলেন, বক্তৃতা করার সুযোগ পেলেন সে বিষয়টি নিয়ে (মঞ্চ নাটক) একটি কথাও কোন নেতার মুখ থেকে বের হল না! সবাই শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতা দিলেন। যদিও আয়োজনটি রাজনৈতিক কোন দলের ছিল না।

এসব বক্তৃতায় দলের গুণকীর্তনের পাশাপাশি চলে অন্য মত ও গোষ্ঠীর প্রতি তীব্র আক্রমণ। বক্তা অতি আবেগী হয়ে উত্তজিত হয়ে পড়লে তা কখনো গালিতে রূপ নেয়। এসব গলাবাজির সাথে গালি দেওয়া, অন্যকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করা, মিথ্যা কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করা ইত্যাদি আমাদের দীর্ঘ দিনের সংস্কৃতির অংশ। অতএব বক্তৃতা বিবৃতির সাথে এগুলো অবধারিতভাবে আসে। ভাষা ও সাহিত্যের মতো জাতীয় ঐতিহ্য নিয়মিত চর্চা না হলে তা হারিয়ে যাওয়ার চান্স থাকে। তাই বক্তাদের এ চর্চাকে আমাদের সাধুবাদ জানাতেই হয়।


অনেকে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে রীতিমত চাঁদা দিয়ে অতিথি হয়ে নিজের জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য জাতির সামনে তুলে ধরেন। যাতে নিজের প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি জাতীয় ঐতিহ্যটি রক্ষা পায়।

মনে আছে একবার মানবাধিকার বিষয়ে একটি সেমিনারে গিয়েছিলাম। প্রধান অতিথি ছিলেন সরকারের একজন মন্ত্রী। অবাক হয়ে দেখলাম বক্তৃতা করার সময় মানবাধিকার নিয়ে মন্ত্রী মহোদয় টু শব্দটি পর্যন্ত করলেন না। সারাক্ষণ শুধুই সরকারের উন্নয়ন, দলীয় প্রধানের তোষণ আর বিরোধী দলের বদনাম করলেন। তাহলে কী মন্ত্রী মহোদয় জানতেন না কী বিষয়ে সেমিনার? নাকি প্রস্তুতি ছিল না? তবে অতিথিদের মধ্যে দুই-চারজন ব্যতিক্রম ছিলেন।

রাজনীতিবিদদের সব জায়গায় রাজনৈতিক বক্তৃতা দেওয়া কী শোভা পায়? অথবা স্থান, কাল, পাত্র না বুঝে শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতা দেওয়াই উনাদের একমাত্র কাজ? আমি বুঝতে পারিনা দলীয় কোন সভা সেমিনার ছাড়া অন্য অনুষ্ঠানেও এসব গুরুত্বপূর্ণ নেতারা রাজনৈতিক বক্তৃতা দেন কেন? এটা কি অজ্ঞতা না অদূরদর্শিতা? না বিষয় ভিত্তিক জ্ঞানের অপ্রতুলতা? নাকি কোন বিষয়ে অনুষ্ঠান পূর্বে থেকে না জানা?

আমেরিকার সিলিকন ভ্যালিকে যেমন পৃথিবীর তথ্য প্রযুক্তির হাব হিসাবে ধরা হয় ঠিক বাংলাদেশও রাজনীতিবিদ বানানোর একটি ফ্যাক্টরী। আমরা জাতি হিসাবে বাচাল হওয়ায় চাপাবাজিটা খুব ভাল পারি। নিজেদের ঢোল পেটাতে আমাদের বিকল্প জাতি পৃথিবীতে আর একটিও নেই। কিছুই না করে কৌশলে সব কৃতিত্ব নিতে চাই। অথচ যারা সমাজে ভাল কাজ করে তাদের উৎসাহ দেই না, তাদের কৃতিত্বকে আড়াল করার চেষ্টা করি। বড় নেতার সাথে সেলফি তুলে নিজের প্রচার প্রচারণা করি। আত্মতুষ্টিতে ভূগী। এটা কী আমাদের আইডেন্টিটি ক্রাইসেস?

শুনেছি জ্ঞানী ও বিবেকবান মানুষেরা ধীরস্থির থাকেন। মিতভাষী ও প্রচার বিমুখ হন। মঞ্চে বক্তৃতা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। অতিথি হতেও তাদের তেমন আগ্রহ নেই। নিজের ঢোল নিজে পেটান না। তাঁর কর্মই তাকে মানুষের কাছে পরিচিত করে, সমাজে সম্মানের আসন দেয়। তাঁরা অপ্রয়োজনীয় কথা বলেন না এমনকি শুনতেও পছন্দ করেন না। তাদের চাপার জোর নেই। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, জাতি হিসাবে আমারা এসবের বিপরীত। তাহলে এটা কি বাঙালিদের জ্ঞানের গভীরতার অভাবের লক্ষণ?



ফটো ক্রেডিট,
গুগল।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মে, ২০১৮ রাত ৩:২২
২৪টি মন্তব্য ২৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"কর্পোরেট_ফ্যাক্টসমুহ"

লিখেছেন মামুন রেজওয়ান, ২৮ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৪

"কর্পোরেট_ফ্যাক্ট_২১"



সব সময় ইন্টার্ভিউ দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমরা জানতে পারি অনলাইনে। কিন্তু যারা ইন্টার্ভিউ নেন বিভিন্ন পজিশনের জন্য তাদের অভিজ্ঞতা খুব একটা জানা হয়না আমাদের। তাই আমরাও যারা মোটামুটি এক্সপেরিয়েন্স... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা: (দ্বিতীয় পর্ব)

লিখেছেন মৃত্যুঞ্জয়, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ২:০০

কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম?

দ্বিতীয় পর্ব: মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার বিভাজন এবং অসম প্রতিযোগিতা

একটি শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় প্রাথমিক স্তর থেকে। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছানোর পর থেকেই শুরু... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবদাস, কালজয়ী উপন্যাস এবং চিত্রনাট্যের পটভূমি

লিখেছেন মেহবুবা, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:২৮


প্রথম ১৯২৮ সনে নির্বাক "দেবদাস" মুক্তি পায় ফনী বর্মা এবং তারকবালা অভিনীত ছিল সেটি। এরপর প্রমথেশ বড়ুয়া এবং যমুনা বড়ুয়া অভিনীত সবাক দেবদাস মুক্তি পায় ১৯৩৫ সনে। তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৪৩




যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে
শান্ত গৌরবে, সেই আত্মারা কোথায় বেঁচে রয়।
দয়ার প্রতিটি বীজ সর্ন্তপণে বপন করা হয়,
সপ্তাকাশে উজ্জ্বল ফসল তবে অবধারিত রয়।

সাত আকাশের চরাচরে , ছায়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কেমনের দিনে

লিখেছেন শাওন আহমাদ, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৫



মাঝেমধ্যেই মনের ক্যানভাসটা কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে যায়। পৃথিবীর সমস্ত রং হারিয়ে যায় অচেনা পথের বাঁকে। কোনো সংকেত ছাড়াই একরাশ এলোমেলো বিষণ্ণতা এসে জেঁকে বসে মনের কার্নিশে। চারপাশের চেনা জগৎটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×