
মাঝে মাঝে মনে হয় মুক্তিযুদ্ধ করে লাভটা কী হলো? মধ্য থেকে ৩০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারালো, ২ লক্ষ মা বোন ইজ্জত হারালো। সংখ্যালঘু (আমি এই শব্দটি ব্যবহার করি না) মানুষজন নিজের বাপ-দাদার ভিটে মাটি হারালো। পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের শোষণ করতো, এখন বিএনপি-আওয়ামীলীগ-জাতীয়পার্টি-বাম-ডানরা আমাদের শোষণ করে। তখন পশ্চিম পাকিস্তানীরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতো, এখন এরাও তাই করছে। আমাদের সাধারন জনগনের পাকিস্তান আমলে যে অবস্থা ছিল এখনো তাই আছে। আমরা জনগন বরাবরই বঞ্চিত, শোষিত।
মাঝখান থেকে মুক্তিযুদ্ধকালে একদল পাকিস্তানীদের পক্ষ নিয়ে হলো রাজাকার; আরেকদল স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে পাকিস্তানীদের কাছে হলো গাদ্দার। প্রভাবশালী দেশগুলো এখন সুযোগ পেলে আমাদের এখনো শোষণ করে, নসিহত দেয়, আইন শেখায়, গণতন্ত্রের সিলেবাস পড়ায়। হায়রে স্বাধীনতা, হায়রে মুক্তিযুদ্ধ পুরোটাই সাধারন জনগনের সাথে রাজনৈতিক ধোকাবাজি। এতে একটি সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠী ছাড়া সাধারন মানুষের মুক্তি মিলেনি।
বিশ্ব বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসের নাম আমরা অনেকেই জানি। খৃষ্টপূর্ব প্রায় ৪০০ বছর পূর্বে (২৪০০ বছর আগে) জন্ম নিলেও তাঁর জীবন দর্শন ও শিক্ষা পদ্ধতি আজো বিশ্বব্যপী সমাদৃত। বিখ্যাত এ দার্শনিকের জীবনী সম্বন্ধে আমরা তেমন কিছুই জানি না। শোনা যায় যেখানে তিনি মানুষকে জমায়েত হতে দেখতেন জোর করে হলেও তাদের নিজের জীবন দর্শন শেখাতেন, শিক্ষা দিতেন।

আরেক বিখ্যাত গ্রীক দার্শনিক প্লেটো তাঁর ছাত্র ছিলেন। আর এরিস্টটল ছিলেন প্লেটোর ছাত্র। এজন্য প্লেটো ও এরিস্টটলের দর্শনে সক্রেটিসের প্রভাব ছিল বেশ। সক্রেটিসের কয়েকটি দর্শনীয় উক্তি আমাকে সব সময় খুব আন্দোলিত করে। এগুলো হলো-
(১) জ্ঞানের শিক্ষকের কাজ হচ্ছে কোন ব্যক্তিকে প্রশ্ন করে তার কাছ থেকে উত্তর জেনে দেখানো যে জ্ঞানটা তার মধ্যেই ছিল।
(২) তুমি কিছুই জান না, এটা জানাই জ্ঞানের আসল মানে।
(৩) আমি কাউকে কিছু শিক্ষা দিতে পারব না, আমি শুধু তাদের চিন্তা করাতে পারব।
(৪) সত্যিকারের জ্ঞান আমাদের তখই আসে যখন আমরা বুঝতে পারি আমরা আমাদের জীবন এবং আমাদের চারিপাশ সম্বন্ধে কত কম জানি।
(৫) তারা জানে না যে তারা কিছুই জানে না, আমি জানি আমি কিছুই জানি না।
আমাদের সমাজে আজ সক্রেটিসের বড়ই অভাব। আমারা সবাইকে প্রতিনিয়ত শিক্ষা দিতে চাই, উপদেশ গিলাতে চাই। অথচ সক্রেটিস প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বলে গেছেন মানুষকে যেমন শিক্ষা দেওয়া যায় না, ঠিক তেমনি জ্ঞান দেওয়ারও কিছু নেই। আমরা যা ভাবি, নিজেদের মধ্যে লালন করি তা অন্য মানুষের মধ্যেও বিরাজ করে। প্রয়োজন শুধু নিজেদের চিন্তা শক্তিকে কাজে লাগানো, নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাসটা জাগ্রত করা। পাশাপাশি অন্যদেরও।
একজন শিক্ষককে বুঝতে হবে, আমি যা জানি বা যে জ্ঞান অর্জন করেছি তা অন্যের মধ্যেও আছে। যেমন- আমরা যদি কাউকে কাজটি করলে কেন? প্রশ্ন না করে জিজ্ঞেস করি আচ্ছা, কাজটি করা কী তোমার ঠিক হলো অথবা কাজটি করা কী তোমাকে মানায়? তাহলে সে নিজে থেকে বুঝতে পারবে কাজটি করা তার ঠিক হয় নাই। আসল কথা হলো মানুষের বোধ শক্তিকে জাগ্রত করা। এটাই হচ্ছে প্রকৃত শিক্ষা।

অনেকের মনে হতে পারে লেখাটি শুরু করলাম একটি বিষয় নিয়ে কিন্তু মাঝে সক্রেটিসকে নিয়ে আসলাম কেন? আসলে উল্লেখিত দর্শনগুলো দিয়ে উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তর খোজার চেষ্টা করতে সক্রেটিসকে টেনে আনা।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিহত ত্রিশ লক্ষ মানুষ ও দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত মহান স্বাধীনতার চেতনা কী এতো বছর পরও আমরা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি? স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা কী শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের নামের তালিকা জাতির কাছে উপস্থাপন করতে পেরেছি? উত্তর হলো, না পারিনি। আসুন নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করি, এগুলো করা কী উচিৎ ছিলো না?
আপনি কী জানেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ত্রিশ লক্ষ মানুষের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা? অথচ বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক খেতাব প্রাপ্ত অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। সাতজন বীর শ্রেষ্ঠের মধ্যে একজনও বেসামরিক যোদ্ধা নেই! আচ্ছা, বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে অন্তত একজন বেসামরিক যোদ্ধা থাকা কী উচিৎ ছিল না?
আরেকটি কথা, যে মানুষটি জাতিকে স্বাধীন করতে হাসিমুখে নিজের জীবনটি উজাড় করে শহীদ হলো তার চেয়ে বড় মুক্তিযোদ্ধা কী কেউ হতে পারে? তাহলে শহীদ বীর সেনাদের মধ্যে এত শ্রেণীভেদ কেন? আচ্ছা, এই ত্রিশ লক্ষ শহীদই আমাদের বীর শ্রেষ্ঠ হলে কেমন হতো?

আমরা যাদেরকে সংখ্যালঘু ও উপজাতি বলি তারা কী আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরে রিফিউজি হিসাবে আমাদের দেশে এসেছে? বাঙালি বলতে কী আমরা শুধুই সংখ্যাগুরুদের বুঝি? নাকি, এই বাংলায় শত শত বছর থেকে বসবাসরত হিন্দু-মুসলিম-পাহাড়ী সবাইকে বুঝি? মুক্তিযুদ্ধে কী কোন হিন্দু-পাহাড়ী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না? কোন হিন্দু-পাহাড়ী কী মুক্তিযুদ্ধে মারা যান নাই? কোন সংখ্যালঘু বীরাঙ্গনা ছিলেন না?
উত্তর যদি হ্যাঁ হয় তাহলে তাদের সংখ্যালঘু বলি কেন? আচ্ছা, আমরা কী পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হইনি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে? আপনাদের কী মনে হয় না আইন করে সংখ্যালঘু শব্দটি বাদ দেওয়া হোক? এছাড়া উপজাতিরা কী শত শত বছর থেকে আমাদের দেশে বসবাস করছে না? আসুন আমরা জোর গলায় বলি আমাদের স্বাধীন বাংলায় কেউ সংখ্যালঘু নয়, কেউ উপজাতি নয়, কেউ পাহাড়ী নয়। সবাই আমরা সংখ্যাগুরু। সবাই সম মর্যাদায়, সম অধিকারে এক সাথে বসবাস করবো এই স্বাধীন বাংলায়। দেশটা আমার নয়, আমাদের। এটাই হোক সবার প্রতিজ্ঞা।
আমরা খুব আবেগ প্রবণ জাতি। এজন্য কাজের সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা হার্ট/হৃদয় দিয়ে সিদ্ধান্ত নেই। আমরা বুঝি কম, কিন্তু বলি অনেক বেশী। হার্ট হচ্ছে আবেগ অনুভূতির জায়গা। আর মাথা হলো চিন্তা শক্তি বিকশিত করার জায়গা, গবেষণার জায়গা, উদ্ভাবনের জায়গা, বুদ্ধিভিত্তিক চর্চার জায়গা। আচ্ছা, আমরা যে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলকে, দলের প্রধান নেত্রীদের এত সমর্থন করি, তাদের আদেশ উপদেশ বেদ বাক্য হিসাবে মনে করি এগুলো কী অতি আবেগী মনের ফসল নয়? সত্যি কী আমরা ভাল মন্দ যাচাই বাচাই করে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য জান কুরবান করি? নিজের জীবন বিপন্ন করে দলবাজি করি, মানুষকে হত্যা করি, গাড়িতে পেট্রোল বোমা ছুড়ি, সন্ত্রাস করি। এগুলো কী আমাদের করা উচিৎ?
দলগুলো যখন ক্ষমতায় থাকে তখন বিরোধী শিবিরে হামলা-মামলা, গ্রেফতার বাণিজ্য ও দিনের পর দিন শুধু রাজনীতি করার অপরাধে তাদের বাড়ি ছাড়া করি, তাদের ব্যবসা বাণিজ্য তছনছ করি। এগুলো কী সত্যি গণতান্ত্রিক নিয়মের মধ্যে পড়ে? এতে কী সমাজে, রাজনীতিতে চরম ঘৃণা ও প্রতিহিংসা ছড়ায় না? আমরা কী একবারও ভাবছি ক্ষমতার পালাবদলে আমাদেরও এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। যে ছেলেটি শুধু বিরোধী রাজনীতি করার অপরাধে জেল-জুলুমের স্বীকার হল সে ছেলেটি নিজের জান বাজি রেখে তার দলকে পুনরায় যে করেই হোক ক্ষমতায় আনার চেষ্টা করবে নিজের মুক্তির আশায়। এটা যতটুকু না তার দলপ্রেম তার চেয়ে অনেক বেশি নির্যাতন, প্রতিহিংসা ও মামলা-হামলা থেকে বাঁচার হাতিয়ার।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের গুটিকয়েক মানুষ স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। দেশের মানুষকে হত্যা, ধর্ষণ ও সম্পদ লুটপাটে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে এদের অনেকেই সহযোগিতা করেছিল। এদের মধ্যে কিছু রাজনৈতিক দলও জড়িত ছিল। তাহলে মুক্তিযুদ্ধের পরপর দায়ী এসব রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হলো না কেন? আজ আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, যুদ্ধোপরাধীদের নিয়ে গলা ফাটাই তারাইতো বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে তাদের সাথে হাত মিলিয়ে ক্ষমতায় গেছি। আজো কেন দলগুলোকে আমরা বিচারের আওতায় আনি নাই?
একটি দল নিষিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকার রাখে। নতুন প্রজন্ম, যাদের জন্ম একাত্তরের অনেক পরে তাদের মধ্যে হাজার হাজার মেধাবী তরুন যদি এসব যুদ্ধোপরাধী দলের সমর্থক হয় এবং আদর্শ মনে করে তাহলে এর দায়ভার কার? আমাদের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলগুলো কী পারছে এসব তরুণ মেধাবীদের নিজেদের দলীয় আদর্শের ছায়াতলে ভেড়াতে? না আমাদের মধ্যেও রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা আছে? নাকি দলগুলোর আদর্শের বিচ্যুতির জন্য তরুণ মেধাবীরা বিকল্প রাজনৈতিক জোট খুজছে? সময় এসেছে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার।
আধুনিক পররাষ্ট্র নীতিতে কোন নির্দিষ্ট দেশে, নির্দিষ্ট জোটের তাবেদারীর সুযোগ নেই। দেশগুলো চলে পারস্পরিক আস্থা, অভ্যন্তরীন ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ্য, সামরিক কৌশল ও অর্থনৈতিক মুক্তির ভিত্তিতে। পৃথিবীর কোন দেশ সারা জীবন একই পররাষ্ট্র নীতি মেনে চলে না। আধুনিক পররাষ্ট্র নীতিতে যেখানে স্বার্থ ফুরিয়ে যায়, দেশগুলোও আস্তে আস্তে নতুন নীতি গ্রহণ করে।
এমনও দেখা যায় যারা যুগের পর যুগে একে অন্যের বিরোধিতা করেছে তারাও আজ পারস্পরিক বন্ধু হয়ে গেছে। এখানে দেশের স্বার্থটাই আসল। পররাষ্ট্র নীতিতে শত্রুর শত্রু বন্ধু হয়, আবার বন্ধুর শত্রুও শত্রু হয়। ভারত চীনের শত্রু, আবার পাকিস্তান ভারতের শত্রু। এজন্য পাকিস্তান চীনের বন্ধু। ঠিক তেমনি যুক্তরাষ্ট্র চীনের শত্রু হওয়ায় ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ভারত ও চীন উভয়ের বন্ধু! মোট কথা তাবেদরীর রাজনীতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। সম মর্যাদা ও সম অধিকারের ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনাতি সাজাতে হবে। এতে বিশ্বের দরবারে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, সরকারের প্রতিও জনগনের আস্থা বাড়বে।।

ফটো ক্রেডিট,
গুগল।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মে, ২০১৮ ভোর ৪:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



