এক সুবিস্তৃত জনমানবহীন ধূধূ মরুময় প্রান্তর। আর অতিদূরে বৃক্ষহীন , ঘাসহীন পাথুরে পাহাড়ের সারি। পশু নেই, পাখী নেই, মানুষ নেই , বৃক্ষ নেই, ফুল নেই, ঝরণা নেই। এমনি এক বিরানভূমে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত, প্ররিশ্রান্ত, অবসন্ন দুজন পথহীন পথিক। একজন অত্যন্ত বয়স্ক ,আরেকজন একেবারেই কিশোর।দুজনার শরীর যেন আর চলেনা।
অবশেষে পাথরের ওপর বসে পড়লেন তারা। চারপাশে চেয়ে দেখলেন। নাঃ আশেপাশে কোথাও কোনো আশ্রয় নেই।
এমন সময় বৃদ্ধ শুনলেন -এক অলৌকিক শব্দ।
এ শব্দ আসে কোথা থেকে। এখানে যে কেউ নেই।
আবার শুনলেন ।সেই একই শব্দ। ওঠো । এখানে একটি ঘর তৈরী করো।
বৃদ্ধ ওঠে দাঁড়ালেন। তারপর চারপাশে অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন।
এ কীভাবে সম্ভব। এই শুণ্যভূমে কীসের ঘর! কেন সেই ঘর! কার জন্য এ ঘর! ঘর বানানোর জন্যওতো আশে পাশে কিছুই নেই।
বৃদ্ধ এবার শুণলেন-আশে পাশে যা আছে তা দিয়েই শুরু করো।
পাথরের ওপর পাথর দিয়ে অশীতিপর বৃদ্ধ পিতা আর ছোট্ট কিশোর মিলে কোনো রকমে ঘরের মতো কিছু একটা দাঁড় করালেন।
এবার দুজনে আবার যাত্রা শুরু করবেন। কিন্তু আবারো সেই অলৌকিক শব্দ। কোথাও যেওনা তোমরা। এখানেই থাকো। আর চারপাশে মানুষকে এখানে আসার জন্য আহ্বান করো।
বৃদ্ধ এবার সত্যিই চমকে ওঠলেন। মানুষ থাকাতো দূরের কথা। আশেপাশে কোনো বৃক্ষ নেই, পশু নেই, পাখী নেই। ওপরের দিকে শুধু বিস্তৃত আসমান আর নীচে রুক্ষ এক উপত্যকা, ধু ধু প্রান্তর। তবে তিনি কাকে আহ্বান করবেন? কে শুণবে তার কথা !
আবারো সেই অলৌকিক শব্দ শোনা গেলো। তুমি মানুষদের আহ্বান করো। আমি বলছি, তোমার এই আহ্বান পৌঁছে যাবে সর্বত্র। আর এখানে প্রতিমুহুর্তে এমনকি একেবারে শেষসময় পর্যন্তও মানুষের আগমণ অব্যাহত থাকবে।
একজন অতি দূর্বল বৃদ্ধ মানুষ। যার কন্ঠ আরো ক্ষীণ। ভালো করে চীৎকারও করতে পারেন না। তিনি ভাবেন আর চিন্তা করেন। এখানে মানুষ আসবেই বা কোথা থেকে। তারওপর সারাক্ষণ এখানে মানুষ থাকবে। এও কীভাবে সম্ভব!
বৃদ্ধ কিশোরের কাঁধে ভর দিয়ে ওঠে দাঁড়ালেন। এরপর ভঙ্গুর, দুর্বল, ক্ষীণ কন্ঠে আহ্বান করলেন। চারদিকে চেয়ে দেখলেন। না কেউ আসেনা।
আসবেই বা কোথা থেকে। এ যে এক বিরান উপত্যকা।
তবে কি এই অলৌকিক আহ্বান মিথ্যা। যে আহ্বানে বলা হলো- তোমার এই বার্তা পৌঁছে যাবে সর্বত্র। দুনিয়ার চারপাশ থেকে এখানে এসে মানুষের জমায়েত হবে। মানুষের মিলন হবে।
তারপর কত দিন, কত মাস, কত বছর, কত হাজার বছর যে পার হয়ে গেলো-সেই আহ্বানের পর।
সেই হাজার হাজার বছর আগের কথা সত্যে পরিণত হলো। কী অলৌকিক একটা ব্যাপার। শুধু তাই না, দিনরাত চব্বিশটি ঘন্টা সেই জায়গায় আজ মানুষের অবস্থান। একটা সেকেণ্ডও যেন অপূর্ণ নেই। ঠিক যেমন হাজার বছর আগে বলা হয়েছিলো।
একেমন করে সম্ভব হলো! শরীর কি শিহরিত হয়? মনে কি ভাবনাজাগায়?
আর সেই ঘরে মানুষ পৌঁছেছেন প্লেনে করে, গাড়ীতে করে, জাহাজে করে, স্টীমারে করে, লন্চে করে, পায়ে হেঁটে। শিশু, কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ, মহিলা, পুরুষ, বাবা, মা, নানা, নাতি, স্বামী, স্ত্রী, পিতা, পুত্র, মা-কণ্যা, কালো, সাদা, এশিয়, আফ্রীকিয়, আমেরিকা, কানাডা,চীন -জাপান থেকে।
ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের পাশ থেকে যেমন সেখানে মানুষ গিয়েছেন, ঠিক তেমনি একেবারে আফ্রিকার গহিন গ্রাম থেকেও মানুষ গিয়ে সেই হাজার বছরের আগের আহ্বানে শামিল হয়েছেন। ইন্দোনেশিয়া, জাভা, আন্দামানের দ্বীপ থেকেও মানুষ গিয়ে হাজির হয়েছেন।
কেমন লাগে শুণতে?অলৌকিক মনে হয়? কেমন করে সেই আহ্বান পৌঁছে গেলো সর্বত্র।
যে জনমানবহীন প্রান্তরে ছিলো মাত্র দুজন মানুষ।আর আহ্বান করেছিলেন একমাত্র স্রষ্টার ওপর বিশ্বাস করে। হাজার বছর পরে সেই একই জায়গায় আজ উইকিতে দেখলাম- মানুষের সংখ্যা ১ জন না, ১ শত না, ১ হাজার না, ১০ হাজার না, ১ লক্ষ না ,২০১৪ সালে সেই ঘরকে কেন্দ্র করে জমায়েত হয়েছিলেন- বিশ লক্ষ ৪৯ হাজার ৫৩ জন মানুষ।
কী অলৌকিক মনে হয়? জ্বি। এটা একটা ঐতিহাসিক ঘরের গল্প । গাল গল্প না একেবারে সত্য ঘটনা। কী অবাক করা ব্যাপার। হাজার বছর আগে ঠিক যেরকম বলা হয়েছিলো আজ একেবারে অবিকল সেরকমই ঘটেছে। এটা হলো প্রাণপ্রিয় কাবা ঘরের ঘটনা।
এবার খেয়াল করুন। বলা হয়েছিলো মানুষের মিলন হবে। মিলন হয়েছে কিনা দেখেন।
প্রতিটি বড় ঘটনার আগে যেমন একবার রিহার্সেল করে নিতে হয়। ঠিক তেমনি শুধু দুটকরো সাদা কাপড় পড়ে ,( মৃত্যু মানুষের সাদা কাফন যেরকম) সবাই কিয়ামতের দিনে রাব্বুল আলামীনের দরবারে যেমন হাজির হবে তার একটা রিহার্সেল দিয়ে দেয়।
মানুষ অনুভব করে- এইভাবেই যেতে হবে। সাথে আর কিছুই রবেনা।
আর এই উপলব্ধি থেকেই এতো লক্ষ মানুষে মিলন মেলায় ঘটেনা কোনো রাহাজানি, কোনো শ্লীলতাহানি।সব পশু প্রবৃত্তি যেন মানুষ সেখানে গিয়ে বেমালুম ভুলে যায়। আর হাজার বছর আগে যেমন বলা হয়েছিলো-মানুষের মিলন হবে। ঠিক যেন অবিকল সেরকমই হয়েছে।
কী অলৌকিক মনে হয়?আজ হঠাৎ করে -এই ঘটনা কেন লিখলাম?
কারণ- কাবাঘরকে অত্যন্ত বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে একটি ছবি দেখে মনটা খুবই খারাপ হলো। এতো বেশী বিশ্রী ভাবে যে আঁকা হয়েছে সে বিবরণ দিতেই শরীর গুলিয়ে ওঠে। ছবিটা যোগ করারও আর ইচ্ছেও হলোনা।
"হিংসা ,আর ঘৃণায় ভরে আছে মানুষের মন
মানুষ যেন আজ হয়ে গেছে বিষাক্ত কীটের মতন।"
কিছুদিন আগে, জনাব লতিফ সাহেব কিছু কথা বলেছিলেন। উনার বক্তৃতার পর পুরো দেশে তোলপাড় হয়ে গেলো। উনার মস্তক বিদীর্ণ, ফাঁসিতে ঝুলানোর ঘোষণা আসলো। ভাবতে আশ্চর্য্য লাগে, কোরআন শরীফের কোথায় লিখা আছে- কেউ আল্লাহর বিরুদ্ধে বললেই তাকে ফাঁসিতে ঝোলাতে হবে? পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ স্রষ্টায় বিশ্বাস করেন না।
ধর্মের বিরুদ্ধে বিষেদগার করেন। এখন এদের সবাইকে কি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতে হবে।
অথচ বলা হয়েছে,
"তবু যারা বিশ্বাস করেনা তুমি আছো, তাদের মার্জনা করো প্রভু।"
নবীসাঃ এর হাঁটার পথে যে বুড়ী প্রতিদিন কাঁটা বিছিয়ে রাখতেন ।বরং একদিন কাঁটা না দেখেই প্রিয় নবী উনাকে দেখতে গিয়েছিলেন। আহা! বেচারীর শরীর খারাপ হয়নিতো। তিনিতো তখন তলোয়ার নিয়েও যাননি, ফাঁসীর দড়িও সাথে নেননি। শুধু মানুষের জন্য তিনি রহমত আর হৃদয়ভরা দরদ নিয়ে বুড়িমাকে দেখতে গিয়েছিলেন।
তবে, লতিফ সাহেব বলেছিলেন- প্রতিবছর প্রায় ১ লক্ষ মানুষ হজ্জে যায়।
এভাবে এদের প্রতিবছরের টাকা যোগাড় হলেই কয়েকটি পদ্মা ব্রীজ হয়ে যেতো। কথাটিতো আসলেই সত্যি। খারাপ কি বলেছেন?
তবে এই জায়গায় তিনি মারাত্মক ভুল যুক্তি দিলেন। মেনে নিলাম, যে ১ লক্ষ মানুষ হজ্বে যায়, এদের বিশাল টাকা না হয় জলেই গেলো। তবে দেশে এতো মন্ত্রি, সুদখোর, টাউট, বাটপার ,মতলাববাজ ধনী মানুষের সংখ্যাতো কয়েক কোটি হবে। সুইচ ব্যাংকে যাদের মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার পড়ে আছে। ধরে নিলাম সে সংখ্যা হবে দেশের ১ কোটি লোক। এখন ১ লক্ষ লোক হজ্বে গেলে বাকি যে ৯৯ লক্ষ লোক যারা হজ্বে যায়না প্রতিবছর। সেই টাকায়তো ডজন ডজন ব্রীজ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু মাননীয় প্রেসিডেন্টকেতো দেখি বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়েই পার হতে।
বিগ্গজনদের কাছ থেকে এরকম অসার যুক্তিও বেশ অলৌকিক মনে হয়।
তবে মাননীয় লতিফ সাহেব বলতে পারতেন, লোক দেখানো হজ্বে যাওয়ার দরকার নেই। বরং হজ্বে যাওয়ার আগেই একজন মানুষকে আগে হাজ্বি হতে হয়। মানে হজ্বে যাওয়ার টাকাটা কোথা থেকে আসলো? এটা কি চুরির টাকা, ঘুষের টাকা, আদম পাচারের টাকা, লুটপাটের টাকা, চাঁদাবাজির টাকা, উপরির টাকা, উপঢৌকনের টাকা, সরকারি মাল আত্মসাতের টাকা, নাকি গরীবের হক মেরে দেওয়া টাকা ?-এই আয় যদি সৎ না হয় তবেতো আপনার হজ্বও স্বচ্ছ হলোনা। হাজ্বি হিসাবে নাম কামাই হলো-তবে টাকাটা কিন্ত জলেই গেলো।
লুটের টাকা দিয়ে হজ্ব। লুটের টাকা দিয়ে মসজিদ। এতো হাজ্বি, এতো নামাজি মানুষের শহর দূর্নীতিে প্রথম হয় কেমন করে?এও মাথায় আসেনা। এটাও অলৌকিক মনে হয়। সরকারকে শুধু দোষ দিয়ে লাভ কি? মানুষ হিসাবে বুকে হাত রেখে ভাবি -আমি নিজে আসলে কতটুকু সৎ।
ঢাকা শহর মসজিদের শহর হিসাবে গৌরবান্বিত হই। তবে সেটা মসজিদের শহর না হয়ে যদি দূর্নীতিমুক্ত সৎ মানুষের শহর হতো তাহলেই সবচেয়ে বেশী গৌরবান্বিত হতাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


