আমি তখন আরিজোনায়। গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে মনে হয় নিজের শরীরকে মাংসের পুটুলি বানিয়ে ডীপ ফ্রীজের ভিতর বসে থাকি অনন্ত কাল। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। খুলে দেখি- বন্ধু জগমোহন দাঁড়িয়ে।খুবই বিচলিত। তার হবু পাত্রী আগামি রোববারের ফ্লাইটেই নতুন চাকুরীতে লণ্ডন যাবে। তাই যেভাবেই হোক ওদের দীর্ঘদিনের ভালোবাসার বিয়েটা যেন রোববারের আগেই শেষ করা হয়।
এখানে বলে রাখি, আমার বন্ধু ট্যাক্সি ক্যাব চালায়। নামে জগমোহন কামে রমণীমোহন আর দেখতে অতীব সুদর্শণ। এই ছেলের প্রেমে পড়ে গেলো- এক খ্রীষ্টান শ্বেতাংগিনী এটর্ণি মেয়ে। নাম ম্যারিনা। আমরা নাম দিয়েছি খাঁটি বাঙ্গলা নাম মর্জিনা। কারো হঠাৎ লুঙ্গী খুললে লজ্জায় মাটিতে বসে যায়। কারো কপাল খুললে খুশীতে আকাশে ওড়ে যায়।
আমরা খুব দ্রুত বিয়ের কাজ শুরু করলাম। মেয়েটির একটা শর্ত, যেহেত সে মোহনকে বিয়ে করবে, তাই বিয়ের সমস্ত কিছু পুঙখানুপুংখ ভাবে হিন্দু বেদিক রীতির নিয়মানুসারে যেন সুসম্পন্ন হয়। ওর বিশ্বাস আছে, এ বিশ্বাসের যেন কোনরকমের অমর্যাদা না হয়।
আমাদের পরিচিতি এক ব্রাম্মন পুরোহিত মশাইকে পাওয়া গেলো।বেচারার বউ দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশে। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় বেচারার সব আশা এখন হা পিত্যেশ হয়ে ভালোবাসার গাছে বাদুরের মতো ঝুলে আছে। কিন্ত বউকে আর মার্কিনমুল্লুকে নিয়ে আসতে পারছেন না।
যাই হোক, বিয়ের যাবতীয় কাজ সুসম্পন্ন হলো। সবাই উম্মুক্ত পার্কে জড়ো হয়েছেন। বর্ণনাতীত দাবদাহ। চামড়া থেকে যেন মুড়ি ফুটে বের হওয়ার মতো অবস্থা। একপাশে স্টেজ সাজানো হয়েছে। একে একে সব আনুষ্টানিকতা শেষ। ম্যারিনা শাড়ী ,গহনা পড়ে একবারে যেন আবহমানকালের বাঙালি বধূ।
এবার শুরু হবে - আসল কাজ। পুরোহিত মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে বিয়ে পড়াবেন, তারপর অগ্নিকে বায়ে রেখে তাকে ঘিরে সাতবার চক্কর দেয়ার মাধ্যমে বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে- যাকে বলা হয়-সাত পাক। মূল স্টেজের মাঝখানে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। বরের পিছন পিছন বধু ঘুরছে আগুনের চারপাশে। পুরোহিত মশাই নিবিষ্ট মনে মন্ত্র পাঠ করছেন।
মিউজিক বাজছে, ছেলেমেয়েরা ছুটোছুটি করছে। গরমে গাম ঝরছে সবার বিশেষ করে কনের।- বেচারির শাড়ী, গহনা, গরমে, গামে একেবারে হা পিত্যেস অবস্থা। কিন্তু কনের শর্ত একটাই জীবনে একবারই বিয়ে তাই কোনো প্রথা সে ভাঙ্গবেনা।
হঠাৎ আমার খেয়াল হলো- প্রায় আধঘন্টা মতো হলো-। এখনো আগুনের চারপাশে বর আর কনে ঘুরছে ব্যাপার কি। সাত বার ঘুরতেতো এতো সময় লাগার কথা না।আমি তাড়াতাড়ি পুরোহিতের কাছে গেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম- মশাই ঘটনা কি? এতো দীর্ঘ সময় লাগছে কেন? সাতবার ঘুরতেতো এতোক্ষণ লাগার কথা না। বড়জোড় সাত মিনিট।
পুরোহিত আমাকে যা বললেন, তাতে আমি হাসবো না কাঁদবো ।
আরে দাদা, রাখেন আপনার সাত মিনিট। এই সাদা এটর্নি মহিলা আমাকে সাত বছর ধরে গ্রীণ কার্ড পাইয়ে দিবে বলে ঘুরাচ্ছে। ওর অফিসের সিঁড়ি ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে আমার জীবন ত্যানা হয়ে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। গ্রীণ কার্ডের আশায় দেশে ঝুলে আছে বউ। এভাবে ঝুলতে ঝুলতে না জানি কোনদিন ফুরুত করে উড়ে যাবে। তখন, আমার কি দশা হবে। আজকে অনেক সাধনায় পেয়েছি বাছাধনকে। ঘুরতে থাকুক -আরো ঘন্টা খানেক। শুধু মাঝখানে একবার বলে আসবো-ঘুরতে থাক মর্জিনা, এক্কেবারে থামবা না। এবার বুঝ মজা। ঘুরতে কেমন লাগে? আর ঘুরাতেও কেমন লাগে?
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ১০:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





