
ঈদুল আজহার ঈদের দিন। অনেক বড় ঈদগাহ মাঠ। সাত পাড়ার মুসল্লী সকলে সমবেত হলো। যথাযথ নিয়মেই ঈদুল আজহার নামাজ শেষ হলো। মাইকে ঘোষণা করা হলো, সম্মানিত মুসল্লী সকল, আপনারা কেউ যাবেন না। আজকের এই আনন্দঘন দিনটিতে একটি দুঃখের সংবাদ আপনাদেরকে না দিয়ে পারছিনা। এ ব্যাপার বিস্তারিত বলবেন আমাদের প্রাণপ্রিয় চেয়ারম্যান সাহেব জনাব আব্দুল কাদের সরকার।
মুসল্লী সকল মনোযোগী হলো। চেয়ারম্যান সাহেব বলিষ্ঠ কন্ঠের একজন মানুষ। দেহটা যেমন বলিষ্ঠ, কন্ঠের দাপটটাও সেরকমই। সেকালের বৃহত্তর ময়মনসিংহের মধ্যে একজন দাপটের নেতাও ছিলেন বটে। অনেকের সুপরিচিত মুখ।
তিনি আমার আম্মার মামা। সে সম্পর্কে আমার নানাভাই। আমি তখন ছাত্র। বয়সেও ছোট। আনুমানিক উনিশশত ছিয়াশি কি সাতাশী আটাশি সাল হবে।
এবার চেয়ারম্যান সাহেব উঠে এসে মাইকের সামনে দাড়ালেন। সকলকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বললেন, প্রিয় ভাই সকল, আজ একটি আনন্দঘন দিনে আমাকে আপনাদের দুঃখের সংবাদ জানাতে হচ্ছে এই জন্যে আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। যাহা না বললেই নয় যে, গত রাত্রে আমার সাত পাড়ার মধ্যে পাঁচ পাড়া থেকে মোট পাঁচটি কোরবানির গরু চুরি হয়েছে। তথ্য মতে আমরা যারা উপস্থিত রয়েছি সকলে মিলে যাবো সেখানে। আপনারা কি আমার সাথে যেতে রাজি আছেন? সকলেই একবাক্যে হাত উচু করে সম্মতি জ্ঞাপন করলো। জী আমরা যাবো আপনার সাথে!
কাল ক্ষেপণ না করে রওনা হলো সকলে মিলে। আমার সুভাগ্য যে সেই দলের সাথে আমিও অংশ গ্রহন করতে পেরেছিলাম। সকলেই চলছে নিদৃষ্ট গন্তব্যের দিকে। তবে কাউকেই বলা হয়নি কোথায় যাওয়া হচ্ছে কিংবা কতদুর। বয়োজ্যেষ্ঠ যারা তাদের বুঝতে অবশ্যই বাকি ছিলোনা যে তারা কোথায় যাচ্ছে।
অন্য একটি গ্রাম হলেও গুনারীতলা গ্রামের পাশেরই গ্রাম। এ গ্রামে একটি পাড়াতে সংঘবদ্ধ কিছু চোর আছে। আর দিনে দিনে এই চুরদের বদনামে পুরো গ্রামটাই যেন সকলের কাছে বদনামে পরিনত হয়েছে। গ্রামটির পুরোনো নাম মাঝিপাড়া। যদিও সকল গ্রামেই চুরের অবস্থান ছিলো ব্যাপক।
যাহোক, শতশত মুসল্লী যেন উৎফুল্লবদনেই চেয়ারম্যান সাহেবের পেছনে পেছনে যেতে লাগলো। এত সব মুসল্লীর এক সাথে ভিন্ন গ্রামে প্রবেশ তাও আবার ঈদের দিন সকাল বেলা এ যেন একটা অন্য রকম মুহুর্ত উপভোগ হচ্ছিলো অনেকের কাছেই। অল্প সময় অর্থাৎ বড়জোর পনের থেকে বিশ মিনিট সময় লেগেছে চুরদের আস্তানায় ঢুকতে।
নামকরা চোরদের অবস্থান এখানে। এদের মধ্যে টাক্কি প্রধান। চেয়ারম্যান সাহেবের নির্দেশ মোতাবেক প্রথমে টাক্কি প্রধানকে বেধে ফেলা হলো। তারঃপর একে একে সব। চোরদের বউ সকলে দা-বটি হাতে কয়েক ধাপে মুসল্লীদেরকে হেনস্তা করার জন্য ছোটে এসে পরাস্ত হলো।
তথ্য উদঘাটনের জন্য ব্যাপক মারপিট করা হলো। চোর প্রধান টাক্কি বাদে সকল চোরই মুখ খুললো। সরজমিনে প্রত্যক্ষ হলো যে, পাঁচটি গরুই রাতের বেলায় সকল চোর সমবেত হয়ে জবাই করেছে এবং বালুর চরে বালুমাটির নীচে আস্তা গরুই পুতে রেখেছে। এক এক করে পাঁচটি গরুই বের করা হলো পুতে রাখা বালির নীচ থেকে।
তথ্য অবগত করানোর কারণে চোরের সর্দ্দার টাক্কিপ্রধান বাদে সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হলো। পাচটি গরুসহ টেনে হেচড়ে টাক্কিপ্রধানকে আনা হলো গুনারীতলা হাই স্কুল মাঠ প্রাংগনে। আমি দেখেছি সেদিন মানুষ নামে চোরের প্রহার। আমি দেখেছি সেদিন কিভাবে চোর নামের মানুষটির দু'টি হাতের কব্জি মুচড়িয়ে ভেংগে ফেলা হলো
!
প্রথমে বাম হাতের কব্জিটা ভেংগে দেওয়া হলো তারঃপর ডান হাতের। দুই পায়ের পাতা আর গিরায় গিরায় এমন ভাবে পেটানো হলো যে আমরা যারা ছোট ছিলাম তারা তা দেখে কেউ দৌড়ে পালালাম কেউ আবার কাদতে কাদতে বেহুশ হয়ে পড়লাম। চোরের শাস্তির যেন কোন পরিমাপ নেই, নেই যেন তার কোন ক্ষমা। চোর চুরির পর সে যেন তখন আর মানুষ থাকে না।
তবে কি পশু? না সেওতো না। পশুকেও তো এভাবে প্রহার করতে দেখিনি। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে এতটা নির্মমভাবে প্রহার করা কি করে সম্ভব। প্রশ্ন জাগে তবে কি এত শত প্রহার ঐ চোর নামে শব্দটার উপর প্রভাবিত হয়? প্রশ্ন জাগে চুরি করার শাস্তি এতটা ভয়ংকর জেনেও কেন ওরা চুরি করে?
সেদিনের সেই প্রহারের দৃশ্য দেখার পর আমি কিছুই যেন খেতে পারছিলাম না। বেশ দিন ভীষণ ভোগেছি। তারঃপর অনেক দিনে সেই স্মৃতিটাকে যখন কিছুটা ম্লান করতে পারলাম কেবল তখনই সুস্থ্য হলাম।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা আগস্ট, ২০২১ সকাল ৮:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


