somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোষ্ট মাস্টার

০৪ ঠা আগস্ট, ২০২১ ভোর ৬:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



স্থান গুনারীতলা বাজার। আশির দশকে মানুষের মনের ভাব আদান প্রদানের একমাত্র যে অবলম্বনটি ছিলো তা কেবলি এই পোষ্ট অফিস। আমি তখন খুব ছোট। বড় ভাই সবে মাত্র মেট্রিক পাশ করে সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগদান করেছে। মাকে দেখতাম প্রায়ই আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে কখনও জোর স্বরে আবার কখনও ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে। মায়ের কান্না দেখে যেন আমিও ঠিক থাকতে পারতাম না। আমিও হাউমাউ করে কেঁদে দিতাম। মায়ের কান্নার অর্থ তখন বুঝতাম না। কিন্তু এখন বুঝি।

মা আমার কান্না দেখে খুব সযত্নে বোকে জড়িয়ে নিতেন। নিজের চোখ দু’টো মুছে যেন একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাসির ভান করে বলতেন খোকা, তুই কাঁদিস ক্যান। আমারতো কিছু হয়নি। আমি যেন আরও কান্নার বেগটা বাড়িয়ে দিতাম। মা তখন শত কষ্টের অন্তরালে মুচকি হাসি হেসে আমাকে শান্তনা দিয়ে বলতো আয় তোকে ঘুম পাড়ানি চাঁদ মামার ছড়া শুনাই।

প্রতিদিন পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকতো মা। আমিও মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম। পরিচিত লোক পেলেই দেখতাম মা জিজ্ঞেস করতো ছোট হলে নাম ধরে আর বড় হলে সন্মোধন করে বলতো" পোষ্ট অফিসে গেছিলা?

কেউ বলত হ্যা, কেউ বলত, না। এমনি প্রতিদিন। তখন পোষ্ট মাস্টার ছিলেন হযরত আলী দাদা। সম্পর্কে আমার দাদা। আমাদের বাড়ীর পেছনে মুন্সি বাড়ি থাকেন। আমাদের বাড়ি থেকে কোয়াটার কিলো হবে দক্ষিন দিকে। একদিন মা আমাকে নিয়ে পোষ্ট মাষ্টার দাদার কাছে গেলো। আমাকে পাশে রেখে অনেকক্ষণ সুখ দুঃখের আলাপচারিতা করলো। সময় প্রায় ঘন্টা খানেক হবে এর মধ্যেই মাকে দেখলাম কয়েকবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। আর যতক্ষণ কথা বললো সব কথাই শুধু অনুনয় আর বিনয়ের সাথে বললো। এমনটা কেনো তখন বুঝিনি এখন বুঝি।

একজন মায়ের হৃদয় সন্তানের জন্য কতটা মমতার হতে পারে তা না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবেনা। মাঝে মধ্যে মা কেঁদে ফেললে দাদা দেখতাম সান্ত্বনার সুরে বলে উঠতো কেঁদোনা বউমা। ধৈর্য ধারণ করো। কান্না না থামলে বলতো, দেখি কাল ওকে আমি একটা চিঠি পাঠাবো। কেন এতো দেরিতে চিঠি লিখে আমি তা জানতে চাইবো। এবার মাকে দেখতাম খুব খুশি হয়ে কাপড়ের আঁচলটাতে দাত লাগাতে। আঁচলে গিট্টূ দিয়ে রাখা কিছু টাকাকড়ি সিকি কিংবা আধুলি যাই হবে দাদার হাতে গুজে দিয়ে বলতো রেজিস্ট্রী করে পাঠাবেন কাকা মশাই। এবার আশি তাহলে। বলেই মাথাটা নীচ করে কুরনিশ করে বলতো মা, আশি। সেকালে মুরুব্বিদের সাথে আদব নিয়ে কথা বলাটা মনে হতো যেনো এক প্রকার আইন!

তারপর আমি যখন কিছু কিছু বুঝতে শিখলাম। মা তখন আমাকে প্রায় সময় দাদার কাছে পাঠাতে সুরু করলো। কখনও বাড়িতে কখনও পোষ্ট অফিসে যেখানেই থাকতেন দাদা আমি পাশে হাজির হতেই মুচকি একটা হাসি দিতেন। কি অপূর্ব হাসি তার, হাসলেই যেন সুন্দর মুখখানা লাল হয়ে উঠতো আর মুক্তোর দানার মত সাদা দাত গুলি ঝিকঝিক করে উঠতো।

মুখ ভরা পাঁকা দাঁড়ি ছিলো বেশ লম্বাও না আবার খুব খাটোওনা। সাদা রঙ দাদার খুব প্রিয় ছিলো। সব সময় দেখতাম ইস্রী করা সাদা পাজামা আর পাঞ্জাবী পরিধান করতেন। দাদা যখন হাসতেন তার মিষ্টিমাখা হাসির সহিত যেনো পরিধানের সাদা জামা গুলোও হাসছে এমনটা মনে হতো। যা হোক যদি চিঠি থাকতো তবে হাসির পাশাপাশি দুই একটা রসিক কথাও বেরিয়ে আসতো দাদার মুখ থেকে। আর চিঠি না থাকলে সোজা বলে দিত "দাদা কোন খবরতো নাই"।

আমি অল্পতেই বুঝে ফের দৌড়াতে দৌড়াতে মায়ের কাছে ছোটে আসতাম। আমার শুন্য হাত খানা দেখার পর মা'য়ের ততক্ষণে বুঝে নিতে আর বাকি থাকতোনা যে, আজও ছেলের চিঠি আসে নাই।

দিন চলছে তার নিয়মে। কত প্রিয় মুখ অন্ন অভাবে আপনজন ছেড়ে ছুটছে দেশ থেকে দেশান্তরে কাজের সন্ধানে। আর ঘরে থাকা আপন প্রাণ গুলো রাত দিন আহাজারি করছে রোদনে। কেউ থেমে থেমে কাঁদে আবার কেউ কাঁদে অহর্নিশি উচ্চ স্বরে। সরলা বধু, মমতাময়ী মা আর আদরের ছোট ভাই বোন গুলোর চোখ যেন রক্ত কমলে রঞ্জিত থাকে।

নিয়তির উপর ভর করেই দিন কাটায় মানুষ গুলো। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। কোন খবর হয়ত কারো আসে আবার বছর পেরোলেও কারো কোন খবরই আসেনা। কেউ কেউ ধরে নিতো জংগলের বাঘ হয়তো খেয়ে ফেলেছে। পাল তোলা নৌকা গুলো প্রতিনিয়ত আসতো। দুর থেকে নৌকার পাল দেখলেই প্রতিক্ষায় থাকা মেয়ে মানুষ গুলোর হৃদয় ছটফট করতো।

আল্লাহ এই নৌকায় তুমি যদি আমার বাচাধনরে আনতে। যখন দেখতো পাড়ে আর নৌকা ভিড়লোনা। কেউ চীৎকার দিয়ে বলে উঠতো, ও মাঝি তুমি কি আমার আদরের খোকাটার খবর জানো! কেউ বলতো ও মাঝি ভাই, আমার মাঝির খবর কিছু কি জানো? আবার কেউ চোখের জল আঁচল দিয়ে মুছতে মুছতে ঘরে ফিরে যেতো।

সেকালে ছিলনা তথ্য প্রযুক্তির মেলা। ছিলোনা বৈদ্যুতিক আলোর ঝলকানি। তথ্য আদান প্রদানের হাতিয়ার তো কেবল ঐ একটাই গোলাকার লাল রঙের বাক্সটা। যার পকেট ভরতো হাজারো কথার ব্যঞ্জনা দিয়ে। কত আর্তনাদের কথামালা, কত চোখের জলরাশিতে ভেজা পত্র যার হিসেব মেলা ভার।

দাদাকে একদিন দেখলাম ভীষণ মন খারাপ। যে দাদা আমাকে দেখলেই একটা হাসি দিয়ে ভীতু মনটাকে আমার সাহসে পরিপাটি করে দিতো সে সুন্দর মুখটাতে আজ কোন হাসি নেই। আমি ভয়ে সেদিন দাদার কাছে গেলাম না। দাদা একবার চোখ তুলে আমাকে দেখলেন ফের মাথাটা নীচ করে বেশক্ষণ চুপচাপ রইলেন। আমিও নিস্তুুপ পাথরের মত দাঁড়িয়েই রইলাম।

এবার একজন ভদ্রলোক এলেন। ইয়া উচা লম্বা দেখতে সেরকম। উনার দিকে তাকাতেই দেহের ভিতরে কেমন ভয়ে জড়ষড় হয়ে যাচ্ছিলাম। দাদা বিষয়টি খেয়ালে নেওয়ায় সেদিন বেঁচে গিয়েছিলাম। দাদা আমাকে লক্ষ্য করে বললেন ক্যারে যাস নাই এখনো?
দাদার কথা শুনে ভদ্রলোক দাদাকেই জিজ্ঞেস করলেন, কে এই ছেলে মাষ্টার?

দাদা বলে উঠলেন, এরে চিনেন না সাহেব এ হলো আপনার নাতি উত্তরপাড়া কাশেমের ছেলে। ওর মা আপনার না ভাগনী হয়। আমার বোকে ডাদা তার ডান নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো কি জানি তোর মায়ের নাম? আমি বলার আগেই ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ও আচ্ছা সুমতনের ছেলে? আয় আয় কাছে আয়।

হাত ধরে টেনে কাছে নিলেন। পকেট থেকে এক টাকা বের করে বললেন নে চকলেট কিনে খাবি। আর তোর মাকে বলবি আমি দিছি তোর নানা। আমার নাম আব্দুল কাদের সরকার।

তারঃপর আমি দাড়িয়েই আছি নানাকে দেখলাম পোষ্ট মাস্টার দাদাকে শান্তনা দিয়ে বলছেন, কি আর করবেন, ছেলের হয়তো হায়াত ছিলোনা। আল্লাহর ভালোই ভালো। তখন বুঝলাম দাদার ছোট ছেলে উনার ডাক নাম রতন। রতন কাকার অকাল মৃত্যুতে পুরো গ্রামে শোকের ছায়া নেমেছে। মার কাছে জেনেছিলাম রতন কাকার বিয়েও নাকি ঠিক হয়েছিল। আজ বাদে কাল বিয়ে। এমন সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে সদর হাসপাতালে নেওয়া হয় সেখানে রোগ ধরা না পড়লে ময়মনসিংহ চরপরা হাসপাতে রেফার করে। যতক্ষণে চরপরা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় ততক্ষণে পথিমধ্যেই ইহধাম ত্যগ করেন। শুনেছিলাম তিনি মারাত্মক জন্ডিস এ মারা গেছেন। সে জন্ডিস সহজে নাকি ধরা পড়েনা।

তারঃপর বেশ দিন কেটে গেলো। আমিও বেশ চঞ্চলতায় পা দিলাম। এখন কিছু কিছু রসিকতা আমিও দাদার সাথে মাঝে মধ্যে করি। বাড়িতে গেলে দাদীর সাথে বেশ মজা করে আসি। এমনি ভাবে দিন চলছিলো। আমিও স্কুলে এডমিশন নিয়েছি। হঠাৎ একদিন শুনতে পাই পোস্ট মাস্টার হযরত আলী দাদা মারা গেছেন। আমার মাথার উপর যেন আসমানটাইভেংগে পড়লো!

আমি সত্যিই দিশেহারা অবস্থায় ছুটে গেলাম দাদার বাড়িতে। আমার সাথে বন্ধুরাও ছিলো
ক'জন। দেখলাম উঠানে একটা কাঠের চার পায়ার উপর উত্তর দিকে মুখ করে শুয়ায়ে রেখেছেন। অনেক লোকের ভীড়। একজন কাফনের কাপড় খোলে মুখটা লোক সকলকে দেখাচ্ছেন। আমিও আমার বন্ধুরা অশ্রুসিক্ত নয়নে অবাক নেত্রে দাদাকে শেষ দেখাটা দেখে নিলাম তারপর!
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২১ ভোর ৬:১১
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জ্ঞান কোনো একক কর্তৃত্ব নয়: সমন্বিত প্রজ্ঞা

লিখেছেন রাড্ডা, ০১ লা মে, ২০২৬ রাত ১০:২১



বিশ্ব আজ যেখানটায় দাঁড়িয়ে তা কোনো একক ব্যক্তি, একক প্রতিষ্ঠান বা একক চিন্তার ফসল নয়; বরং এটি বহুমাত্রিক জ্ঞান, সমন্বিত গবেষণা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার একটি দীর্ঘ যাত্রার ফল। ইউরোপ, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেষ বিকেলের বৃষ্টি

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৭


বিকেলের শেষে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলে চুপ,
তোমার ওমন ঘন মেঘের মতো চুলে
জমে ছিল আকাশের গন্ধ,
কদমফুলের মতো বিষণ্ন তার রূপ।

আমি তখন পথহারা এক নগর বাউল,
বুকের ভেতর কেবল ধোঁয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

একাত্তরের আগের আর পরের জামাত এখনও এক

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ০২ রা মে, ২০২৬ সকাল ১১:৫৮


গোলাম পরওয়ার বলেছে একাত্তরের জামাত আর বর্তমান জামাত এক নয়। অথচ এক। স্বাধীনতার আগের জামাত আর পরের জামাত একই রকম।
একাত্তরের আগে জামাত পাকিস্তানের গো% চাটতো এখনও তাই চাটে। তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

সোনার ধানে নোনা জল

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:১২



হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ শব্দে রেদোয়ানের ঘুম ভাঙল। না, কোনো স্বপ্ন নয়; মেঘের ডাক আর টিনের চালে বৃষ্টির উন্মত্ত তান্ডব। বিছানা ছেড়ে দরজায় এসে দাঁড়াতেই এক ঝলক... ...বাকিটুকু পড়ুন

মরহুম ওসমান হাদীর কারণে কবি নজরুলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা মে, ২০২৬ দুপুর ২:৫৯


ইনকিলাব মঞ্চের জাবের সাহেব মাইকের সামনে দাড়িয়ে যখন বললেন , শহীদ ওসমান হাদীর শাহাদাতের উসিলায় নাকি এদেশের মানুষ আজ কবি নজরুলের মাজার চিনতে পারছে, তখন মনে হলো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×