somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফিওদর দস্তয়েভস্কি : অনন্য এক সূর্য

২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৪:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এবারের ঋতুরাজ একটু ক্ষ্যাপাটে মন নিয়ে এসেছেন। রাজনৈতিক বিষ্ফোটক খবরের সঙ্গে জুড়েছে পাহাড়ী মানুষের আক্ষেপ। এই হল্লার ফাঁকেই একটু সাহিত্যালোচনা করি। যারা লেখালেখিতে আগ্রহী, কিংবা নিছক সাহিত্যপ্রেমী, তাদের জন্য আমার অন্যতম প্রিয় লেখকের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরলাম।

ফিওদর মিখাইলোভিচ দস্তয়েভস্কি, নামটা পাঠকের পরিচিত বলেই আমার বিশ্বাস। রুশ সাহিত্যের অনন্য আবেদন নিয়ে ম্যাক্সিম গোর্কি কিংবা লিও টলস্টয় যেমন আলো ছড়িয়েছিলেন বিশ্ব সাহিত্যের অঙ্গনে, ঠিক তেমনই (বরং তারচে বেশিই হবে) ঔজ্জ্বল্য দস্তয়েভস্কির রচনায়। ১৮২১ সালে মস্কোর মেরিনস্কি হাসপাতালে জন্ম নিয়েছিলেন দস্তয়েভস্কি। চিকিত্সক বাবার আদি নিবাস ছিলো বেলারুশের দস্তয়েভ গ্রাম। ওখান থেকেই দস্তয়েভস্কি নামের সূত্রপাত। শৈশব কেটেছে অবর্ণনীয় দারিদ্রে। তাতেই বোধহয় দস্তয়েভস্কির লেখায় আজীবন ফুটেছে মেহনতি মানুষের অপ্রাপ্তির আকুতি। সেন্ট পিটার্সবার্গ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল থেকে পাস করতে না করতেই মহান এ সাহিত্যিক রচনা করলেন তান প্রথম ছোট উপন্যাস ‘বেদনিয়ে লিউদি’, ইংরেজিতে যা 'পুয়র ফোক' নামে পরিচিত। বিশ্ব সাহিত্যের আরেক উজ্জ্বল জোতিষ্ক নিকোলাই গোগোল-এর ‘দ্য ওভারকোট’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রচিত এ উপন্যাসটির মূল চরিত্র মাকার দেভুশকিন নামের এক সামান্য কপিরাইটার। ১৮৪৬ সালে প্রকাশিত উপন্যাসটির কাহিনী রচিত হয়েছে মাকার ও তার বন্ধু/আত্মীয়া ভারভারা দোব্রোসেলোভার পত্রালাপ নিয়ে। এর আগে দস্তয়েভস্কি ফরাসি ঔপন্যাসিক ও'নোরে ডি বা’জাক-এর ‘ইউজেনি গ্রাদেঁ’র রুশ ভাষান্তর করলেও সেটা তেমন নজর কারেনি কারো। বরং নিজের লেখা দারিদ্র্য আর ভালোবাসার আঁটোসাটো সমঝোতার উপাখ্যান ‘পুয়র ফোক’-ই ২৪ বছর বয়সে রীতিমতো খ্যাতিমান করে তুললো দস্তয়েভস্কিকে। এরপর তিনি লিখলেন উপন্যাস ‘দ্য ডাবল’ (ইংরেজি নামগুলোই দিচ্ছি, রুশ উচ্চারণ বেশ খটোমটো), ছোটগল্প ‘মিস্টার প্রোখারচিন’, ‘দ্য জেলাস হাজবেন্ড’, ‘আ ফেইন্ট হার্ট’, ‘দ্য অনেস্ট থিফ’ ইত্যাদি। আর্থিক স্বচ্ছলতা তেমন একটা না থাকলেও ওই দু’তিন বছর শান্তিতেই ছিলেন দস্তয়েভস্কি।
১৮৪৯-এর এপ্রিলে নামলো দুর্যোগ। বিপ্লবী আর রাষ্ট্রবিরোধী হওয়ার দায়ে ওই সময়ের জার প্রথম নিকোলাস বন্দী করলেন লেখককে। দীর্ঘ পাঁচ বছর সাইবেরিয়ায় কারাগারে বন্দী থাকার পর ১৮৫৪ সালে মুক্তি পান ফিওদর দস্তয়েভস্কি। অবশ্য পুরোপুরি মুক্তি ঠিক বলা চলে না, পরের পাঁচ বছরের জন্য সাইবেরিয়ান রেজিমেন্টের সপ্তম ব্যাটেলিয়নে লেফটেনেন্ট হিসেবে কাজ করতে হয় লেখককে। এরই মধ্যে ১৮৫৭ সালে জীবনসঙ্গীনী হিসেবে আসেন মারিয়া দ্মিত্রিয়েভনা ইসায়েভা।
এসব ঘটনাপ্রবাহ বিপুল পরিবর্তন আনে লেখকের চিন্তাধারায়। একই সঙ্গে শারীরিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হন কালজয়ী এ সাহিত্যিক। ১৮৫৯ সালে ছোটগল্প ‘দ্য আঙ্কলস ড্রিম’-এর মধ্য দিয়ে লেখালেখিতে ফেরেন দস্তয়েভস্কি। এরপর ১৮৬১তে প্রকাশিত হয় তার পাঠকপ্রিয় উপন্যাস ‘দ্য ইনসালটেড অ্যান্ড দ্য ইনজ্যুরড’। এরপর একে একে ‘হাউস অব দ্য ডেড’, ‘আ ন্যাস্টি অ্যানেকডোট’ আর ‘নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’-এর পর ১৮৬৬ সালে দস্তয়েভস্কি লিখলেন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’। পারিপার্শ্বিক সমাজ আর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গণ্ডি পেরিয়ে জন্ম নিলো উপন্যাসের মূল চরিত্র রোদিওন রোমানোভিচ রাস্কোলনিকভ। পুঁজিবাদী সমাজের দুষ্ট চরিত্রগুলোকে শাস্তি দিয়ে রাস্কোলনিকভ ডাকলেন সমাজ পরিবর্তনের জোয়ারকে। ‘দুষ্টের দমনে হত্যা’ নীতিতে কল্পিত এ চরিত্র হয়ে উঠলো নতুন নেপোলিয়ন। দস্তয়েভস্কির রচনাভাণ্ডারে এরপর যুক্ত হলো ‘দ্য ইডিয়ট’, ‘বোবোক’ এবং ‘দ্য র ইয়ুথ’-এর মতো দুনিয়া কাঁপানো লেখনী। ১৮৭৯ সালে প্রকাশিত হয় সাহিত্যের মহানায়ক দস্তয়েভস্কির ‘ব্রাদার্স কারামাজোভ’। এটি তাঁর শেষ উপন্যাস। আজীবন দারিদ্র আর বাস্তবতার কষাঘাতে জর্জরিত দস্তেয়েভস্কির এ রচনায় লেখা হলো দর্শনের কিছু গুঢ় তত্ত্ব। অনেকের মতে, ব্রাদার্স কারামাজোভ-এর দর্শন দস্তয়েভস্কিকে আজীবনের মতো স্থান করে দিলো সিগমুন্ড ফ্রয়েড, অ্যালবার্ট আইনস্টেইন আর পোপ পঞ্চদশ বেনেডিক্টের মতো দার্শনিকের পাশে।
১৮৮১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ঊনষাট বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন সাহিত্যের এ ক্ষণজন্মা স্রষ্টা।
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন চালাতে শহরে থাকা কিন্তু বেঁচে থাকা যেন বাড়িতেই

লিখেছেন Sujon Mahmud, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৯

ঈদের ছুটিটা কেমন যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, এই তো সেদিন বাড়ি গেলাম—মায়ের হাতের রান্না, বাবার গল্প, ছোট মেয়ের হাসি, আর স্ত্রীর সেই নীরব অভিমান… সবকিছু মিলিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×