রবিঠাকুর কর্তৃক রাণু মুখোপাধ্যায়কে লিখিত চিঠি পড়ে আমার ভেতর তোলপাড় হচ্ছিলো। সাতান্ন বছরের আধবুড়ো একমানুষ কী করে এগারো বছরের একবালিকাকে এতো আপন করে নিয়েছেন, কী তার মাধুর্যমেশানো বুলি! কতো গভীর তার ভালোবাসার ব্যাপ্তি! বড়ো আপসোস হয়, আমি তো আর কবি নই, নই সাহিত্যিক, কাকে অমন মাধুর্য মিশিয়ে লিখি? আর এখন চিঠি লিখবারই বা প্রয়োজন আছে কি? যন্ত্রযুগে এখন আর অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয় না। কী করে বোঝা যাবে-ডাকপিয়নের পদধ্বনিতে হৃদয়ের কুঠুরিতে জমে থাকা মেঘগুলো মুহূর্তে কীভাবে শূন্যতায় মিলিয়ে যায়। কবি গুণের মুঠোফোন হোক আর অন্তঃজালই হোক, আমাদের সমস্ত অনুভূতি যেনো অন্তঃসারশূন্য হয়ে গেছে। সন্তানও এখন আর ‘বাবাকে টাকা চাহিয়া পত্র’ লেখে না। এজন্য ভালোবাসাও এখন রকমফের হয়েছে। বদলিয়েছে তার রূপ-স্বরূপ, সেখানে মিশে গেছে ভণ্ডামি, শঠতা, ধূর্ততা। রবীন্দ্রনাথ মেয়েদের যে অধিকারবোধের কথা বলেছেন, তিনি চিরকাল যাকে ভয় পেয়েছেন; মেয়েরা এখনও সেই অধিকারবোধ আদায়ে বদল করেছে তাদের আসল পরিচয়। এমনকি একাধিক অধিকারবোধ আদায়েও অনেকে সফল হতে চায়। ফলে ভণ্ডামি মিথ্যে আর ধূর্ততার আশ্রয় তাদের নিতেই হয়। অনেকসময় তারা নিজেরাও তাতে ভস্মীভুত হওয়ার ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্যিক ব্যাপার। শুধু একতরফা বললে পক্ষপাতিত্ব হবে, পুরুষরা যে পিছিয়ে আছে তা নয়; বরং হয়তোবা তারা একধাপ এগিয়েই আছে। এজন্যই সমাজে বেড়ে যাচ্ছে দ্বন্দ্ব, ভুল বোঝাবুঝির সমস্যা এবং পরিণতিতে চরম মাশুল। আমরা ভালোবাসতে জানি না, জানতে গেলে মনে হয় ওসব পুরোনো সংজ্ঞা জেনেই বা লাভ কী? তাইতো এ প্রজন্ম ভালোবাসা বলতে শরীরকাম সর্বস্বতাকেই বোঝে। বোঝার ধারণাই হয়তো বাড়িয়েছে দ্বন্দ্ব, তৈরি করেছে বিভেদ, ভুল পথে চলছে সবাই। রবিঠাকুরের লেখা পত্রগুলির মধ্যে একটি আমার অতিপ্রিয়; যেখানে তিনি লিখেছেন-আমি ভিতরের সৌন্দর্যকে সবচেয়ে ভালোবাসি- যাদের øেহ করি তাদের মধ্যে সেই সৌন্দর্যটি দেখবার মধ্যে আমার সমস্ত মনের তৃষ্ণা। মেয়েদের মনে এই সৌন্দর্যটি যখন দেখা যায় তখন তার তুলনা কোথাও থাকে না। কিন্তু মেয়েরা যখন কেবল সংসারে জড়িয়ে থাকে, সবটাতেই কেবল আমার আমার করে, নিজের ছোটো সুখ দুঃখকে নিয়ে পৃথিবীর সব মহৎলক্ষ্যটাকে আড়াল করে রাখে, যখন তারা বড়ো চেষ্টার বাধা, বড়ো তপস্যার বিঘœ হয়ে কেবলমাত্র লোকের মন ভোলানোকেই নিজের জীবনের উদ্দেশ্য বলে মনে রাখে, তখন বাইরে তাদের যতোই সৌন্দর্য থাক্ সে সৌন্দর্য মায়া মাত্র, সে সৌন্দর্য সত্য নয়। তিনি অন্যপত্রে আরো লিখেন-মানুষের লোভ আছে, আসক্তি আছে, নানারকম প্রবৃত্তি আছে, এইজন্যে সে কেবলি অধিকার স্থাপন করতে ব্যস্ত; অন্য মানুষকে সে নিজের ভোগের জন্যে প্রয়োজনের জন্যে বশ করে বাধ্য করে বন্দী করে রেখে দিতে চায়। এই জন্যে অধিকাংশস্থলেই তার ভালোবাসা মোহের ভিতর দিয়ে দুঃখের সৃষ্টি করে এবং দুঃখ পায়-কেবলি সে আপনার অংশের হিসাব করে, এবং চোখে চোখে আগলে রাখতে চায়, এতে কল্যাণ হয় না- এতে মানুষের ভয়ানক ক্ষতি হয়, বিপদ ঘটে এবং শোক দুঃখের কারণ জন্মে। সকলের চেয়ে ভালোবাসা হচ্ছে সেই, যাতে মানুষকে নিজের দিকেই টানে না, বড়র দিকে অগ্রসর করে মুক্তির দিকে সাহায্য করে, ভালোর দিকে প্রেরণ করে আনন্দিত হয়। আমার বড়ো ইচ্ছে এরকম ভালোবাসার একটুখানি সুধাপান করতে, পাবো কি এখন? এ যুগে? এ সমাজে? এতো কিছুর ভিড়ে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


