আজ আমি আমার গ্রামের কথা বলব। যেখানে আমার শিকড়। সেই সবুজ গ্রাম আর তার সরল গেঁয়ো লোকগুলোকে আমার খুব ভালো লাগে। আমার গ্রামকে কখনও ভূলিনি আমি। কারণ, শিকড়কে অস্বীকার করে সামান্য শেওলার মত বেঁচে থাকার কোন ইচ্ছে আমার নেই। তাই, এই স্বার্থপর শহরে যখন দম বন্ধ হয়ে আসে, তখন ছুটে যায় আমার উদার গ্রামের কাছে। আমার সুস্থ মনটাকে ফিরে পেতে।
আমার গ্রামের বাড়ীর প্রাচীর থেকে মাত্র ৬/৭ হাত দূরে একটা জল টলমল দীঘি আর তার তীরে একটা সুন্দর মস্জিদ। এগুলো নাকি এক অলৌকিক ঘটনার ফল। আমি ঘটনাটা শুনেছি আমার দাদুর কাছ থেকে। কেউ জানেনা কত বছর আগে এটা ঘটেছিলো।
অনেক দিন আগে এক সকালে গ্রামসুদ্ধ লোক ঘুম ভেংগে অবাক হয়ে গেলো। গ্রামের মধ্যে রাতারাতি একটা দীঘি আর মস্জিদ তৈরী হয়ে গেছে। কোথা থেকে এগুলো এলো, ভেবে যখন কেউ কূলকিনারা পেলোনা, তখন এক লোক দেখলো দীঘির সিঁড়িতে এক জোড়া চটি পড়ে আছে। চটিজোড়ার মালিক ছিলো মানিক পীর। অনেক খুজেও তাকে আর পাওয়া যয়নি। সবাই বলে, দীঘি আর মস্জিদ তৈরী করে দীঘির গভীর জলে ডুব দিয়েছিলো মানিক পীর।
এখানেই কাহিনী শেষ নয়। গভীর রাতে দীঘির জলে ভেসে বেড়াত একটা সোনার ঝিনুক আর একটা চড়ক গাছ। চড়ক গাছটার দু'টো চোখ ছিলো। একটা সোনার, আর একটা রূপার। ভালো মানুষেরা চোখে তৃপ্তি নিয়ে সেই অপরূপ দৃশ্য দেখতো। আর খারাপ মানুষগুলোর চোখ চকচক করতো লোভে। একদিন এক লোভী চোর সেই গাছ আর ঝিনুক চুরি করতে গেলো। ঝিনুকটা টুপ করে ডুব দিলো দীঘির জলে। কিন্তু গাছটা ডোবার আগেই সেই দুষ্টু লোকটা তাকে ধরে ফেললো। তারপোর সোনা-রূপার চোখ নিয়ে বাজারে গেলো বিক্রী করতে। এদিকে চোখ হারিয়ে চড়ক গাছটা মরেই গেলো।
দুষ্টু লোকটা যখন মহা আনন্দে টাকা গুনছে, তখন তার বৌ দৌড়াতে দৌড়াতে বাজারে এল। লোকটার একমাত্র ছেলে হঠাত্ করে অসুস্থ হয়ে গেছে। দুজনে যখন বাড়ী পৌছালো, ততক্ষণে ছেলে লাশ হয়ে গেছে। নিজের ভূল বুঝতে পেরেও তখন আর কিছু করার থাকল না লোকটার।
বর্তমান অবস্থা :
সেই ঝিনুকটা নাকি এখনও মাঝে মাঝে গভীর রাতে ভেসে বেড়ায়। মানুষ দেখলেই ডুব দেয়। মাঝ রাতে সাতটা গলা কাটা ঘোড়া এসে দীঘির পানি খায়। আমি অবশ্য এসব কিছু কখনও দেখিনি। কয়েক বছর আগে এক গ্রীষ্মে দীঘির মাটি কাটা হয়েছিলো। তখন দীঘির পানি সেঁচে ফেলা হলো। সেই অল্প পানিতে ঝিনুকটাকে দেখার আশায় সারাদিন ঘুরেছি। কোথায় যে লুকিয়ে আছে সেটা! তবে একটা মরা গাছ দেখেছিলাম। সেটাই নাকি চড়ক গাছ। এক মাটি কাটা শ্রমিক গাছটা বাড়ী নিয়ে গিয়েছিলো কিছু জ্বালানী কাঠের আশায়। কিন্তু বাড়ী গিয়ে দেখে ছেলের ডায়রিয়া হয়েছে। অবস্থা আশংকাজনক। লোকটা তাড়াতাড়ি কাঠগুলো দীঘিতে ফেলে গেলো। আর কী আশ্চর্য! ছেলেটাও সুস্থ হয়ে গেলো তখন।
প্রতি শুক্রবার অনেক লোক আসে দীঘিতে গোসল করার জন্য। এই দীঘিতে গোসল করলে আর মস্জিদের মাটি গায়ে মাখলে নাকি রোগ ভালো হয়। গ্রামে গেলেই আমি দীঘিতে গোসল করি। সেই শীতল জল আমার খুব ভালো লাগে। তবে একটু ভয়ও লাগে। সাঁতার জানিনা তো, তাই।
এইসব গল্পের কতটুকু সত্যি আমি জানিনা। তবে এটুকু জানি, সেই সহজ সরল মানুষগুলোর মনে যে আবেগ জন্মেছে দীঘিটাকে ঘিরে, সেটা কিছুতেই মিথ্যা নয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




