সেই কখন থেকে বুলবুলিটা গান গেয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দিচ্ছে একটা পুরোনো গানের সুর। কিছুতেই গানটা মনে পড়ছে না। শুধু দুটো শব্দ মাথার মধ্যে এলোমেলো ঘুরছে- "আলো" আর "ভূবন"। এই ভূলে যাওয়া যে কী ভীষণ যন্ত্রণা! বেঁচে থাকাটাই একটা যন্ত্রণা।
একটা ভাংগা চেয়ার আর চৌকিতে আমার দিন-রাত কাটে। অবশ্য আমার কাছে দিন-রাত সবই নিকষ কালো। একটুখানি আলো ঢোকার কোন ছিদ্র বিধাতা রাখেননি। খোলা জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে হাওয়া আসে। বৃষ্টি ভেজা আর রোদ মাখা হাওয়াকে ঠিকই আলাদা করতে পারি।জানালার পাশে বেলী ফুল ফুটলেও বুঝতে পারি। শুধু এই রঙিন পৃথিবীর রঙগুলো ভূলে যাচ্ছি ধীরে ধীরে।আমার বন্ধ চোখ-খোলা চোখের সামনে শুধু একটাই রঙ- "কালো"।
অথচ আমার জীবনটা এমন হওয়ার কথা ছিল না। মিষ্টি একটা বৌ ছিল আমার। জোহরার ভালোবাসা মাখা কোমল কথাগুলো আমাকে সমান্য কেরানী থেকে বিশাল সম্রাজ্যের মালিক বানিয়ে দিত। ফুটফুটে দুটো ছেলেমেয়ে আমার সারা ঘরে হেসে খেলে বেড়াত। সারাদিন পর সন্ধ্যাবেলা ঘরে ফিরতাম সস্তা দামের ছোট্ট একটা কাঁঠাল নিয়ে। সেই দশ টাকার কাঁঠাল অমৃত হয়ে গড়িয়ে পড়ত আমার সোনামনিদের ঠোটের কোণ বেয়ে।
গ্রামে আমার অল্প কিছু জমি ছিল। কাজের চাপে গ্রামে যাওয়া হতো না। একদিন ভাবলাম দেখে আসি পৈত্রিক ভিটা। রাতুল-মহুয়া বায়না ধরল সাথে যাবে বলে। কিন্তু জোহরা তখন সবেমাত্র একটা স্কুলে চাকরি পেয়েছে। নতুন চাকরিতে ছুটি পাওয়া কঠিন। তাই শুধু রাতুলকে নিয়ে রওনা দিলাম গ্রামের পথে। কিন্তু গ্রামে আর যাওয়া হলো না। পথে আমাদের বাস রাস্তার পাশে খাদে পড়লো। কত লোক ডুবে মরল। আমার রাতুলের সুন্দর মুখটা আর কখনও দেখতে পায়নি। এক মাস পর যখন হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলাম, তখন লোকে আমার পিতৃপ্রদত্ত নাম পাল্টে নতুন নাম দিল। "আকবর কানা"। খুব আফসোস হচ্ছিল তখন। কেন যে ডুবে মরলাম না সেদিন!
আবার সেই শব্দটা শুনতে পাচ্ছি। প্রায় একমাস হতে চলল, আমার চোখের জল গালে গড়ালেই একটা পায়ের শব্দ পাই। কেউ যেন পায়চারী করছে আমার সামনে। জোহরা, মহুয়া কিংবা পুষি বিড়াল কারও শব্দ এ নয়। আবার অপরিচিতও নয়, ঠিক সেই ভূলে যাওয়া গানটার মতোই ভূলে যাওয়া পদশব্দ। অস্পষ্টভাবে মনের জানালায় এসে যন্ত্রণা দেয়।
কিছুক্ষণ পর শব্দটা দূরে চলে গেল। এখন মহুয়ার পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
--বাবা, মুড়িমাখা খাবা?
--হ্যাঁ, কে মাখিয়েছে রে?
--আমি। লেবু দিয়েছি। খেয়ে দেখো, ভালো লাগবে।
--মহুয়া, পথের পাঁচালীটা একটু পড়ে শোনাবি মা?
--দাঁড়াও পড়ছি। ইস! বইগুলোর উপরে ধুলো জমে গেছে।
মেয়েটা কেমন মায়া মায়া করে পড়ছে। বুড়ো অন্ধ বাপকে কি ওর করুণা হচ্ছে? শুনতে শুনতে ঘুম পেল। এই ঘুমিয়ে থাকা সময়টুকুই আমার সবচে' প্রিয়। লাল নীল রঙগুলো এসময় আমার চোখের সামনে খেলা করে। আকাশ আমার জন্য রঙধনু আর রঙিন মেঘ সাজিয়ে রাখে। আমার চারপাশের স্বপ্নরা আলো হয়ে যায়। বাকিটা জীবন যদি এমনি ঘুমিয়ে কাটাতে পারতাম!
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে অক্টোবর, ২০১১ সকাল ৮:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




