somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অন্ধকারের মানুষ

১৪ ই জুন, ২০১১ রাত ১০:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সেই কখন থেকে বুলবুলিটা গান গেয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দিচ্ছে একটা পুরোনো গানের সুর। কিছুতেই গানটা মনে পড়ছে না। শুধু দুটো শব্দ মাথার মধ্যে এলোমেলো ঘুরছে- "আলো" আর "ভূবন"। এই ভূলে যাওয়া যে কী ভীষণ যন্ত্রণা! বেঁচে থাকাটাই একটা যন্ত্রণা।


একটা ভাংগা চেয়ার আর চৌকিতে আমার দিন-রাত কাটে। অবশ্য আমার কাছে দিন-রাত সবই নিকষ কালো। একটুখানি আলো ঢোকার কোন ছিদ্র বিধাতা রাখেননি। খোলা জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে হাওয়া আসে। বৃষ্টি ভেজা আর রোদ মাখা হাওয়াকে ঠিকই আলাদা করতে পারি।জানালার পাশে বেলী ফুল ফুটলেও বুঝতে পারি। শুধু এই রঙিন পৃথিবীর রঙগুলো ভূলে যাচ্ছি ধীরে ধীরে।আমার বন্ধ চোখ-খোলা চোখের সামনে শুধু একটাই রঙ- "কালো"।


অথচ আমার জীবনটা এমন হওয়ার কথা ছিল না। মিষ্টি একটা বৌ ছিল আমার। জোহরার ভালোবাসা মাখা কোমল কথাগুলো আমাকে সমান্য কেরানী থেকে বিশাল সম্রাজ্যের মালিক বানিয়ে দিত। ফুটফুটে দুটো ছেলেমেয়ে আমার সারা ঘরে হেসে খেলে বেড়াত। সারাদিন পর সন্ধ্যাবেলা ঘরে ফিরতাম সস্তা দামের ছোট্ট একটা কাঁঠাল নিয়ে। সেই দশ টাকার কাঁঠাল অমৃত হয়ে গড়িয়ে পড়ত আমার সোনামনিদের ঠোটের কোণ বেয়ে।


গ্রামে আমার অল্প কিছু জমি ছিল। কাজের চাপে গ্রামে যাওয়া হতো না। একদিন ভাবলাম দেখে আসি পৈত্রিক ভিটা। রাতুল-মহুয়া বায়না ধরল সাথে যাবে বলে। কিন্তু জোহরা তখন সবেমাত্র একটা স্কুলে চাকরি পেয়েছে। নতুন চাকরিতে ছুটি পাওয়া কঠিন। তাই শুধু রাতুলকে নিয়ে রওনা দিলাম গ্রামের পথে। কিন্তু গ্রামে আর যাওয়া হলো না। পথে আমাদের বাস রাস্তার পাশে খাদে পড়লো। কত লোক ডুবে মরল। আমার রাতুলের সুন্দর মুখটা আর কখনও দেখতে পায়নি। এক মাস পর যখন হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলাম, তখন লোকে আমার পিতৃপ্রদত্ত নাম পাল্টে নতুন নাম দিল। "আকবর কানা"। খুব আফসোস হচ্ছিল তখন। কেন যে ডুবে মরলাম না সেদিন!


আবার সেই শব্দটা শুনতে পাচ্ছি। প্রায় একমাস হতে চলল, আমার চোখের জল গালে গড়ালেই একটা পায়ের শব্দ পাই। কেউ যেন পায়চারী করছে আমার সামনে। জোহরা, মহুয়া কিংবা পুষি বিড়াল কারও শব্দ এ নয়। আবার অপরিচিতও নয়, ঠিক সেই ভূলে যাওয়া গানটার মতোই ভূলে যাওয়া পদশব্দ। অস্পষ্টভাবে মনের জানালায় এসে যন্ত্রণা দেয়।


কিছুক্ষণ পর শব্দটা দূরে চলে গেল। এখন মহুয়ার পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

--বাবা, মুড়িমাখা খাবা?

--হ্যাঁ, কে মাখিয়েছে রে?

--আমি। লেবু দিয়েছি। খেয়ে দেখো, ভালো লাগবে।

--মহুয়া, পথের পাঁচালীটা একটু পড়ে শোনাবি মা?

--দাঁড়াও পড়ছি। ইস! বইগুলোর উপরে ধুলো জমে গেছে।

মেয়েটা কেমন মায়া মায়া করে পড়ছে। বুড়ো অন্ধ বাপকে কি ওর করুণা হচ্ছে? শুনতে শুনতে ঘুম পেল। এই ঘুমিয়ে থাকা সময়টুকুই আমার সবচে' প্রিয়। লাল নীল রঙগুলো এসময় আমার চোখের সামনে খেলা করে। আকাশ আমার জন্য রঙধনু আর রঙিন মেঘ সাজিয়ে রাখে। আমার চারপাশের স্বপ্নরা আলো হয়ে যায়। বাকিটা জীবন যদি এমনি ঘুমিয়ে কাটাতে পারতাম!
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে অক্টোবর, ২০১১ সকাল ৮:৩৭
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×